Published : 10 Jun 2026, 08:10 PM
সাময়িক হিসাবের প্রাক্কলনে বিদায় নিতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আগের বারের চেয়ে খানিকটা বেড়েছে; সেই সঙ্গে মাথাপিছু আয় প্রথমবারের মত ৩ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
সরকারের এই প্রাক্কলন বলছে, চলতি অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদন ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
সাময়িক হিসাবে বিদায়ী আর্থিক বছরে মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে প্রথমবারের মত ৩ হাজার ডলার ছাড়িয়ে ৩ হাজার ২০ ডলারে উঠেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ১৪ পয়সা) যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৩ টাকার সমান।
গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৬৯ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২০ টাকা ৮২ পয়সা) ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা।
সাময়িক হিসাবে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাবে তা দশমিক ৪৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে।
আর মাথাপিছু আয় ৫১ ডলার কমে ২ হাজার ৭৬৯ ডলারে নেমে আসে। সাময়িক হিসাবে তা ছিল ২ হাজার ৮২০ ডলার।
বুধবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মাথাপিছু আয়, জিডিপিসহ অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের সাময়িক এই হিসাব প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সাময়িকভাবে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস।
২০২৫-২৬ অর্থবছর শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে; শেষ হবে ২০২৬ সালের ৩০ জুন। এই আর্থিক বছর শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, জিডিপির আকার ও মাথাপিছু আয়ের চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করল বিবিএস।
এর আগে গত ১৩ জানুয়ারি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছিল পরিসংখ্যান ব্যুরো। তাতে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার তথ্য এসেছিল।
এর পর ৬ এপ্রিল দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করে ব্যুরো। তাতে ৩ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা জানানো হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন। তাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তার আগের দিন বুধবার বিদায়ী অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করল বিবিএস।
সেখানে দেখা যায়, সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি মূল্যে জিডিপি আকার দাঁড়িয়েছে ৫০১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা।
চূড়ান্ত হিসাবে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪৫৬ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে অন্তর্বর্তী সরকার।
তার আগের অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা বলেছিল বিবিএস। তবে চূড়ান্ত হিসাবে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অর্জনের খাত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বরাবরই সামনে তুলে ধরেছে।
২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা সর্বপ্রথম ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়; পরে সংশোধিত হিসাবে তা অবশ্য ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে আসে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ওটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
তার পরের বছর কোভিড মহামারির ধাক্কায় তা ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে উঠেছিল। পরের বছর ৭ শতাংশ ছাড়ালেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবার ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমে আসে।
গত বছরের ১ জুলাই শুরু হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার।
কৃষিতে ও সেবা খাতে বেড়েছে, কমেছে শিল্পে
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, কৃষি ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে; তবে শিল্প খাতে কমেছে।
সাময়িক হিসাবে কৃষি খাতে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে যা ছিল ২ দশমিক ৪২ শতাংশ। সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়েছে।
তবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে।
মাথাপিছু আয় কী
মাথাপিছু আয় ব্যক্তির একক আয় নয়। দেশের অভ্যন্তরের আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয়সহ যত আয় হয়, তা একটি দেশের মোট জাতীয় আয়। সেই জাতীয় আয়কে মাথাপিছু ভাগ করে এই হিসাব করা হয়। এটি দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয়।
বিবিএসের হিসাবে দেখা গেছে, দুই বছর মাথাপিছু আয় কমার পর গত অর্থবছরে মানুষের গড় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলার।
এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরের মাথাপিছু আয় কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৪৯ কোটি ডলার। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে ২ হাজার ৭৩৮ ডলার হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২ হাজার ৭৬৯ ডলার ওঠে।
বিনিয়োগ ২৭.৯৩ শতাংশে নেমেছে
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বিদায়ী অর্থববছরে দেশে বিনিয়োগ হয়েছে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।
এ হিসাবে জিডিপির ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে দেশে। এই বিনিয়োগ গত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশের নিচে, ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমে আসে।
ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ যে বিনিয়োগ হয়েছে, তার মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।
গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপির সাপেক্ষে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ছিল ২২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। সরকারি বিনিয়োগ জিছিল ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপির ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছিল। এর পর ১১ বছরে এত কম বিনিয়োগ আর কখনই হয়নি দেশে। এমনকি কোভিড মহামারীর সংকটের সময়েও এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। জাতীয় বিনিয়োগ জিডিপির ৩০ থেকে সাড়ে ৩২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির ৩২ দশমিক ২১ শতাংশ অর্থ দেশে বিনিয়োগ হয়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ।
মহামারীর ধাক্কায় ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশ ও ৩১ দশমিক শূন্য দুই শতাংশে নেমে আসে।
২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে ফের ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে ৩২ দশমিক শূন্য দুই শতাংশে দাঁড়ায়।
মহামারীর ধাক্কা কাটতে না কাটতেই ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হয়। চার বছর পার হয়েছে—সেই যুদ্ধের মাশুল এখনও দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বেড়েছে ডলারের দাম। এর মধ্যেও ২০২১-২২ অর্থবছরে জাতীয় বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে ৩২ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশে উঠেছিল। এরপর থেকে কমছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছিল দেশে। তার আগের অর্থ বছরে (২০২২-২৩) এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ।