Published : 23 Jul 2026, 04:44 PM
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নিয়োগের শর্ত ভেঙেছেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
এ অবস্থায় আইনি ব্যাখ্যা খুঁজতে কমিশনের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের আইন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করেছেন মাসুদ খান। বৃহস্পতিবার তার মন্ত্রণালয়ে যাওয়ারও কথা রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে মাসুদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকমকে বলেন, “ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য হিসেবে আমার দায়িত্ব একটি সম্মানসূচক, অবৈতনিক এবং অ-নির্বাহী দায়িত্ব। এটি কোনো চাকরি, পেশাগত নিয়োগ বা কর্ম-সম্পর্ক নয়।”
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় গত ২০ জুলাই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাদের ট্রাস্টি বোর্ডে নতুন তিন সদস্যের যোগ দেওয়ার কথা জানায়। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান ছাড়া বাকি দুজন হলেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের (এলএসই) এডেন সেন্টার ফর এডুকেশন এনহ্যান্সমেন্টের ডিরেক্টর ড. ক্লেয়ার গর্ডন এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সাবেক উপচার্য অধ্যাপক ইমরান রহমান।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ওয়েবসাইটে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে মাসুদ খানের ছবি ও বর্তমান পরিচয়ও তুলে ধরেছে।
বিএনপি সরকার গঠন করার প্রায় সাড়ে তিন মাস পর গত ৪ জুন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান মাসুদ খানকে বেছে নেয়।
সেদিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “জনাব মাসুদ খানকে অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ এর ধারা ৫(২) অনুযায়ী যোগদানের তারিখ হতে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ প্রদান করা হল।’’
ওই আইনের ৬(ঙ) ধারায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি চেয়ারম্যান বা কমিশনার নিযুক্ত হওয়ার বা থাকার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি কোনো কোম্পানি বা সংস্থায় পরিচালক কিংবা কর্মকর্তা পদে নিযুক্ত হন৷
সে কারণে মাসুদ খান একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডে যোগ দিয়ে ‘অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্ত’ লঙ্ঘন করেছেন কি না এবং আইনের ৬(ঙ) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যান পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে মাসুদ খান বলেন, “ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য হিসেবে বছরে মাত্র চারটি সভায় অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয়। এটি একটি সীমিত, অবৈতনিক ও নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব, যা বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনে কোনোভাবেই প্রভাব ফেলে না এবং আমার স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত দায়িত্ব পালনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক রাখলে বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদ প্রশ্নবিদ্ধ হবে কি না বা নিরপেক্ষতা হারাবে কি না, সেই প্রশ্নে মাসুদ খান বলেন, “বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে আমার দায়িত্ব আইন, বিধি ও সুশাসনের নীতিমালা অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে পালন করা এবং আমি সেই দায়িত্বই পালন করে যাচ্ছি।
“আমার কর্মজীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় সততা, নিরপেক্ষতা এবং স্বার্থের সংঘাত পরিহার—এই নীতিগুলো আমি সর্বদা অনুসরণ করেছি এবং ভবিষ্যতেও করব।’’
তবে নিয়োগপত্রের শর্ত লঙ্ঘন হয়ে থাকলে ‘সিদ্ধান্ত বদলাবেন’ জানিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি কমিশনের আইন বিভাগের সঙ্গে আরো আলোচনা করব। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও আলোচনা করে দেখব। যদি আইনের ব্যত্যয় হয় তাহলে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য পদ ছেড়ে দেব।”
বৃহস্পতিবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে একটি বৈঠক করতে যাবেন মাসুদ খান। সেই বৈঠকের পর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নিয়োগ দেওয়ার সময়ে শর্ত স্পষ্ট করা হয়েছে। এখন দায়িত্ব নেওয়ার পরে অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনের ধারাগুলো অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে। তারপরে বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অলাভজনক বিবেচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক ফোরাম এটি।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সকল নিয়োগ বিধি, আর্থিক সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির নীতি কী হবে, সেসব সিদ্ধান্ত ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরাই নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ অনেকটা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা পালন করে। পার্থক্য শুধু কোম্পানির পরিচালক হতে হলে ওই কোম্পানির শেয়ারধারক হতে হয়। বছর শেষে শেয়ারের বিপরীতে মুনাফার অংশীদার হওয়া যায়।
অন্যদিকে অলাভজনক হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা মুনাফার অংশ পান না। সদস্য হতে কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক একজন সিনিয়র সচিব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কমিশন চেয়ারম্যান সার্বক্ষণিক দায়িত্বের পদ। এরকম সার্বক্ষণিক যত পদ আছে, তাদের অন্য কোথাও সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ নাই। এটা একটু নিয়মের ব্যত্যয়, কনফ্লিক্ট হয়।
“ট্রাস্টি যেহেতু অলাভজনক পদ, এখানে কারো বিশেষজ্ঞ হিসেবে অবদান রাখার সুযোগ থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি মন্ত্রণলায়ের অনুমতি নিয়ে থাকেন, তাহলে সমস্যা নাই। না নিয়ে থাকলে একটু ব্যত্যয় হয়েছে।”
এ বিষয়ে কথা বলতে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অফিস অব কমিউনিকেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর ফাতিয়ুস ফাহমিদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।