Published : 22 Jul 2026, 08:28 AM
দেশের সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন প্রবাসীরা, তাদের শ্রম আর ঘামের বিনিময়ে উপার্জিত বিদেশি মুদ্রার কল্যাণে এখনো স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।
৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে এসেছে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স। এই অংক আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।
এই সংখ্যা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন ৫০ বছরের এই যাত্রাপথের শুরুটা মিলিয়ে দেখা যায়।
স্বাধীনতার পর তিন-চার বছর প্রবাসী আয়ের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ ঘেটে দেখা যায়, দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স আসা শুরু হয় ২০৭৫-৭৬ অর্থবছরে থেকে।
ওই বছর ১ কোটি ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা; তখনকার বিনিময় হারের হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি টাকার মত।
তখন কত প্রবাসী দেশের বাইরে ছিলেন, তার কোনো তথ্য সমীক্ষায় নেই। দিন গড়িয়েছে, কাজের সন্ধানে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোসহ বিভিন্ন দেশে ছুটে গেছে বাংলাদেশের মানুষ; সেই সংখ্যা এখন দেড় কোটি ছাড়িয়েছে।
তাদের পাঠানো অর্থ বাড়তে বাড়তেই গেল অর্থবছরে রেমিটেন্স ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়েছে। দেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার মত, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেক।
এই দীর্ঘ পথ মসৃণ ছিল না মোটেও। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক রেমিটেন্স কখনও হোঁচট খেয়েছে। কখনো আবার হয়েছে রাজনীতির হাতিয়ার।
চব্বিশের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার প্রবাসী আয়কে সরকারের সাফল্য হিসেবে প্রচার করত। এরপর অন্তবর্তী সরকারের দেড় বছরে আয় বাড়ায় বাহাবা নেওয়া হয়েছে। এখন বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে।
আবার যখন রেমিটেন্স কমে গেছে, তখন বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। চব্বিশের আন্দোলনের সময় অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীদের দেশে টাকা না পাঠাতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল। ২০২৪ সালের অগাস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা কাটছিল না।
তবে রেমিটেন্সের উল্লস্ফনে সেই রিজার্ভ এখন স্বস্তির জায়গায় এসেছে। সবশেষ ১৯ জুলাই বিপিএম-৬ পদ্ধতির হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩২.০২ বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ছিল ৩৬ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
তবে রিজার্ভের আরেক উৎস রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ১ শতাংশের মত কমেছে এই সূচক।
কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ (এফডিআই) আসছে না। ফলে কোনো কারণে রেমিটেন্স প্রবাহে ভাটা পড়লে রিজার্ভে ফের টান পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।
৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব
কয়েক বছরের মধ্যে প্রবাসী আয় ৫০ বিলিয়ন (৫ হাজার কোটি) ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা এখন ৩৫.৬০ বিলিয়ন ডলার পাচ্ছি। এখানে প্রবাসীদের আরো ভালো করার সুযোগ আছে। আমি মনে করি, ৫০ বিলিয়নে নিয়ে যাওয়ার মত সক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এটি অন্যদিকে চলে যায়।
“প্রবাসীরা যদি টাকাগুলো সরাসরি বাংলাদেশি কোম্পানি বা বাংলাদেশি ব্যাংকের সঙ্গে কানেকশন আছে এমন মাধ্যম ব্যবহার করে পাঠান, তাহলে সেটি অন্যদিকে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এমনটি করলে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা কোনো ব্যাপার না।”
সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, “আমার মনে হয়, এই জায়গাটিতেই এখন সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।“
এর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “ফিলিপিন্সের মাথাপিছু আয় আমাদের তিন গুণ বেশি, কারণ তারা ইংরেজিটা খুব ভালোভাবে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে যখন কাজ করেছি, বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে দেখেছি ফিলিপিন্সের নাগরিকদের। এটি খুবই আকর্ষণীয় চাকরি, কিন্তু এখানে দক্ষিণ এশীয়রা তেমন নেই।”
এই বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশ সেবা খাতে পিছিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা ও মানসিকতার কারণে।
“বিশ্বব্যাপী নার্সিংয়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দক্ষ লোক নেই। এ বিষয়গুলো সরকারের শীর্ষ মহলকে গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করতে হবে।”

আত্মতুষ্টিতে না ভোগার পরামর্শ
রেমিটেন্সের উল্লম্ফনে আত্মতুষ্টিতে না ভোগার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এ কথা ঠিক যে, রেমিটেন্স প্রবাহ বেশ ভালো। এই সূচকই অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে বলা যায়। তবে এটা বাড়তেই থাকবে—এমনটা ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। বিশ্ব পরিস্থিতি ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে। যে কোনো সময় রেমিটেন্সে ধাক্কা লাগতে পারে। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে কিন্তু ৩ বিলিয়ন ডলারের কম এসেছে।”
“বেশ কিছুদিন ধরে রপ্তানি আয়ের অবস্থা ভালো নয়। গত অর্থবছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয়েছে। এ অবস্থায় রেমিটেন্স যদি কমে যায়, তাহলে কিন্তু রিজার্ভ কমে যাবে। যার প্রভাব সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতেও পড়বে।”
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “তাই আমি বলব, আত্মতুষ্টিততে না ভুগে নতুন সরকারকে রেমিটেন্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
তিনি বলেন, “একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে। রেমিটেন্স বাড়ার কারণে রিজার্ভ বেড়েছে ঠিক। কিন্তু আমদানি ব্যয় কমাও কিন্তু রিজার্ভ বাড়ার একটি কারণ। আগের মত বিদেশি ঋণ-সহায়তা আসছে না। আমদানি বেড়ে গেলে রপ্তানি আয় যদি না বাড়ে, তাহলে শুধু রেমিটেন্স দিয়ে রিজার্ভ সন্তোষজনক রাখা যাবে না।”
অর্থনীতিতে রেমিটেন্সের অবদান
বিশ্ব ব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ নিয়ে বছরভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করে থাকে। সম্প্রতি প্রকাশিত এই তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) রেমিটেন্সের অবদান ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০১২ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। এর পর কমতে কমতে ২০১৬ সালে ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসছিল। গত কয়েক বছরে তা বেড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে।
বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ প্রবাসী আয়ে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সপ্তম।
২০২৪ সালে চীনকে টপকে অস্টম থেকে সপ্তম স্থান দখল করে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে ৩৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাওয়া বাংলাদেশ ওই অবস্থান ধরে রাখে।
বরাবরের মতই ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স পেয়েছে ভারত; ১৫০ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মেক্সিকো ৬৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার পায়। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফিলিপিন্সের প্রাপ্তি ছিল ৪১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
চতুর্থ স্থানে মিশর ৪১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, পঞ্চম স্থানে পাকিস্তান ৪০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার এবং ষষ্ঠ স্থানে থাকা ফ্রান্স ৪০ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পেয়েছিল ওই বছর।
২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পেয়ে অস্টম স্থানে ছিল চীন। ২২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে নবম স্থানে ছিল নাইজেরিয়া। আর দশম স্থানে থাকা গুয়েতেমালা ২১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছিল ওই বছর।