১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেণিকক্ষগুলোয় আসছে ‘জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’, কতটুকু প্রস্তুত শিক্ষা ব্যবস্থা

বর্তমানে সাব সাহারা আফ্রিকার পর বিশ্বে ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ এশিয়ায়। কিন্তু তা পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেণিকক্ষগুলোয় আসছে ‘জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’, কতটুকু প্রস্তুত শিক্ষা ব্যবস্থা

ছবি: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ব্লগস।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Sep 2026, 11:16 PM

Updated : 18 Sep 2026, 11:16 PM

দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশের দেশগুলোর বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ক্রমেই পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ পাল্টে দিচ্ছে

তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সেটি গ্রহণে কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ব্লগসে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ বিষয়ে বিষদ আলোচনা করেছেন সংস্থার দুই পরামর্শক আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব লা প্লাতার শিক্ষক গবেষক মারিয়ানা মারচিওন্নি, ইমানুয়েল হোসে ভাসকেজ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের এডুকেশন গ্লোবাল প্রাকটিসের অর্থনীতিবিদ মোনিকা ইয়ানেস পাগানস।

জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বা ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ বলতে নির্দিষ্ট সময় এবং স্থানের সাপেক্ষে কোনো একটি দেশের বা অঞ্চলের জনসমষ্টির আকার, গঠন, বয়স এবং কাঠামোগত রূপান্তরকে বোঝায়। সহজ কথায়, এটি উচ্চ জন্ম ও মৃত্যুহার থেকে ক্রমান্বয়ে নিম্ন জন্ম ও মৃত্যুহারে পৌঁছানোর একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের এক নতুন বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে নিবন্ধে তিন বিশেষজ্ঞ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন আসছে, তা গ্রহণে শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো কি প্রস্তুত? কারণ দক্ষিণ এশিয়া একটি নতুন জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে; যা দশকের পর দশক ধরে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেবে। বর্তমানে সাব সাহারা আফ্রিকার পর বিশ্বে ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ এশিয়ায়। কিন্তু তা পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে।

জনসংখ্যাগত এ রূপান্তরটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং সেবা দেবে তা সরাসরি প্রভাবিত করবে। দক্ষিণ এশিয়ার ছয় দেশ- বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা জুড়ে তরুণদের সংখ্যা বৃদ্ধি বাড়লেও গত দুই দশকে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ বাড়ায় অগ্রগতি হয়েছে। এ অঞ্চলজুড়ে প্রায় সব শিশু এখন সঠিক বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। মাধ্যমিক শিক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।

তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়লেও বাংলাদেশ ও ভারতের মত দেশগুলোতে অর্ধেকের বেশি শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষের পরও তাদের বয়স উপযোগী সাধারণ বাক্য পড়া ও বোঝার সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না। আর এ অঞ্চলের শিক্ষার মূল নীতিগত সমস্যাটি এটাই। অর্থাৎ শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া অভূতপূর্ব উন্নতি করলেও, একবার সেখানে পৌঁছানোর পর শিশুদের অনেকেই এখনও পর্যাপ্ত শিখতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমিত সরকারি বিনিয়োগের কারণেই শিক্ষার এ ঘাটতিগুলো শিশুদের মধ্যে থেকে যাচ্ছে। দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গড়ে শিক্ষার পেছনে জিডিপির প্রায় ৩.৭ শতাংশ ব্যয় করে; যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ৪ থেকে ৬ শতাংশ সীমার নিচে। তবে চ্যালেঞ্জটি কেবল কত ব্যয় করা হচ্ছে তা নিয়ে নয়। সম্পদ কত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও একটি বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে, ব্যয় এখনও এমন ক্ষেত্রগুলোতে করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের শিখনে শক্তিশালী করার বিষয়টি থাকে না।

ঠিক এখানেই অঞ্চলটির জনসংখ্যাগত রূপান্তর কেবল বেশি ব্যয় নয়, বরং যথাযথ ভালো ব্যয়ের মাধ্যমে শিক্ষা নীতিকে শক্তিশালী করার একটি নতুন সুযোগ খুলে দেয়। বিশ্ব ব্যাংকের তিন গবেষক বলছেন, স্কুলগামী শিশুদের জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়া দেশগুলোতে সঠিক সরকারি ব্যয় শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা ও ব্যায় সঠিক খাতে করার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই সুযোগকে আভিধানিক ভাষায় ‘জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ’ বলা হয়; তবে তা যে সবসময় ঘটবেই এমন নয়।

কারণ কমতে থাকা শিক্ষার্থী সংখ্যা আবশ্যিকভাবে ব্যয় কমায় না, কারণ শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো স্থায়ী খরচ (যেমন স্কুলের ভবন, প্রশাসন এবং পরিবহন নেটওয়ার্ক) বহন করে; যা নিজে থেকে কমে না। সংস্কার ছাড়া, শিক্ষার্থী প্রতি খরচ বাড়ালেও শিখন দুর্বলতা থেকেই যাবে। আর মূল বার্তাটি সেটাই। অর্থাৎ জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির পথ তৈরি করবে তখনই; যদি সরকারগুলো সক্রিয়ভাবে এই রূপান্তরটি পরিচালনা করে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়, জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আর্থিক সুযোগ সর্বত্র একই গতিতে আসবে না। এটি নির্ভর করবে প্রতিটি দেশ তার জনসংখ্যাগত রূপান্তরের কোথায় অবস্থান করছে, কত শিশু স্কুলে ভর্তি হয়েছে এবং শিক্ষার্থী প্রতি সরকারি শিক্ষা ব্যয়ের স্তরের ওপর।

উদাহরণ হিসেবে ভুটান এবং মালদ্বীপের কথা বলা হয়। বলা হচ্ছে, এ দুটি দেশ মূলত জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সুবিধাগুলো গ্রহণ করে শিক্ষার্থী প্রতি উচ্চতর ব্যয় (জিডিপির অংশ হিসেবে) অর্থায়ন করতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মত দেশগুলোর আরও উচ্চাভিলাষী গুণগত লক্ষ্যগুলোতে পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত সম্পদের প্রয়োজন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ভারত এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে আলাদা হয়ে উঠেছে যেখানে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন শিক্ষায় পুনরায় বিনিয়োগের জন্য অর্থপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। নেপালও সম্ভাবনাময়, যদিও ফলাফল নির্ভর করবে শিশুদের স্কুলে ভর্তির ধরন এবং ব্যবস্থার দক্ষতা কীভাবে বিকশিত হয় তার ওপর।

সরকারগুলোর কী করা উচিৎ?

শিক্ষার নতুন এ পরিস্থিতিতে সরকারগুলোর কি করা উচিৎ সে বিষয়ে একগুচ্ছ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নিবন্ধে। পরামর্শগুলো হল-

১. প্রথমত শিক্ষা বাজেট না কমিয়ে জনসংখ্যাগত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তা কার্যকর ক্ষেত্রে পুনরায় বিনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারগুলোর এমন কৌশল নেওয়া প্রয়োজন, যেখানে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে শিক্ষার উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে এমন ক্ষেত্রগুলোতে ব্যয় বাড়াতে হবে, যার প্রভাবের শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে, যেমন উন্নত শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের মান উন্নয়ন, সঠিক স্তরে শিক্ষাদান এবং শিক্ষার্থীদের শিখনে মনোনিবেশ করানো।

২. স্কুল ব্যবস্থার কাঠামোর পরিকল্পনা আগে থেকেই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্কুলগুলো কেবল বাজেটের উপাদান নয়, তারা সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সফল সংস্কারের জন্য স্বচ্ছ যোগাযোগ, সামাজিক অংশগ্রহণ, নিরাপদ শিক্ষার্থী পরিবহন ও উন্নত সুবিধার মত ব্যবহারিক সমাধান প্রয়োজন।

৩. দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিভিন্ন গতিতে জনসংখ্যাগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই সবার জন্য একই পদ্ধতি কাজ করবে না। শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপের জন্য যা যৌক্তিক, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ বা ভারতের জন্য তা বাস্তবায়নযোগ্য নাও হতে পারে। এটি দেশগুলোর জন্য একে অপরের কাছ থেকে শেখার একটি সুযোগও। তারা দেখতে পারে, রূপান্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা অন্যরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।