Published : 03 Jun 2026, 11:43 AM
সৌরজগতের বাইরেও যে পৃথিবীর মতো চৌম্বক ক্ষেত্রওয়ালা গ্রহ রয়েছে এবার তার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
চিলি ও হাওয়াইয়ের শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে সাতটি উত্তপ্ত গ্যাসীয় বহির্গ্রহের বাতাসের অদ্ভুত আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এ আবিষ্কারটি করেছেন তারা, যা মহাবিশ্বের দূর-দূরান্তের গ্রহগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের মহাজাগতিক বোঝাপড়াকে আরও একধাপ এগিয়ে নিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, আমাদের সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে দুটি ছাড়া বাকি সবগুলোতে যে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি রয়েছে তা সৌরজগতের বাইরের অন্তত কিছু গ্রহের মধ্যেও একইভাবে আছে।
গ্রহের একদম গভীরে থাকা গলিত ধাতব কেন্দ্রের নড়াচড়া ও গ্রহের নিজস্ব ঘূর্ণনের ফলে এ অদৃশ্য চৌম্বক ক্ষেত্র বা শক্তি বলয়টি তৈরি হয়।
গবেষণায় থাকা বিভিন্ন গ্যাসীয় গ্রহের কোনোটিই প্রাণের অনুকূল নয়।
তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর মতো কোনো পাথুরে গ্রহকে বাসযোগ্য করে তোলার পেছনে চৌম্বক ক্ষেত্র অন্যতম প্রধান সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে।
এসব অদ্ভুত গ্রহের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এগুলো নিজেদের উত্তপ্ত তারার খুব কাছ দিয়ে প্রদক্ষিণ করে। ফলে, পৃথিবীর দিকে চাঁদের অবস্থান যেমন সবসময় একমুখী থাকে, ঠিক তেমনই এসব গ্রহেরও একটি পাশ সবসময় তারার আলোয় আলোকিত এবং অন্য পাশটি অন্ধকারের দিকে মুখ করে থাকে।
এ ধরনের গ্রহগুলোকে সাধারণত ‘হট জুপিটার’ বা উত্তপ্ত বৃহস্পতি বলে। কারণ এগুলো আকারে ও গঠনে আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতির মতো হলেও এদের তাপমাত্রা বেশি।
গবেষণায় থাকা সাতটি গ্রহের ভর বৃহস্পতি গ্রহের সমান থেকে শুরু করে তার তিন গুণেরও বেশি। এসব গ্রহে প্রচণ্ড উত্তপ্ত ‘দিনের পাশ’ থেকে তীব্র ঠাণ্ডা ‘রাতের পাশের’ দিকে শক্তিশালী বাতাস প্রবাহিত হয়।
তারার খুব কাছাকাছি থাকার কারণে এদের দিনের পাশের বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা থাকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত। আমাদের সৌরজগতের সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধের চেয়েও এরা নিজেদের তারার অনেক কাছাকাছি অবস্থান করছে।
ফ্রান্সের নিস শহরের অভজারভেটরি ডি লা কোত দ্য’অ্যাজিউর ল্যাগ্রাঞ্জ ল্যাবরেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও এ গবেষণার প্রধান লেখক জুলিয়া সাইডেল বলেছেন, “স্বাভাবিকভাবে আশা করা যায়, যেসব গ্রহের তাপমাত্রা বেশি সেগুলোতে বাতাসের বেগও বেশি। আপনি সিস্টেমে যত বেশি শক্তি যোগ করবেন, বাতাস তত বেশি তীব্র রূপ নেবে। তবে আমরা এখানে ঠিক তার উল্টোটা দেখতে পাচ্ছি।”
মঙ্গলবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-তে।
সাইডেল বলেছেন, “সবচেয়ে উত্তপ্ত বিভিন্ন গ্রহতেই বায়ুমণ্ডলকে আলোড়িত করার মতো বাতাস সবচেয়ে কম শক্তিশালী। বায়ুমণ্ডলের আচরণ সম্পর্কে আমরা যা জানি সেই অনুসারে এমনটা সত্যিই খুব অদ্ভুত। মানে, তারা থেকে যে বিপুল শক্তি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে, তা অন্য কোনো উপায়ে মিলিয়ে বা খরচ হয়ে যেতে হচ্ছে।
“আর বায়ুমণ্ডলের গতিকে এত দ্রুত ও এতটা থামিয়ে দেওয়ার একমাত্র উপায় হতে পারে কেবল এ চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডলের গতিশীল চার্জওয়ালা বিভিন্ন কণার সঙ্গে এর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া।”
এ সাতটি বহির্গ্রহের বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা আমাদের বৃহস্পতি গ্রহের বাতাসের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
আমাদের সৌরজগতের বেশিরভাগ গ্রহেরই নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র থাকায় গবেষকরা বলেছেন, সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোতেও এমনটা থাকা মোটেও বিস্ময়কর কিছু নয়।
তবে তারা বলছেন, বিজ্ঞানীরা এযাবতকাল এর পক্ষে কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ খুঁজে পেতে বেশ হিমশিম খাচ্ছিলেন।
এ বিষয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জুলিয়া সাইডেল বলেছেন, “আমরা কেবল নির্দিষ্ট এক বহির্গ্রহের দিকে তাকাইনি, বরং অনেকগুলো গ্রহের পুরো দল বা গোষ্ঠীকে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং সেখানে সুনির্দিষ্ট এক ধরন লক্ষ্য করেছি।”
আমাদের সৌরজগতে বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রটিই সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী।
তবে গবেষণায় থাকা সাতটি বহির্গ্রহের তৈরি করা চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো বৃহস্পতির চেয়ে আকারে ছোট হলেও, সৌরজগতের অন্যান্য সাধারণ বিভিন্ন গ্রহের সঙ্গে বেশ তুলনীয়।
সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে পৃথিবী ও বৃহস্পতির পাশাপাশি বুধ, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনেরও নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে। কেবল শুক্র ও মঙ্গল এই দুটি গ্রহেরই কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র নেই।
তবে বৃহস্পতির বড় উপগ্রহ ‘গ্যানিমেড’ নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে এবং অনেক আগে পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদেরও নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র ছিল।
একটি গ্রহ দীর্ঘ সময় ধরে তার বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখতে পারবে কি না এর পেছনে চৌম্বক ক্ষেত্র অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে। যেমন, মঙ্গল গ্রহের একসময় নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র ছিল।
তবে কোটি কোটি বছর আগে গ্রহটির অভ্যন্তরভাগ ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার পর সেটি হারিয়ে যায়। এ কারণেই বর্তমানে মঙ্গল গ্রহে কেবল ক্ষীণ বা পাতলা বায়ুমণ্ডল ও প্রাণহীন প্রতিকূল এক পরিবেশ টিকে রয়েছে।
এ গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক ও জার্মানির ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিবিয়ানা প্রিনোথ বলেছেন, “চৌম্বক ক্ষেত্র সরাসরি গ্রহকে বাসযোগ্য করে তোলে কি না তা নির্ধারণ করে– এমনটা সাধারণ ভুল ধারণা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রহের বিবর্তনে চৌম্বক ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
“আমাদের অনুমান, জীবন বা প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার বিষয়টি বায়ুমণ্ডল থাকার ওপর নির্ভর করে। বায়ুমণ্ডল গ্রহের পৃষ্ঠের চাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও পৃথিবীর বুকে যেভাবে তরল পানি টিকে আছে ঠিক সেভাবে গ্রহের উপরিভাগে পানি থাকার পরিবেশও তৈরি করে দেয়।”