Published : 10 Jun 2026, 01:34 AM
সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ‘অস্থিরতা’ কাটলেও নানামুখী অর্থনৈতিক সংকট রয়ে গেছে, তার সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে যোগ হওয়া চাপ নতুন করে বিপদে ফেলে দিয়েছে দেশের অর্থনীতিকে।
ফলে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ‘বড় ঘাটতির’ অর্থনীতি রাজনৈতিক সরকারের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াবে বলে যে আশা জনপরিসরে জেগেছিল, অর্থবছরের শেষে এসেও তার কোনো আভাস মিলছে না।
বরং অর্থনীতির চাকা সহসা যে গতি পাবে না, তা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তার ভাষায়, “আমাদের দুই বছর কষ্ট করা লাগবে।”
এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে এবং বৈশ্বিক সংকট কতটা কাটবে, তার ওপর নির্ভর করছে স্থিতিশীলতা ধরে রেখে অর্থনীতিকে পথে ফেরানোর বিষয়টি।
চলতি অর্থবছরে রেমিটেন্স আশা দেখালেও নেতিবাচক রপ্তানি আয়, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ খরা ও বেকারত্ব বৃদ্ধি, বিদেশি ঋণে ভাটা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি, ব্যাংক খাতের দুর্দশা, রাজস্ব আহরণে হতাশা আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তাই বিনিয়োগ বাড়িয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙ্গা করে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কথা বলছেন অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ।

দেশের অর্থনীতির হাল তুলে ধরে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। মন্দার কারণে রাজস্ব আয় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মন্দা আরও বেড়েছে। রাজস্ব বোর্ড সংস্কার করতে গিয়ে সেখানেও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে রাজস্ব আয় আরও কমেছে। একদিকে রাজস্ব আয় হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ফলে আয়-ব্যয়ের মধ্যকার ভারসাম্যহীনতা বেড়েছে।
“ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে বড় ঘাটতি রেখে গেছে। যে কারণে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে।”

রাজনৈতিক সরকারের খরচ বাড়বে মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “একদিকে আয় কম, অন্যদিকে খরচ বেশি। ফলে ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলোর অবস্থাও ভালো নয়, অনেক ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারকে মোটা অঙ্কের ঋণের জোগান দিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে না। সরকার এখন উভয় সংকটে পড়েছে।”
এ সংকট কাটাতে নতুন সরকারকে দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, এমন পরামর্শ এসেছে তার কাছ থেকে।
মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। যাতে তারা বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও রেমিটেন্স বাড়ানোর দিকেও জোর দিতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যবসা চাঙ্গা হলে রাজস্ব আয় বাড়বে।”
কোভিড মহামারী ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধের ধাক্কায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ বারের সরকারের বাজেট থেকে যা প্রকট হয়ে ওঠে।
সে বছর ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দেশের হাল ধরে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু রাজনৈতিক ‘অস্থিরতায়’ অর্থনীতি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
চলতি অর্থবছরের মাস চারেক বাদ দিলে বাকি সময় রাজপথের আন্দোলন, ‘মব’ সহিংসতা, আর নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। ‘নির্বাচন জটিলতা’ কাটানোর শুরুতে, অর্থাৎ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে জ্বালাও পোড়াও নতুন সংকট তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত ইউনূস সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছর পেরিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ফেব্রুয়ারিতে দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর ইরান যুদ্ধ শুরু হলে ‘ভঙ্গুর’ অর্থনীতি আরও চাপে পড়ে যায়।

এই চাপের কারণে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর এক লাফে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে সরকার। রান্নার কাজে বেশি ব্যবহৃত এলপিজির দামও বেড়েছে। তাতে বাড়তি খরচের চাপে থাকা মানুষের দুর্দশা আরও বেড়েছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে সরকার, যা কয়েক বছর ধরে উর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করে, সে ধারা এখনো রয়েছে। আমদানি না বাড়ায় রিজার্ভও স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। কিন্তু রপ্তানিসহ অর্থনীতির অন্য সব সূচকই নেতিবাচক, যার প্রতিফলন দেখা যায় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে।
এ অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে টেনে তোলার দুশ্চিন্তার মধ্যেই ‘সক্ষমতার’ বার্তা দিতে ১১ জুন বড় আকারের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এবারের বাজেটের আকার সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে বলে আভাস মিলছে।

রেমিটেন্সে সচল অর্থনীতির চাকা
দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ইরান যুদ্ধের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ‘উল্লম্ফন’ অব্যাহত রয়েছে।
মে মাসে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা। একক মাসের হিসাবে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল মার্চ মাসে, ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ (৩.৭৫ বিলিয়ন) ডলার।
এ নিয়ে টানা ছয় মাস ৩ বিলিয়নের বেশি রেমিটেন্স এসেছে দেশে।
সব মিলিয়ে ৩০ জুন শেষ হতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) এসেছে ৩২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। যা গত অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়েও ৮ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ২৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। পুরো অর্থবছরে পাঠিয়েছিলেন ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এই ধারা বজায় থাকলে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এবার প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স আসবে বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ১১ মাসে গড়ে ২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে দেশে। সে হিসাবে অর্থবছর শেষে এবার এই সূচক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
“আশঙ্কা করা হচ্ছিল, যুদ্ধের কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু এখন অবধি না হয়নি।”

কতটা ভরসা দিচ্ছে রিজার্ভ?
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ধাক্কায় উলোটপালট হয়ে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যেও রেমিটেন্সের উপর ভর করে রিজার্ভ ‘সন্তোষজনক’ অবস্থায় রয়েছে।
সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা রিজার্ভ বাড়ার একটি কারণ। এই আর্থিক বছরে নিলামে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।
সবশেষ গত মার্চ মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
সে হিসাবে বর্তমানের ৩০ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।
তবে আমদানি ব্যয় বাড়লে এই রিজার্ভেও টান পড়বে বলেছেন অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিনিয়োগে মন্দা চলছে। বিনিয়োগে গতি আনতে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়বে। তখন কিন্তু রিজার্ভ কমে আসবে। তাই শুধু রেমিটেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে।”

রপ্তানি আয়ে নিরাশা
দেশের অন্যতম আয়ের উৎস রপ্তানি এক মাস বাড়ার পর ফের হোঁচট খেয়েছে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক টানা আট মাস কমার পর গত এপ্রিলে বেড়েছিল; মে মাসে এসে ফের কমেছে।
মে মাসে পণ্য রপ্তানি করে ৪৪০ কোটি ২৮ লাখ (৪.৪০ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের মে মাসের চেয়ে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ কম।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এই ১১ মাসে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি (৪৩.৮০ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি ৬০ লাখ (৪৪.৯৪ বিলিয়ন) ডলার।
তৈরি পোশাক খাতে আয় কমায় রপ্তানি বাণিজ্য নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে।
পোশাক রপ্তানির অন্যতম বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা গেল বছর বিশ্বকে অস্থির করে তোলে। বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা ৩৭ শতাংশ নিয়ে দেন দরবারের পর তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। পরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে আরও ১ শতাংশ ছাড় পায় ঢাকা।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে এ অস্থিরতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকেও অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।
সম্প্রতি জোরপূর্বক শ্রম কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ফলে আবার দুশ্চিন্তায় পড়েছে রপ্তানি খাত।
রপ্তানি কেন কমেছে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সার্বিকভাবে আমাদের অবস্থা ভালো না। সেই যে ২০২০ সালে কোভিড মহামারী থেকে শুরু হয়েছিল। এর পর থেকে একটার পর একটা ধাক্কা লেগেই আছে।
“কোভিডের পর রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা-সহিংসতা-ক্ষমতার পট পরিবর্তন। এখন চলছে ইরান যুদ্ধ। মাঝে আবার ছিল ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কা। সব মিলিয়ে আমাদের অবস্থা কী হবে—বুঝতে পারছি না।”

বাগে আসেনি মূল্যস্ফীতি
চার বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করেছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে একটানা মূল্যস্ফীতির চাপে জেরবার সাধারণ মানুষ। কোনো মাসে একটু কমল তো পরের মাসে আবার চড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সবশেষ তথ্য বলছে, মে মাসে ৯ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। এপ্রিলে এ হার ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ।
এ নিয়ে টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি দেখল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ সূচক।
তার আগে টানা চার মাস বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মার্চ মাসে তা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমেছিল। এপ্রিলে ফের ৯ শতাংশ ছাড়ায়। মে মাসে আরও বেড়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল। ওই বাজেটের এক মাস যেতেই পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; বাজেট বাস্তবায়ন করে আসলে অন্তবর্তী সরকার। ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ওই অর্থবছর।
চলতি অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ঠিক করে অন্তর্বর্তী সরকার। এপ্রিল পর্যন্ত (২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালে এপ্রিল) হিসাবে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রাজস্বে বিশাল ঘাটতি
রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতির মুখে পড়েছে দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। অর্থবছরের ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এর আগে কোনো অর্থবছরের পুরো সময়েও এতো ঘাটতি দেখা যায়নি। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছিল গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে; ওই আর্থিক বছরে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের মোট লক্ষ্যমাত্র ধরা আছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ১০ মাসে অর্থাৎ জুলাই-এপ্রিল সময়ে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ দুই মাসে মে ও জুনে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭১ কোটি টাকা আদায় করতে হবে এনবিআরকে। মাসে গড়ে আদায় করতে হবে ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। যেখানে এনবিআর গত দশ মাসে গড়ে আদায় করেছে ৩২ হাজার কোটি টাকা করে।
অতীতে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে রাজস্ব আয় বাড়তে দেখা গেলেও শেষ দুই মাসে পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা আদায় করার সক্ষমতা এনবিআরের নেই বলে মনে করেন সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত রাজস্ব খাত সংস্কার কমিটির প্রধান আবদুল মজিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্তমান রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। তাই রাজস্ব খাতের সংস্কারের বিকল্প নেই, যা এই পর্যন্ত কোনো সরকারই ব্যাপকভাবে করেনি।
“এখন এনবিআর নীতি প্রণয়ন করে, আবার শুল্ক–কর আদায়ও করে। তাই তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। শুল্ক–কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ আছে।”
তিনি বলছেন, “রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে সংস্কার করতেই হবে; আমরা যে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।”

কাটেনি ব্যাংকখাতের দুরাবস্থা
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকখাত ব্যাপক লুটপাটের শিকার হয়ে নাজুক হয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তারল্য সংকটে অনেক ব্যাংক গ্রাহকের টাকা পর্যন্ত দিতে পারছিল না।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকখাতে বেশকিছু সংস্কার উদ্যোগ নেয় ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। লুটপাটের অভিযোগ ছিল যেসব ব্যাংকে, সেগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
সেইসঙ্গে, দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।
এর বাইরে, আইনসহ নানান সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্যোগের ফলে ব্যাংকখাত কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছিল বলে মনে করেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
“অর্থনৈতিক সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছরে যত উদ্যোগ নিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ব্যাংকখাতে সবচেয়ে বেশি উন্নতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল।”
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তবর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে বিদায় করে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরই মধ্যে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ‘গ্রাহক ফোরাম’ নাম দিয়ে এক দল লোক মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছে।

বিনিয়োগে বেহাল দশা
বিগত সরকারের শুরু করা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পথেই হেঁটেছে অন্তর্বর্তী সরকারও। সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এমন নীতির কারণে ইউনূস সরকারের দেড় বছরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি।
অন্যদিকে, বিভিন্ন দল, সংগঠন ও পেশাজীবীদের রাস্তার আন্দোলন, সহিংসতা, ‘মব সন্ত্রাস’ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগও আসেনি। এমনকি, বিনিয়োগ সম্মেলন করেও সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়াগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি, যার ফলে অর্থনীতিতে গতি আসেনি।
কমতে কমতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে। গত মার্চ মাসে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ আগের বছরের একই মাসের চেয়ে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, এ সময়ে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের পরিমাণ ১০০ কোটি ৬০ লাখ (১ বিলিয়ন) ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ (১.৩১ বিলিয়ন) ডলার। সে হিসাবে নিট এফডিআই কমেছে ৩১ কোটি ডলার। শতাংশ হিসাবে কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে অস্থিরতা, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭১ কোটি ২০ লাখ (১.৭১ বিলিয়ন) ডলারের নিট এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি ছিল।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪২ কোটি ৫০ লাখ (১.৪২ বিলিয়ন) ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল বাংলাদেশে।
আর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় বেসরকারিখাতে সেভাবে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি।

বিবিএসের হিসাবে, ২০২৪ সালে বেকারের সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে দেড় লাখ বেড়েছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ওই বছর শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ। ২০২৩ সালে ছিল সাড়ে ২৫ লাখ।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শ্রমশক্তি জরিপের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছিল বিবিএস।
তবে সে বছরের শ্রমশক্তি জরিপ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজার।
এ অবস্থায় নতুন গভর্নর বন্ধ কলকারখানা চালুসহ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছেন। এই তহবিল থেকে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে বেসরকারি খাত।
তবে এ ধরনের ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অত্যন্ত সতর্ক থাকার কথা বলেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, “যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাস্তবিক অর্থে উৎপাদনে ফিরতে সক্ষম, কেবল সেগুলোকে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এই সহায়তার আওতায় আনা উচিত। তা না হলে প্রশাসনিক বা অব্যবসায়িক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ করা হলে অর্থ ফেরত না আসার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।”

উন্নয়নের গতিও ধীর
রাজনৈতিক পট পরিবর্তন পরর্বর্তী ‘অস্থিরতায়’ দেশের উন্নয়ন কাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনও অব্যাহত আছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
এই আর্থিক বছরের জন্য এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গেল ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এনইসির সভায় এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেও অর্থবছরের বাকি দুই মাস মে ও জুনে ১ লাখ ২২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে।
দেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ সময়ে এডিপির বাকি বরাদ্দ কোনোভাবেই খরচ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী।
এর আাগের অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৯৩ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে এডিপিতে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার তা কমিয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছিল। তার মধ্যে খরচ করতে পেরেছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বাস্তবায়নের হার ছিল ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

কিস্তি পরিশোধেই ‘শেষ’ বিদেশি ঋণ
সংকটের সময়ে বিদেশি ঋণ পরিস্থিতিতেও নাজুক অবস্থা দেখা দিয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সবশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ৪২৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ কম।
উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যা আসছে তার প্রায় সমান চলে যাচ্ছে আগে নেওয়া ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে। অর্থাৎ দেশে যত বিদেশি ঋণ আসছে, আগে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধেই তার প্রায় পুরোটা খরচ করতে হচ্ছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৩৮০ কোটি ২৩ লাখ (৩.৮০ বিলিয়ন) ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।
গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ (৫.১৬ বিলিয়ন) ডলারের ঋণ পেয়েছিল বাংলাদেশ। আর সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছিল ৩৫০ কোটি ৭২ লাখ (৩.৫১ বিলিয়ন) ডলার।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিদেশি ঋণ পরিশোধ যেভাবে বাড়ছে, সেটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। অতীতে বেশ কিছু প্রকল্পের জন্য বাছবিচার ছাড়াই বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর বিপরীতে অর্থনৈতিক সুবিধা (রিটার্ন) কবে পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত নয়।”
“ঋণ করে বিদেশি ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বেশি উদ্বেগের বিষয় হবে। ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।”

জিডিপি প্রবৃদ্ধির কী হাল?
চলতি অর্থবছর শেষ হতে আর সপ্তাহ তিনেক বাকি। বিবিএস প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর-ডিসেম্বর) মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেশ খানিকটা কমেছে; নেমে এসেছে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে। এর মানে হল—আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের অর্থনীতি মাত্র ৩ শতাংশ বেড়েছে।
যদিও প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
গেল অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। সে অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে অন্তর্বর্তী সরকার।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, যা অর্জনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী কোম্পানি ফিচ রেটিংস।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রেডিট রেটিংস প্রতিষ্ঠানটি অর্থনীতির দুর্বলতা, ঘাটতি ও ঝুঁকির কথা তুলে ধরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হওয়ার আভাস দিয়েছে। তারা বলছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ১৮-১৯ অর্থবছরে। সে বছরই জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রথম ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়; সংশোধিত হিসাবে (ভিত্তিবছর পরিবর্তন) তা অবশ্য ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে আসে।
আগের খবর:
এডিপিতে পাঁচ খাতে অগ্রাধিকার, বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক প্রশ্ন
১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি, মে'তে ৯.৪২%
বিনিয়োগে খরা, কীভাবে ঘুরবে অর্থনীতির চাকা?
খুচরায় বিদ্যুতের দাম বাড়ল ১৬.৭%
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস 'স্থিতিশীল' থেকে 'নেতিবাচক' করল ফিচ