Published : 03 Jun 2026, 03:32 PM
জ্বালানি তেলের পর এবার পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, বিইআরসি, যাতে সাধারণ গ্রাহকের খরচ বাড়ছে ১৬.৭ শতাংশ।
পাইকারি বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। এতে পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ইউনিটপ্রতি ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা করা হয়েছে। এতে সঞ্চালন চার্জ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
আর খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন গ্রাহকশ্রেণির বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে গড় দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
বুধবার রাজধানীর রমনায় কমিশন কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেন।
তিনি জানান, নতুন দাম জুন মাসের বিল থেকে কার্যকর হবে। গ্রাহকশ্রেণিভিত্তিক বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত থাকছে।
নতুন খুচরা মূল্যহার অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের লাইফলাইন বা ০ থেকে ৫০ ইউনিটের দাম ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ধাপে ০ থেকে ৭৫ ইউনিটের দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটে ৮ টাকা ৫০ পয়সা, তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিটে ৯ টাকা ১০ পয়সা, চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটে ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সেচ ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাম্পের জন্য নিম্নচাপে ইউনিটপ্রতি দাম ৬ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছে।

বাণিজ্যিক ও অফিস গ্রাহকদের নিম্নচাপে ফ্ল্যাট রেট ইউনিটপ্রতি ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা, অফ পিকে ১৩ টাকা ৮২ পয়সা এবং পিকে ১৮ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোন ধরনের গ্রাহকের কত শতাংশ বাড়ল
আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি দাম বেড়েছে ৬৯ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৪ পয়সা। নতুন দাম অনুযায়ী আবাসিক প্রান্তিক গ্রাহকদের ০–৫০ ইউনিটের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি দাম ৬৯ পয়সা বা ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে।
০–৭৫ ইউনিটে ৯২ পয়সা বা ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ৭৬–২০০ ইউনিটে ১ টাকা ৩ পয়সা বা ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০১–৩০০ ইউনিটে ১ টাকা ৫১ পয়সা বা ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ৩০১–৪০০ ইউনিটে ১ টাকা ৬০ পয়সা বা ১৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেড়েছে। ৪০১–৬০০ ইউনিটে ২ টাকা ৩৪ পয়সা বা ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে ২ টাকা ৭৪ পয়সা বা ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।
সেচ ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ৭৯ পয়সা বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ও হাসপাতালের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫০ পয়সা বা ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৭৫ পয়সা বা ১৮ দশমিক ২ শতাংশ।
বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশনের জন্য ইউনিটপ্রতি দাম ১ টাকা ৭৪ পয়সা বা ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
বাণিজ্যিক ও অফিস শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ২ টাকা ৩৫ পয়সা বা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
ক্ষুদ্র শিল্পে ইউনিটপ্রতি দাম বেড়েছে ১ টাকা ৯৭ পয়সা বা ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ।
৩৩ কেভি শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ২ টাকা বা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ১৩২–২৩০ কেভি শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ২ টাকা বা ১৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ দাম বেড়েছে।
ভর্তুকি দিতে হবে ৪১ হাজার কোটি টাকা
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানোর ফলে পিডিবির আয় প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়বে। এরপরও প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকবে, যা ভর্তুকি হিসেবে সরকারকে দিতে হবে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো চাপ ছিল না; তবে ১১ জুন বাজেট পেশের আগে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়টি কমিশনের বিবেচনায় ছিল।
ভোক্তার ওপর প্রভাব বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যানম বলেন, “নিঃসন্দেহে এটার কারণে মানুষের দৈনন্দিন মাসিক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। তার একটা প্রভাব পড়বে। ইকোনমিক ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস সে ধরনের কোনো বিশ্লেষণ করা হয় নাই।”
তিনি বলেন, প্রান্তিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম সবচেয়ে কম বাড়ানো হয়েছে, যাতে নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক কম পড়ে।
জালাল আহমেদ বলেন, “ক্যাপাসিটি পেমেন্টের ক্ষেত্রে কিছু হস্তক্ষেপের সুযোগ আছে। এই বিষয়গুলো আমরা নির্দেশনায় দেব, যাতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টটা হ্রাস পায়।”
লোডশেডিং ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, বিস্তারিত আদেশে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়েও নির্দেশনা থাকবে।
বিদ্যুতের দাম ভবিষ্যতে কমার সম্ভাবনা নিয়ে জালাল আহমেদ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে এলে এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে ব্যয়বহুল কেন্দ্র চালানোর প্রয়োজন কমতে পারে।
কমিশন বলেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয়, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়, পাইকারি পর্যায়ে পিডিবিকে সরকারের ভর্তুকি এবং সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
দাম বাড়ানোর পরও পিডিবির অবশিষ্ট ঘাটতি মেটাতে বছরে সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হওয়ায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে ১৮ এপ্রিল চার ধরনের তেলের দাম বাড়ায় সরকার। মে মাসে আর না বাড়ালেও জুনে এসে আবার ডিজেল বাদে বাকি তিন ধরনের তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।
জ্বালানি তেলে বাড়ানোর পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। অবশেষে বুধবার দাম বাড়ানো হল।
সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তখন গড় পাইকারি মূল্য ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছিল।
পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লে বিতরণ কোম্পানিগুলোর ক্রয় ব্যয়ও বাড়ে। সে কারণে খুচরা পর্যায়ের বিদ্যুতের দামেও পরিবর্তন আসে।
পিডিবি গেল ৩ মে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি ৫ মে সঞ্চালন মূল্যহার বাড়ানোর আবেদন করে।
খুচরা পর্যায়ে মূল্যহার পরিবর্তনের জন্য পিডিবি ও নেসকো ৩ মে, ডেসকো ৪ মে, ওজোপাডিকো ৫ মে এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও ডিপিডিসি ৬ মে কমিশনে প্রস্তাব জমা দেয়।
এসব প্রস্তাবের ওপর ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করে বিইআরসি।
গণশুনানিতে পিডিবি জানিয়েছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ সরবরাহের গড় ব্যয় ইউনিটপ্রতি ১২ টাকা ৯১ পয়সা হতে পারে। তখনকার পাইকারি মূল্য ছিল ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা।
দাম সমন্বয় না হলে ঘাটতি আরও বাড়বে বলে শুনানিতে জানিয়েছিল সংস্থাটি।
|
গ্রাহকের ধরন |
আগের দর |
নতুন দর |
বৃদ্ধি |
|
সাধারণ গ্রাহক |
৯ টাকা ১১ পয়সা |
১০ টাকা ৬৩ পয়সা |
১৬.৭% |
|
পাইকারি |
৭ টাকা |
৮ টাকা ৩৯ পয়সা |
১৯.৯% |
|
সঞ্চালন |
৩১.৩৫ পয়সা |
৩৮.৮৬ |
২৪% |