Published : 21 Jul 2026, 05:00 PM
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে তোলপাড় তৈরি করা চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ‘কিমি’র সেবা সাময়িকভাবে আংশিক বন্ধ বা সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে এর নির্মাতা কোম্পানিটি।
অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সেবা সচল রাখতে হিমশিম খাওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত এল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
চীনা স্টার্টআপ ‘মুনশট এআই’-এর তৈরি এ নতুন সিস্টেমটি গেল সপ্তাহে উন্মোচিত হয়েছে, যা বাজারে আসার পরপরই পুরো প্রযুক্তি খাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য এই এআই সেবার কারণে হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমনকি, শত কোটি ডলারের শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন পুঁজিবাজারে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় ধরনের পতনের পেছনে এ উদ্বেগকেই অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
উন্মোচনের পরপরই কিমির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুনশট এআই বলেছে, এত বিপুল সংখ্যক গ্রাহককে একসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়েই তাদের বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় মুনশট লিখেছে, “কিমির ‘কেথ্রি’ সংস্করণটি আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালোবাসা পেয়েছে, আর এর সরাসরি চাপ গিয়ে পড়ছে আমাদের জিপিইউগুলোরওপর।”
‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী মূল কম্পিউটার সিস্টেমকে জিপিইউ বলে।
মুনশট বলেছে, “গ্রাহকদের অভূতপূর্ব আগ্রহের কারণে চাহিদা আমাদের বর্তমান সক্ষমতার একদম শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।”
এমন অবস্থায় বর্তমান ব্যবহারকারীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে নতুন সাবস্ক্রিপশন নেওয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে কোম্পানি। তারা লিখেছে, “আমরা যত দ্রুত সম্ভব আমাদের সিস্টেমের সক্ষমতা ও ধারণসক্ষমতা বাড়াচ্ছি এবং খুব শিগগিরই ধাপে ধাপে আবার নতুন গ্রাহকদের জন্য সাবস্ক্রিপশন চালু করা হবে।”
পাশাপাশি প্রিমিয়াম মেম্বারশিপকে দুটি ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনাও জানিয়েছে মুনশট এআই, যার একটি দল থাকবে যারা কোডিং বা প্রোগ্রামিংয়ের কাজে মডেলটি ব্যবহার করবেন। অন্যটি সাধারণ বা অন্যান্য কাজের ব্যবহারকারীদের জন্য।
গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে বার্তায় মুনশট লিখেছে, “আপনার ধৈর্য ও সহযোগিতার জন্য অশেষ ধন্যবাদ!”
শুক্রবার নিজেদের নতুন এআই মডেল ‘কিমি কেথ্রি’ উন্মোচন করেছে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি মুনশট এআই। বাজারে আসার পরপরই অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে ২.৮ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের শক্তিশালী এই মডেলটি।
মুনশট এআইয়ের দাবি, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই সিস্টেম কিমি কেথ্রি। তবে বিশ্বজুড়ে মডেলটির এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার পরপরই বড় ধরনের সক্ষমতা সংকটে পড়েছে কোম্পানিটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিমির বিশাল আকার এবং কোডিং ও ‘এআই এজেন্ট’ ভিত্তিক জটিল কাজের ওপর আলাদা নজর দেওয়ার কারণেই এটিকে বড় পরিসরে পরিচালনা করা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
এ ধরনের জটিল প্রসেসিং ও অ্যালগরিদমের কাজের ক্ষেত্রে বারবার মডেল ব্যবহার করতে হয় এবং প্রচুর পরিমাণে কম্পিউটিং শক্তি বা ইনফারেন্স ক্যাপাসিটির প্রয়োজন পড়ে।
ওপেন-ওয়েট মডেলের সুবিধা হচ্ছে ব্যবহারকারীরা চাইলে বিনামূল্যে মূল সিস্টেমটি ডাউনলোড করে নিজেদের মতো কাস্টমাইজ বা পরিবর্তন করতে পারেন। তবে বিশ্লেষকরা ভিন্ন কথা বলছেন।
তাদের মতে, বিপুল পরিমাণ হার্ডওয়্যার খরচ ও কারিগরি জটিলতার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে ‘কিমি কেথ্রি’র মতো এত বড় আকারের মডেল নিজেরা হোস্ট করে চালানো প্রায় অসম্ভব।
বেশ কিছু কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন মডেলের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে পারফর্ম করেছে কিমি কেথ্রি। মুনশট এআই বলেছে, নিরপেক্ষ বা স্বাধীন বিভিন্ন মূল্যায়নেও তাদের মডেলটির শক্তিশালী কার্যসক্ষমতার বিষয়টি প্রমাণিত।
এমন সময়ে মুনশট এআই মডেলটি বাজারে আনল যখন ‘জি ডট এআই’ ও ‘মিনিম্যাক্স’-এর মতো অন্যান্য চীনা এআই কোম্পানিগুলোও কম খরচে আরও উন্নত ও শক্তিশালী মডেল উন্মোচন করছে।
সাম্প্রতিক এসব উদ্ভাবন সেই ধারণাকেই বড় ধাক্কা দিয়েছে, যেখানে মনে করা হত চীনের এআই ডেভেলপাররা মার্কিন টেক জায়ান্টদের চেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে কয়েক মাস পিছিয়ে রয়েছে।
এদিকে, রোববার মুনশট এআইয়ে অন্যতম বিনিয়োগকারী চীনা জায়ান্ট ‘আলিবাবা’ বলেছে, তাদের ২.৪ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের নিজস্ব মডেল ‘কয়েন ৩.৮-ম্যাক্স-প্রিভিউ’ এরইমধ্যে ক্লাউড এআই প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই মডেলটিকে ওপেন-ওয়েট সংস্করণে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে এনভিডিয়ার আধুনিক চিপ সরবরাহে মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা থাকায়, পর্যাপ্ত কম্পিউটিং পাওয়ার বা প্রসেসিং শক্তি জোগাড় করাই এখন এসব সম্ভাবনাময় বিভিন্ন চীনা এআই কোম্পানির জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।