Published : 07 Jun 2026, 01:29 AM
দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে, যেখানে পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকারে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অর্থমন্ত্রীর যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনি অর্থনীতির গবেষকও সংশয় প্রকাশ করেছেন।
গেল ১৮ মে তারেক রহমানের সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে, যা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় ‘উচ্চাভিলাষী’ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির ৫০ শতাংশ বরাদ্দ বাড়িয়ে যে উন্নয়ন ছক আঁকা হয়েছে, সরকার সেখানে পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষেক হওয়া তারেক রহমানের সরকার বাজেট দিতে যাচ্ছে আগামী ১১ জুন, যার আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে আলোচনা আছে।
এবার বাজেট প্রণয়ন ও পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তার ওপরই সংসদে বাজেট উপস্থাপনের ভার পড়েছে। তিনি এক সময় বিএনপি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামলেছেন।
খোদ অর্থমন্ত্রী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে খেদ প্রকাশ করে বলেছেন, “‘ব্যুরোক্রেসির’ যে অবস্থা, আমাদের মানুষের যে মন মানসিকতা, দুঃখের বিষয় বলতে হয়। কেমনে বাস্তবায়ন করব (উন্নয়ন প্রকল্প)?”
অবকাঠামো ঘিরে আওয়ামী লীগ আমলে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছিল তা থেকে বেরিয়ে মানবসম্পদ তৈরির দিকে ঝোঁকার বার্তা দিচ্ছে বিএনপি সরকার।
তবে এক অর্থবছরের ব্যবধানে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে যে উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে অর্থায়ন হবে কীভাবে? অর্থের অপচয় রোধ সম্ভব হবে কিনা, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারবে কিনা, এসব প্রশ্ন সামনে আছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে উন্নয়ন কর্মসূচিতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, এর মধ্যে ৩২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা এসেছে ঋণ থেকে। সরকারি তহবিল থেকে খরচ হয়েছে ৪৮ হাজার ৯০১ কোটি টাকা আর সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকা।
এডিপির বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ পরিকল্পনা করা হয় ঋণ থেকে।
ফলে নতুন করে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরো চাপে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি হবে কিনা, সেই আলোচনাও আছে।

বরাদ্দ বাড়িয়ে কেবল প্রতিশ্রুতির বাজেট দিলেও তা বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা গেলে অপচয় ও দুর্নীতি বাড়বে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, “একটা জবাবদিহিতার সিস্টেম যদি না করা যায়, তাহলে ওই বরাদ্দ দিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। তখন বেশি বরাদ্দ হয়তো হবে, কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র অপচয় হবে, দুর্নীতি হবে।”
অপরদিকে উন্নয়ন বাজেট ঘিরে যে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে সরকার, তা বাস্তবায়নে অর্থ মিলবে কিনা সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “প্রশ্নটা হল যে এত বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে কিনা? এইটার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থটা পাওয়া যাবে কিনা? আর সেইটা যদি না করতে পারেন, তাহলে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকলেও বাস্তবে কিন্তু সেইটা দেখা যাবে না।”
ইশতেহারের পাঁচ স্তম্ভের ছকে এডিপি
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের হাল ধরে।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের অনুপস্থিতি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘ধীরে চলা’ নীতির কারণে গেল দুই অর্থবছর দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছিল।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সরকার গঠনের পর এখন তাদেরকেই সামলাতে হবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এই কঠিন ‘চ্যালেঞ্জ’।
বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে যে পাঁচ স্তম্ভের কথা বলেছিল, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনার ছক আঁকছে তারেক রহমানের সরকার।
পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কার, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংহতিকে ‘সমন্বিতভাবে’ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এরজন্য বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, আদালত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা বলছেন তারা।

এছাড়াও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে ‘অগ্রাধিকারমূলক’ বরাদ্দ পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি হাতে নিয়েছে সরকার।
বৃহৎ অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া পাঁচ খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বাধিক বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে শিক্ষা খাত বরাদ্দ পেয়েছে ১৫.৮৬ শতাংশ বা ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১.৮৪ শতাংশ বা ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে আলোচিত স্বাস্থ্য খাতে। চলতি অর্থবছরের ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বরাবরের মতো জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি বাড়তে থাকায়, বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা ও সংকট থাকায় এ খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা বাড়াতে এ খাতে রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা, যা এডিপির পঞ্চম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
সরকার বৃহৎ (মেগা) প্রকল্পের দিকে হাত না বাড়ালেও অবকাঠামোতে বরাদ্দ কম রাখা হয়নি। মোট বরাদ্দের ১৬.৭০ শতাংশ যে পরিবহন ও যোগাযোগ এবং ১০.৯০ শতাংশ জ্বালানি খাতে, তার বড় অংশের অর্থ যাবে অবকাঠামো উন্নয়নে।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাতীয় ও আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল ও নৌ যোগাযোগ সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, গ্যাস অনুসন্ধান এবং শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“এ প্রেক্ষিতেই পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এবং জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দের সাড়ে ২৭ শতাংশের মতো বরাদ্দ রাখা হয়েছে।”
অর্থাৎ সাড়ে ৮২ হাজার কোটি টাকার মতো অর্থ খরচা হবে অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রকল্পে।
এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ থোক ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়নে ১ হাজার ৪০০ কোটি এবং মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের কর্মরতদের সম্মানীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ না দেওয়া, অর্থ খচরের সক্ষমতার ঘাটতি ও দুর্নীতি নিয়ে বরাবরই সমালোচনা হয়ে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এনইসির সভায় নতুন অর্থবছরের জন্য এডিপি অনুমোদনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতির নানামুখী সংকটের মধ্যেও এডিপির আকার বাড়ানো ‘উচ্চাভিলাষী’ সিদ্ধান্ত কিনা, সেই প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, “অবশ্যই। এইখানে আমরা কিন্তু সব কথাগুলো স্পষ্টভাবে বলেছি। স্বাস্থ্য, শিক্ষাক্ষাত, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (তরুণ জনসংখ্যার আধিক্যের সুবিধা) এবং এই যুব সমাজের উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এগুলো কিন্তু সবকিছু এক জায়গায়।
“এবং এই জায়গায় বাজেট না দিলে আমরা ‘ইউনিভার্সেল হেলথ কেয়ারের’ যে কথাটা বলছি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, এটার সাথে আরও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা, এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলেতো আপনাকে বাজেট দিতে হবে, তাই না?”
তিনি বলেন, “শিক্ষার বেলাতেও তাই। শিক্ষার কিন্তু আমরা বিস্তৃতিটা বাড়াচ্ছি, এখানে কিন্তু প্রচুর ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ হবে, আপনার দক্ষতা বাড়ানো। এখানে প্রচুর ইনস্টিটিউশন হবে।”
‘উন্নয়নহীন’ দুই অর্থবছর
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উন্নয়ন প্রকল্পের গতি প্রায় থমকে যায়। বহু প্রকল্পের ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের খুঁজে না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে।
সে সংকটময় পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিগত অর্থবছরের বাজেট সংস্কার ও প্রকল্প কাটছাঁটের নীতি বেছে নেয়, ফলে উন্নয়ন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের মন্থর গতি ও রাজস্ব আদায়ে লক্ষাধিক কোটি টাকার ঘাটতির শঙ্কায় অর্থবছরের মাঝপথে এসে অন্তর্বর্তী সরকার আরও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঁটসাঁট নীতি গ্রহণ করে।
এতে করে চলতি অর্থবছরের ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপিতে কোপ পড়ে। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বড় কোপ পড়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
বিএনপি সরকার বাজেট ঘোষণার আগে চলতি অর্থবছরের প্রায় চার মাস পেলেও তাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পালে হাওয়া লাগাতে পারেনি। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক প্রকল্প বাদ দেওয়ারও পরিকল্পনার কথা বলছে সরকার।
গেল ২ জুন বাজেট বিষয়ক এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী এদিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “বিগত দিনের ১ হাজার ৩০০ প্রজেক্ট নিয়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, এর মধ্যে অনেক প্রজেক্ট এই মানদণ্ড মিট করছে না।
“এরমধ্যে আমরা অনেক বাতিল করে দেব। আর যেগুলো অনেক খরচ করে ফেলেছে, ওইগুলো আমরা ‘রিপারপাসিং’ করে আরও ‘বেস্ট রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ করা যায়, আমরা চেষ্টা করছি।”
প্রকল্প বাছাইয়ের মানদণ্ড বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রজেক্টের চারটা মানদণ্ড দিয়েছি। প্রত্যেকটা প্রজেক্টের চারটা মানদণ্ড। একটা হচ্ছে ‘ভ্যালু ফর মানি’- আমি যে টাকাটা খরচ করলাম, এটার মূল্যমান থাকতে হবে। আরেকটা হচ্ছে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’- যে ‘প্রজেক্টটা’ করছি এটার ‘রিটার্নটা’ আমার কী হবে-এটার হিসাব করতে হবে।
“তৃতীয় হচ্ছে ‘জব ক্রিয়েশন’ হচ্ছে কিনা। চতুর্থ হচ্ছে আমাদের ‘এনভাইরনমেন্টাল কনসিডারশনটা’ ঠিক হচ্ছে কিনা। আমরা ছোট দেশ, এতগুলো লোক আমরা বাস করি, পরিবেশ ধ্বংস করে দিয়ে আমরা অর্থনীতি গঠন করলে আমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। আমাদের প্রত্যেকটা প্রকল্প বাছাইয়ে এই চারটা মানদণ্ড যেটা পূরণ করবে না, ওই সমস্ত প্রকল্প আমরা বাতিল করে দিচ্ছি।”
আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক প্রকল্প কাটছাঁটের দিকে গেলেও এডিপিতে মেট্রোরেলের তিন প্রকল্পেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।
এর মধ্যে এমআরটি-৫ লাইনের জন্য রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, এমআরটি-১ এর জন্য ৩ হাজার ৯০৯ কোটি এবং চালু থাকা এমআরটি-৬ এর জন্য ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

এডিপির সবশেষ হালচাল
জুলাই অভ্যুত্থানের পর এডিপি বাস্তবায়নে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা অব্যাহত আছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ।
তাতে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেও অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) ১ লাখ ২২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৯৩ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
সে হিসাবে গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে।
আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় এডিপি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল, তা এখনও চলছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ৫০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই অর্থবছরের ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা এডিপির ৭০.৯৭ শতাংশই বরাদ্দ ছিল এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে।
‘সরকারে সক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত’
এডিপির এই বিশাল আকারকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে একে সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গেল ১৮ মে নতুন অর্থবছরের এডিপি অনুমোদনের পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু বলেন, “চলমান অর্থবছরের তুলনায় এটি বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি, যা সরকারের বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছে, এটিতে আমরা ধরে নিয়েছি একটি নির্বাচিত সরকারের সক্ষমতা অনেক বেশি।
“এফিসিয়েন্সি অনেক বেশি থাকবে এবং এটার বাস্তবায়ন ক্ষমতাও বেশি হবে।”
বাস্তবায়ন নিয়ে মন্ত্রী বলেছিলেন, “এখন বাস্তবায়ন হবে কি না, এটা তো অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবায়ন তো করতেই হবে, না হলে আমরা আমাদের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আর শিল্পের উৎপাদন কীভাবে অর্জন করব? এগুলো সব একটার সাথে একটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”
গেল ২ জুন বাজেট বিষয়ক সেমিনারেও বাস্তবায়নে বাধাগুলো কী কী তা তুলে ধরেন আমির খসরু। এরমধ্যে আমলাতন্ত্রের প্রসঙ্গও টানেন।
তিনি বলেন, “বড় বাজেট বাস্তবায়িত হয় না। একদম সঠিক কথা। বাস্তবায়িত হয় না, বাস্তবায়িত করতে পারে না। কার কারণে পারে না, কেন পারে না, কোথায় পারে না, কোথায় বাধাগ্রস্ত, আমরা তো ‘আইডেন্টিফাই’ করতেছি।”

জবাবদিহিতা ও সক্ষমতায় জোর
বরাদ্দ বাড়ালেই যে ফল মিলবে, তা মনে করেন না অর্থনীতির গবেষকরা। তারা ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে বলেছেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এখানে দুটো বিষয়—একটা হচ্ছে যে অর্থ খরচ, দ্বিতীয় হচ্ছে গুণগত মান বজায় রেখে খরচ করা, যাতে প্রকল্প থেকে লক্ষণীয় ফল আসে।
সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে অনেক সময় বলি যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক খাতগুলোতে বরাদ্দ এত কম। তুলনীয় দেশগুলোর চাইতে কম। এটা একটা আমাদের আক্ষেপ কিংবা ‘কমপ্লেইন’ বলতে পারেন। কিন্তু অন্যদিকে এটাও মাথায় রাখা যে বরাদ্দ বাড়ালেই কী সবাই শিক্ষিত হয়ে যাবে বা শিক্ষার গুণগত মান বেড়ে যাবে? এটা হয়ে যাবে, তা তো না।
“আবার স্বাস্থ্যসেবা খুব মান বেড়ে যাবে, এটাও না। পৃথিবীর বহু দেশেই, এটা আমাদের দেশেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে দুটো বিষয় এক না।”
এই গবেষকের মতে, বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকার দেখাতে চায় যে তার একটা দায়বদ্ধতা আছে, এই খাতটাকে সে গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধুমাত্র রাস্তাঘাট ও ভৌত অবকাঠামো না, সামাজিক অবকাঠামোতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী যে কাজ, সেটা কিন্তু আর করা হয় না।
প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “ওই রকম একটা জবাবদিহিতার সিস্টেম যদি না করা যায়, তাহলে ওই বরাদ্দ দিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। তখন বেশি বরাদ্দ হয়তো শুধুমাত্র অপচয় হবে, দুর্নীতি হবে।”
বড় বাজেট ও এডিপি হাতে নেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনি ‘প্রতিশ্রুতি’ পূরণের পথে হাঁটা শুরু করেছে সরকার, সেরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন।
তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
দরিদ্র, দুঃস্থ ও সচ্ছলদের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় শতাধিক কর্মসূচি থাকার কথা তুলে ধরে জাহিদ হোসেন বলেন,
“এগুলোর ‘পারফরম্যান্স’ দেখি, যাদের জন্য কর্মসূচিগুলো দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না।”
এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “ব্যবস্থাপনার সমস্যা আছে, যার কারণে ১ টাকা দিতে গিয়ে আপনার দেড় টাকা খরচ হয়। এই সমস্যাগুলো, এই যে নতুন কর্মসূচিতে এগুলো থাকবে না, সেটা তো আমরা ধরে নিতে পারি না।”