১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘অপার্থিব এক মহাবিশ্ব’ দেখাল নতুন এই টেলিস্কোপ

চিলিতে ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’ নামের নতুন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ডিজিটাল ক্যামেরা বসিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

‘অপার্থিব এক মহাবিশ্ব’ দেখাল নতুন এই টেলিস্কোপ
বিশাল রঙিন গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা তৈরির এ অঞ্চলে। ছবি: ভেরা সি রুবিন মানমন্দির

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Jun 2025, 07:53 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:15 PM

প্রথমবারের মতো মহাবিশ্বের ছবি তুলেছে একেবারে নতুন এক টেলিস্কোপ। এর তোলা ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে, মহাবিশ্বের অনেক গভীর ও অন্ধকার অংশ খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পারে এটি, যার দেখা আগে কখনও মেলেনি। আর প্রথম ব্যাচের ছবির সঙ্গেই জুড়ে বসেছে ‘অপার্থিব’ বিশেষণটি।

নতুন টেলিস্কোপটির তোলা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিশাল রঙিন গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা তৈরির অঞ্চলে। এ জায়াগাটির অবস্থান পৃথিবী থেকে প্রায় ৯ হাজার আলোকবর্ষ দূরে।

চিলিতে ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’ নামের নতুন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ডিজিটাল ক্যামেরা বসিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এ টেলিস্কোপের ক্যামেরা এর চোখ দিয়ে এমন সব জিনিস দেখবে, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা একেবারে বদলে দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

আমাদের সৌরজগতের মধ্যে যদি কোনো নবম গ্রহ বা নতুন গ্রহ থেকে থাকে তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ টেলিস্কোপ এতটাই শক্তিশালী যে, প্রথম বছরেই সেটা খুঁজে বের করতে পারবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, টেলিস্কোপটি এমন বিপজ্জনক গ্রহাণুও শনাক্ত করবে, যেগুলো পৃথিবীকে ধাক্কা দেওয়া বা এর ওপর আছড়ে পড়ার মতো দূরত্বে আছে। মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের মানচিত্রও তৈরি করতে পারবে এটি। পাশাপাশি মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশজুড়ে থাকা রহস্যময় বস্তু, বিশেষ করে ‘ডার্ক ম্যাটার’ সম্পর্কে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে এই টেলিস্কোপ।

আগামী ১০ বছর ধরে দক্ষিণ গোলার্ধের রাতের আকাশের ছবি ক্রমাগত তুলবে এটি, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য এক অসাধারণ ও বিরল সুযোগ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও স্কটল্যান্ডের রাজ জ্যোতির্বিদ ক্যাথরিন হেইমানস বলেছেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ২৫ বছর ধরে এ মুহূর্তটির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দশকের পর দশক ধরে আমরা এ ধরনের অসাধারণ মানের টেলিস্কোপ তৈরির পাশাপাশি এ ধরনের গবেষণা চালাতে চেয়েছি।”

বিবিসি লিখেছে, এ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ এক অংশীদার যুক্তরাজ্য। দেশটি এমন ডেটা সেন্টার তৈরি করবে, যেখানে আকাশ স্ক্যান করে টেলিস্কোপ যে বিশাল সংখ্যক বিস্তারিত ছবি সংগ্রহ করবে সেগুলো বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়া করবে ওই ডেটা সেন্টার।

গবেষকরা বলছেন, সৌরজগতের যতগুলো বস্তু এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে, তার সংখ্যা দশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে ভেরা রুবিন টেলিস্কোপটি। 

এটি বসানো হয়েছে চিলির আন্দিজ পর্বতমালার ‘সেরো পাচোন’ নামের একটি পর্বতের চূড়ায়, যেখানে মহাকাশ গবেষণার জন্য রয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে আরও কয়েকটি মানমন্দিরও। জায়গাটি খুব উঁচু, খুব শুষ্ক ও খুব অন্ধকার, যা তারা দেখার জন্য আদর্শ এক জায়গা।

টেলিস্কোপের আশপাশে থাকা গম্বুজের অন্ধকার বজায় রাখার জন্য মানমন্দিরের ভেতরে সম্পূর্ণ এক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট কাজ করে। এ গম্বুজটি রাতের আকাশের দিকে খোলা থাকে। ফলে গবেষকরা বিষয়টি নিশ্চিত করেন, সেখানে কোনও অপ্রয়োজনীয় বাতি বা অন্য কোনও আলো না থাকে, যা রাতের আকাশ থেকে আসা দূরবর্তী তারার আলোকে বাধা দিতে পারে।

মানমন্দিরটিতে কাজ করছেন বিজ্ঞানী এলানা উরবাচ। তিনি বলেছেন, এখানে রাতের আকাশ থেকে আসা তারার আলো এত পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে যে, সেই আলোতে তাদের পথ চলতে কোনও সমস্যা হয় না।

তিনি আরও বলেছেন, মানমন্দিরটি’র বড় লক্ষ্য হচ্ছে ‘মহাবিশ্বের ইতিহাস বোঝা’। যার মানে, এমন ছায়াপথ বা সুপারনোভার বিস্ফোরণ দেখা, যা ‘কোটি কোটি বছর আগে’ ঘটেছিল।

“তাই আমাদের খুব স্পষ্ট ও ছোট ছোট বিভিন্ন জিনিসও যেন ভালোভাবে দেখা যায় এমন তীক্ষ্ণ ছবি দরকার।”

এ টেলিস্কোপের রয়েছে তিনটি আয়না, যেখানে মূল আয়নার ব্যাস ৮.৪ মিটার, দ্বিতীয় আয়নার ব্যাস ৩.৪ মিটার ও তৃতীয় আয়নার ব্যাস ৪.৮ মিটার। রাতের আকাশ থেকে আলো এসে প্রথমে বড় আয়নায় পড়ে, তারপর মাঝারি আয়নায় ও তারপর ছোট আয়নায় এবং সবশেষে ক্যামেরায় প্রবেশ করে। এ পদ্ধতিতে আলো খুব স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ হয়।

গবেষকরা বলছেন, টেলিস্কোপের এসব আয়নাকে নিখুঁত অবস্থায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ছোট ধূলিকণাও ছবির মান বদলে দিতে পারে। এ টেলিস্কোপের আয়নার উচ্চ প্রতিফলন সক্ষমতা ও দ্রুত গতির কারণে এটি বেশি আলো ধরে রাখতে পারে। 

এ মানমন্দিরের অপটিক্স বিশেষজ্ঞ গিলেম মেগিয়াস বলেছেন, বিষয়টি “খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে আমরা অসম্ভব দূরের বস্তুও দেখতে পারি।” জ্যোতির্বিজ্ঞানে যা জানা খুবই দরকারি।

টেলিস্কোপের ভেতরে থাকা ক্যামেরাটি আগামী ১০ বছর ধরে প্রতি তিন দিনে একবার করে রাতের আকাশের ছবি তুলবে। এমনটি করা হবে ‘লিগ্যাসি সার্ভে অফ স্পেস অ্যান্ড টাইম’ নামের বড় এক গবেষণার জন্য।

টেলিস্কোপটি ১.৬৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থ এবং এর ওজন প্রায় দুই হাজার ৮০০ কেজি। অনেক বড় পরিসরে বা বিস্তৃত জায়গার ছবি তোলার জন্য এটি তৈরি করেছেন গবেষকরা। 

প্রায় প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি ছবি তোলার পাশাপাশি প্রতিদিন রাতে প্রায় ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা ধরে ছবি তোলার কাজ চালিয়ে যাবে এটি। টেলিস্কোপের গোলাকার ছাদের মতো অংশ বা ডোম ও মাউন্ট খুব দ্রুত নিজের জায়গা বদলাতে পারে। তাই ছবি তোলা চালিয়ে যেতে পারবে টেলিস্কোপটি। 

‘ডার্ক ম্যাটার’ সম্পর্কে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে এই টেলিস্কোপ। ছবি: ভেরা সি রুবিন মানমন্দির

‘ডার্ক ম্যাটার’ সম্পর্কে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে এই টেলিস্কোপ

এর রেজোলিউশন তিন হাজার ২০০ মেগাপিক্সেল, যা আইফোন ১৬ প্রো ক্যামেরার চেয়ে প্রায় ৬৭ গুণ বেশি, যা এতটাই সূক্ষ্ম যে, এটি চাঁদের ওপর থাকা একটি গলফ বলের ছবিও তুলতে পারবে। এর তোলা ছবির পরিমাণ ও মান এত ভালো যে, একটি ছবি দেখতেই লাগবে চারশটি আলট্রা এইচডি টিভি স্ক্রিন। 

মেগিয়াস বলেছেন, “টেলিস্কোপটি দিয়ে প্রথম ছবি তোলার সময়টি আমাদের কাছে ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত।

“প্রথম এ প্রকল্পে কাজ শুরু করার সময় এমন একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার, যিনি ১৯৯৬ সাল থেকে এ প্রকল্পে কাজ করছিলেন। আমি জন্মেছি ১৯৯৭ সালে, অর্থাৎ এ পুরো বিষয়টি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এক প্রজন্মের প্রচেষ্টা এটি।”

বিবিসি লিখেছে, বিশ্বের শত শত বিজ্ঞানীর ওপর নির্ভর করবে এই ডেটা বিশ্লেষণের কাজ। কারণ প্রতি রাতে প্রায় ১ কোটি তথ্যের স্রোত তৈরি করছে এই টেলিস্কোপ।

এ জরিপ চারটি প্রধান বিষয় নিয়ে কাজ করবে, যেখানে আকাশে পরিবর্তন বা অস্থায়ী বস্তু চিহ্নিত করা, মিল্কিওয়ে ছায়াপথ কীভাবে তৈরি হয়েছে তা জানা, সৌরজগতের মানচিত্র তৈরি এবং ডার্ক ম্যাটার ও মহাবিশ্ব কীভাবে গঠিত হয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করবেন বিজ্ঞানীরা।

টেলিস্কোপটির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে, এটি নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে কাজ করে। বারবার মহাবিশ্বের একই অঞ্চল স্ক্যান করবে এবং যখনই কোনও পরিবর্তন ধরতে পারবে তখনই বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা পাঠাবে এটি।

অধ্যাপক হেইমেন্স বলছেন, “এ গবেষণার সবচেয়ে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, আকাশে হঠাৎ ঘটে যাওয়া বা অস্থায়ী বিভিন্ন পরিবর্তন খুঁজে বের করা। এ দিকটি এতটাই নতুন ও শক্তিশালী যে, এর মাধ্যমে এমন কিছু আবিষ্কার হতে পারে, যা আগে কেউ কখনও কল্পনাও করেনি।”

গ্রহাণুর আঘাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতেও সাহায্য করতে পারে এটি। কারণ এটি হঠাৎ করে পৃথিবীর কাছে চলে আসা বিপজ্জনক বস্তু বা গ্রহাণু শনাক্ত করতে পারে। যেমন– এ বছরের শুরুতে বিজ্ঞানীরা কিছু সময়ের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, ‘ওয়াইআর৪’নামের এক গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়তে পারে এই ভেবে।

‘ডারহাম ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক আলিস ডিসন বলেছেন, “টেলিস্কোপটি একেবারে বদলে দেবে সবকিছু। আমাদের ছায়াপথ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ডেটা সেট বা তথ্যের ভাণ্ডার হতে চলেছে এটি। এসব তথ্যের সাহায্যে আমরা অনেক বছর ধরে আরও অনেক নতুন জ্ঞান ও গবেষণা চালিয়ে যেতে পারব।”