Published : 06 Jun 2026, 01:52 AM
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছরের শাসন পেরিয়ে ত্রয়োদশ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপির নতুন সরকার কয়েকদিন পর নতুন অর্থবছরের বাজেট দেবে।
তার আগে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ও সরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এসেছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও নিম্নমুখী।

এ অবস্থায় ক্ষমতার ১০০ দিন পার করা তারেক রহমান সরকারের নেতৃত্বে অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটবে কীভাবে, সে আলোচনা সামনে এসেছে।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এড়াতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গতিহীনতা, আর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতের অস্থিরতায় দেশে শিল্প স্থাপনের নতুন উদ্যোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে আছে।
নতুন সরকার আসায় ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকরা বিনিয়োগ নিয়ে আশবাদী হয়ে উঠলেও ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় বিনিয়োগ কতটা বাড়বে—তা নিয়ে সংশ্রয় প্রকাশ করেছেন তারা।
অন্যদিকে বর্তমান সময়কে একটি ‘বহুমাত্রিক’ সংকটের কাল হিসেবে অভিহিত করে অর্থনীতির গবেষক বলছে, নতুন সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে; অর্থনীতির চাকা সচল করতে এর বিকল্প কিছু নেই বলে তারা মনে করছেন।
অর্থনীতির গবেষক ও বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নতুন সরকারের মূল্যায়নের সময় এখনও আসেনি। আরও কিছুদিন সময় লাগবে। তবে আমি বলবো—সবার আগে বিনিয়োগের দিকে নজর দিতে হবে।
“সেটার লক্ষণ অবশ্য দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দেখা যাক কী হয়?”
সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি
কোরবানির ঈদের ছুটির আগে ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ‘উইকলি সিলেক্টেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নবম মাস মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৪৩ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের মার্চ শেষে, অর্থাৎ আগের (২০২৪-২৫) অর্থবছরের নয় মাসে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।
এ হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এর মানে হচ্ছে—চলতি বছরের মার্চে ব্যাংকগুলো গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৭২ দশমিক বেশি ঋণ বিতরণ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য আছে। তাতে দেখা যায়, দুই যুগের মধ্যে গত মার্চ মাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেসরকারি ঋণে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসলে দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এর আগে এত কম প্রবৃদ্ধি কখনই হয়নি।”
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ানি-জুন) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা আছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
মার্চ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির হিসাব অনুযায়ী, লক্ষ্যের চেয়ে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ঋণ না বাড়লেও কেবল সুদ যোগ হয়ে স্থিতি বেড়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদহার বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। কেননা এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয় সুদহার যোগ করে।
গত মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ঋণ ও আমানতে সুদহারের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ মাস জুন শেষে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় ২০২৪ সালের অগাস্টে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
যদিও কোভিড মহামারীর সময় বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।

আঁটসাঁট মুদ্রার নীতির উল্টো ফল?
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মূল্যস্ফীতি চড়তে শুরু করে, এক পর্যায়ে নীতি সুদহার বাড়িয়ে লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক সহিংসতা, অবরোধ, ইন্টারনেট বন্ধসহ নানা কারণে অর্থনীতি ধাক্কা খায়। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও ‘মব সন্ত্রাস’সহ নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে আরও আঁটসাঁট মুদ্রানীতির পথে হাঁটে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময় কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে আনা হয়, তাতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খেলেও মুদ্রাস্ফীতি কমেছে সামান্যই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তার মানে, গেল বছর এপ্রিলে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছর এপ্রিলে কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪ পয়সা।
কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দুই সূচক বিপরীত ধারায় উল্টো দিকে গেছে।
ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন দিয়ে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে, সে মাসে বেসরকারি ঋণ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, কোভিড মহামারীর পর অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর মুখে ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হয়। তার প্রভাব পড়ে টালমাটাল অর্থনীতিতে।
তারপরেও মহামারীর পর ২০২২ সালের অগাস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে উঠেছিল। ওই মাসে সার্বিক মূল্যাস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।
এরপর থেকে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে, আর মূল্যস্ফীতি বাড়া-কমার মধ্যে ছিল।
বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সঙ্কোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করছে। ফলে সব ধরনের ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেরও একটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ-এবিবির সাবেক এই সভাপতি।
মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেকোনো দেশের বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হচ্ছে বিনিয়োগ সহায়ক অনুকূল পরিবেশ। মাঝে দেশে স্থিতিশীলতা ছিল না; অনিশ্চয়তা ছিল। ওমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন—তেমনটা আশা করা মোটেই সমীচীন ছিল না।”
তিনি বলেন, “নতুন সরকার এসেছে; এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। আশা করছি—বিনিয়োগ বাড়ছে; কর্মসংস্থানও হবে।”

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ইরান যুদ্ধ নতুন সরকারের শুরুতেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। এই ধাক্কা সামলে ওঠা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
বিজিএমইএর সাবেক এই নেতা বলেন, “যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বই এখন টালমাটাল; থামবে থামবে বলেও থামছে না। রপ্তানি আয় কমছে। বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে হয় না।
“সবচেয়ে বড় কথা—১৫/১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করবে কে? সত্যিকার অর্থে দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সুদের হার কমাতেই হবে।”
তিনি বলেন, “করোনা ভাইরাস মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের দর বৃদ্ধি, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা-সংঘাত, ইরান যুদ্ধ—একের পর এক ধাক্কায় আমাদের অর্থনীতি চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।”
“এমনটা চলতে থাকলে আমাদের কপালে কী আছে কে জানে,” বলেন আনোয়ার-উল আলম।

এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি
গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের বিনিয়োগে চলছে ধীরগতি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উন্নয়ন প্রকল্প কাঁটছাঁট করার ধারাবাহিকতায় সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি বাস্তবায়ন মন্থর হয়ে পড়ে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এডিপি ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
যদিও এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেও অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) ১ লাখ ২২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে সরকারকে।
তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৯৩ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অর্থাৎ গেল অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে।

কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ
সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ।
গেল ৬ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) তথ্য প্রকাশ করে।
এই তথ্য বলছে, এই নয় মাসে ১০০ কোটি ৬০ লাখ (১ বিলিয়ন) ডলারের নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিযোগ-এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ (১.৩১ বিলিয়ন) ডলার।
অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে দেশে নিট এফডিআই কমেছে ৩১ কোটি ডলার বা ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাই নিট বিদেশি বিনিয়োগ।
চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে দেশে। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের নিট এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ।
দেশে গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে ‘উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার’ কথা বলত আওয়ামী লীগ সরকার।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে অস্থিরতা, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭১ কোটি ২০ লাখ (১.৭১ বিলিয়ন) ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৪২ কোটি ৫০ লাখ (১.৪২ বিলিয়ন) ডলার।

জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম বিনিয়োগ
সরকারি হিসাবেই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে দশ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বিবিএসের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার, টাকার হিসাবে ৫৫ লাখ ১৫ লাখ ২৬ কোটি টাকা। এ সময়ে সব মিলিয়ে দেশে বিনিয়োগ হয়েছে ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জিডিপির ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে দেশে। দশ বছর পর জিডিপির সাপেক্ষে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, এই বিনিয়োগের মধ্যে বেসরকারি খাতে হয়েছে জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। আর সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপির ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছিল। এর পর এত কম বিনিয়োগ আর হয়নি দেশে। এমনকি কোভিড মহামারীর সময়েও এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির ৩২ দশমিক ২১ শতাংশ অর্থ দেশে বিনিয়োগ হয়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ। এ সময় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর সরকারের বিনিয়োগ ছিল ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
কোভিড মহামারীর ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ কমে জিডিপির ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরো কমে ৩১ দশমিক ০২ শতাংশ হয়। তখন বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৩ দশমিক ৭০ শতাংশ; সরকারের ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থনীতির গবেষক জাহিদ হোসেন মনে করেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের একটি আবহ তৈরি হয়েছিল, সে কারণেই ওই সময় দেশে বিনিয়োগ বেড়েছিল।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন এক সরকার ক্ষমতায় থাকার ধারাবাহিকতার কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা খুব একটা ছিল না। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি ছিল, আস্থা ছিল। মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে এক ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের একটা অনুকুল পরিবেশ ছিল দেশে। সে কারণেই বিনিয়োগ খানিকটা বেড়েছিল।
“কিন্তু মাঝের দেড় বছর দেশের পরিস্থিতি আমরা সবাই জানি। কোনো কিছুই ঠিকঠাক মতো চলেনি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ভালো ছিল না। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। এ সবের কারণেই দেশে বিনিয়োগে মন্দা দেখা দিয়েছিল।”
জাহিদ হোসেন বলেন, “নতুন সরকার এসেছে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসছে। এখন দেখা যাক, কী হয়।”

‘বিনিয়োগ সচল না হলে সব আটকে যাবে’
বিএনপি সরকার সরকার অর্থনীতির গতি ফেরাতে বন্ধ কারখানা চালু ও বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে থাকা অতিরিক্ত তারল্য থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
করোনা ভাইরাস মহামারীর পরেও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকারের তরফে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। এবার বিএনপির নতুন সরকারের এই প্যাকেজে অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’ এর চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে বিনিয়োগকে সচল করার কোনো বিকল্প নেই। বিনিয়োগ যদি সচল করা না যায়, তবে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বৈচিত্র্যকরণ এবং উৎপাদনশীলতা—সবকিছুই আটকে যাবে।
“বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে, যা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের সংস্কার অপরিহার্য।”
তার মতে, বর্তমান সময় একটি বহুমাত্রিক সংকটের কাল।
“আমাদের অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এটি বিনিয়োগের জন্য এক অশনিসংকেত।”
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বিনিয়োগ বাড়াতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি তুলে ধরে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বলেন, “বিনিয়োগ পরিবেশ এখন একটি ভাঙা ঘর। এই বাড়ি মেরামত না করে যদি আমরা ভাড়াটে বা বিনিয়োগকারী খুঁজতে যাই, তবে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। তাই নতুন সরকারকে বিনিয়োগেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।”
এ বিষয়ে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, “যেহেতু আগামী বছরেও রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে না, তাই সরকারকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হবে। যে প্রকল্পগুলো থেকে বাণিজ্যিক রিটার্ন আসার সম্ভাবনা আছে, সেখানে সরকারি টাকা খরচ না করে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে।
“দ্বিতীয়ত, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর তৃতীয়ত, কেবল উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বা ‘অ্যাসপিরেশনাল প্ল্যান তৈরি করলেই হবে না; এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।”