Published : 24 Jul 2026, 01:12 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ঘেরাটোপ দিয়ে ‘ফিমেল জোন’ চালু করা হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকালে এ ‘ফিমেল জোন’ উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ। সেদিনই টিএসসির খাবার তালিকায় নতুন আইটেম যোগ করা হয়।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ‘জোন’ করার কেন দরকার পড়ল, এমন প্রশ্নের উত্তরে ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক উম্মে সালমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের অনেক নারী শিক্ষার্থীদের চাওয়া ছিল। আমরা দেখেছি, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা রুম আছে। সেখানে যে কেউ চাইলে পর্দা-হিজাব মেইনটেইন করে খেতে পারে।
“কিন্তু টিএসসিতে ছিল না। তাই আমরা নারী শিক্ষার্থীদের বিষয়টা চিন্তা করে টিএসসিতে জাস্ট একটা টেবিল পর্দা দিয়েছি। এটাতে তো কারো সমস্যা হওয়ার কথা না। তাও একদল এটা নিয়ে রাজনীতি করছে।”
তবে এ উদ্যোগের পেছনে ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি’ দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন।
তার ভাষ্যে, “নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করতে হলে যেসব কাজ প্রথমে করা উচিত তা না করে ছাত্রশিবির হিজাব-পর্দা, ইসলামকে ব্যবহার করে রাজনীতি করছে। তারা যদি আসলেই নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্যে করত, তাহলে প্রথমত টিএসসির ফিমেল ওয়াশরুমগুলো নিয়ে কাজ করা দরকার ছিল।
“নারীদের প্রোপার স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করত। তারা এসব না করে বরং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছে।”

সবশেষ ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তি) হয়ে ভিপি পদে লড়াই করা আব্দুল কাদেরও একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
‘ফিমেল জোন’ নিয়ে বৈষম্যবিরোধীর্ ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এ সমন্বয়ক ফেইসবুকে লিখেছেন, “এটাকে আপাতত দৃষ্টিতে ভালো উদ্যোগ হিসেবেই দেখি। কারণ হিজাব-নিকাব পরা পর্দানশীন নারী শিক্ষার্থী এবং অন্য অনেক নারীরাই পাবলিক পরিসরে খাবার খেতে অস্বস্তি বোধ করেন, বিড়ম্বনার শিকার হন। টিএসসি তো সব ধরনের শিক্ষার্থীদের আগমনের জন্য, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সবার জন্য উপযুক্ত এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, যতদূর সম্ভব কম্পোর্ট জোন তৈরি করা; প্রতিবন্ধকতা নিরসন করা।
“তবে ডাকসু নেতৃবৃন্দ নারী শিক্ষার্থীদের যে নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে আলাদা করে পর্দার ঘেরাটোপ বানাচ্ছেন, সেই ডাকসু টিএসসিতে নারীদের ওয়াশরুম বিড়ম্বনা নিয়ে কনসার্ন না। ব্যবহার অনুপযোগী ফিমেল ওয়াশরুম নিয়ে নারী শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন, সেই বিড়ম্বনা থেকে তাদেরকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য ডাকসু ততটা আগ্রহের সাথে কাজ করে নাই, যতটা আগ্রহ আর উৎসাহ পর্দাঘেরা ফিমেল জোন নিয়ে করেছে।”
আব্দুল কাদের লিখেছেন, “ডাকসুকে শুরুর দিন থেকে একটা নির্দিষ্ট ঘরানার মানুষের সুবিধা-অসুবিধাকে প্রায়োরিটি দিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে। কালচার প্রোগ্রাম বলেন আর পর্দার ঘেরাটোপের কথা বলেন, সবকিছু কেনো জানি একটা নির্দিষ্ট ইডিওলজি বেইজড। বাদবাকিদের বিষয়টা উপেক্ষিত।
“তাছাড়া পর্দানশীন নারীরাও তো ওয়াশরুম বিড়ম্বনার শিকার। কেবল তাদের পর্দার ঘেরাটোপে খাবারের ব্যবস্থা করলে হবে? নির্বাচনের আগে দিয়ে পর্দার আড়ালে থেকে বক্তব্য দিয়ে নির্বাচন পরবর্তীতে নারীকে অসম্মান করার মতো চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সৎ নিয়ত থাকলে সব দিক ভাবতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনা দশেক ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তাদের মধ্যে আট শিক্ষার্থীর ভাষ্য এমন—নারীদের সমস্যা যদি আসলেই সমাধান করার চেষ্টা থাকত, তাহলে আলাদা কক্ষ করতে পারত। ঘেরাটোপ দিয়ে টিএসসিতে একধরনের ‘বিভেদ’ তৈরি করা হয়েছে— একজন ‘ধার্মিক’, বাকিরা ‘অধার্মিক’। একটি মুক্ত চিন্তার জায়গাতেও এ ধরনের বিভক্তিতে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য’ রয়েছে।
শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ফাহিমা রহমানের কথায়, “নারীদের সমস্যার শেষ নেই। বহিরাগত থেকে শুরু করে এখানে এমন কোন ব্যবস্থা নাই, নারীরা খুব ভালোভাবে চলতে বা থাকতে পারবে। সেসব নিয়ে কাজ নাই। শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বানানোর পাঁয়তারা।”
সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী লুতফা বলেন, “শিবির আবার সেই আগের রাজনীতিতে ফেরত গিয়েছে। সবকিছুকে ইসলামীকরণ না করলে তাদের হয় না।
“টিএসসির একটা ওয়াশরুম মেয়েদের ব্যবহার করার মত অবস্থা নেই। এসব নিয়ে তো কাজ নাই। শুধু ধর্ম কায়েম করাই তাদের কাজ।”
তবে দুই নারী শিক্ষার্থী ‘ফিমেল জোন’ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তাদের একজন আলমিনা আক্তার বলেন, “আমরা অনেক টিএসসিতে বসতে চাইলেও পারি না। পর্দা করি।
“সো আমাদের জন্য অ্যাটলিস্ট নাস্তা করতে চাইলে বসে খেতে পারব। আমি এতো টিএসসি যাই না। তাও কেউ যদি পর্দা করতে চায়, ভালো।”
সোশাল মিডিয়ায় সমালোচনা
টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় ‘ফিমেল জোন’ উদ্যোগের সমালোচনা করেছে ফেইসবুকে সরব হয়েছেন অনেকেই।
কবি, লেখক ব্রাত্য রাইসু লিখেছেন, “এই ক্যাফেটেরিয়া মেয়েদের মধ্যে যারা হিজাব করেন শুধুই কি তাদের জন্যে? নিশ্চয়ই না। এর কারণে কি হিজাব পরা মেয়েদেরকে খাবারের দোকানগুলিতে কম দেখা যাবে? নিশ্চয়ই না।
“তাইলে এই পর্দাঘেরা আলোচনার জায়গা তৈরি করা হইল কেন? কারা এইখানে রাজনৈতিক আলাপ করবেন? কাদের সঙ্গে? কী আলাপ?”
কথাসাহিত্যিক ও কবি সেজান মাহমুদ লিখেছেন, “আমি আমেরিকার ৭টা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি, নিজে পড়েছি হার্ভার্ডে। কিন্তু কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম অর্জন দেখি নাই! নারীকে পর্দায় বন্দী করাও অর্জন!! ব্রাভো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!”
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম লিখেছেন, “আমার কোনভাবেই বুঝে আসলোনা যে একটা কো-এড প্রতিষ্ঠানের ক্যাফেটেরিয়ায় কেন ফিমেইল জোন থাকবে। আজকে এইটা নিয়ে না বললে কালকে দেখবো ক্লাসরুমের মাঝখানে ফিমেইল জোন, স্বপন মামার দোকানেও ফিমেইল জোন তুলছে।
“জামাতি বুদ্ধি যতটুকু দেখাইলে মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলা যায়, এরা ততটুকুই করছে।”