Published : 01 Jul 2026, 12:56 AM
প্রায় এক বছরের দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ আর নানা বিতর্ক পাশ কাটিয়ে যে জুলাই সনদ সই হয়েছে, সেটার বাস্তবায়ন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি এখনও রয়ে গেছে। যে কারণে রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব উদ্যোগ সামনে এসেছিল, সেগুলোর সুফল নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে।
দলগুলোর মধ্যে এ বিভক্তির এক পক্ষে আছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের মিত্ররা; আরেক পক্ষে আছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) সমমনা দলগুলো।
সরকারবিরোধী কোনো কোনো দল মনে করছে, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি ‘নানা ছুতায়’ পাশ কাটিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলে আসছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আন্তরিকতায় তাদের কোনো ঘাটতি নেই, বিরোধী দলগুলো তাদের নিয়ে মিথ্যাচারে নেমেছে।
এছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব দাবি বিরোধিরা জানিয়ে আসছেন, সেগুলোর উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দলটির কোনো কোনো নেতা।
এমন কথাও ক্ষমতাসীনদের তরফে এসেছে যে, ‘ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার জন্যই’ বিরোধীরা সংস্কারের কথা বলে আসছে।
জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোতে যখন এ ধরনের বিভক্তি, তখন এই সনদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ কতটুকু, সেই প্রশ্নও তুলেছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।
ফলে এ সনদ বাস্তবায়ন হলেও খুব একটা সুফল যে সামনের দিনে আসবে তেমনটা মনে করছেন না তারা। এ সনদ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দর্শন উপেক্ষিত হওয়ার শঙ্কাও দেখছেন কেউ কেউ।


চাকরিতে কোটা নিয়ে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। অবসান ঘটে শেখ হাসিনার সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের।
দেশের হাল ধরার পর সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে সংস্কারের আওতা বাড়িয়ে গঠন করা হয় আরো পাঁচটি কমিশন।
এসব কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক পেরিয়ে গেল বছরের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়।
এরপর নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হয়, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।
রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে ২০৯ আসনে জয় পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নেন।
অন্যদিকে আলাদা করে উভয় শপথই নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সদস্য।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে চলে আসা মতবিরোধের ফারাক সেদিনই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
সরকার গঠনের পর থেকে এখন অব্দি বিএনপির তরফে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ তারা বাস্তবায়ন করবে, তবে সেটা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দিয়ে।
আর বিরোধীদের দাবি, গণভোটের মধ্যদিয়ে যে জুলাই সনদ পাস হয়েছে, সেটি ধরেই এগোতে হবে। আর এই দাবি আদায়ে মাঠে নামার ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে তারা।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এগুলো আইনে রূপ দিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১২ মার্চ জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি করে গঠন করা হয় ১৩ সদস্যের বিশেষ কমিটি।
পরে ১৫ মার্চ আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবে সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কমিটিতে পাঠানো হয়। এগুলোর মধ্যে গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ২০টিকে এখনই আইনে রূপ না দেওয়ার সুপারিশ করে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।
আর ৯৮টি অধ্যাদেশে কোনো পরিবর্তন না এনে হুবহু এবং ১৫টি সংশোধন করে বিল আকারে তোলার সুপারিশ করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। বাকি ২০টি অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে না তোলায় বিএনপির আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধী দলের রাজনীতিকরা।
এমন প্রেক্ষাপটে অন্তবর্তী সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, “গণভোটের মাধ্যমে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদের অনুমোদন দিয়েছে। তাই ৭০ শতাংশ মানুষের অনুমোদন অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।”
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন না হলে পরিবর্তনের পথ ‘রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা’ দেখছেন তিনি। বিএনপি জুলাই সনদ মানছে না বলেও অভিযোগ তারা।
“বিএনপির জুলাই সনদ না মানাটা দুঃখজনক। এটি ঝুলে গেলে সামগ্রিকভাবে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে,” যোগ করেন তিনি।
তার এমন পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দ্বিমত করে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে তারেক রহমান ও বিএনপি আন্তরিক। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় হল- বিএনপি যে সনদে সই করেছে, তা ‘নোট অব ডিসেন্টসহ’। এর মানে হল- ‘আমি এটা এটা করব না’। সেজন্যই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া।’

ধীরে চলো নীতিতে জামায়াত ও এনসিপি
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংসদ নির্বাচনের পর সাধারণ কর্মসূচি দেয় জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। জোটের বাইরে দলগুলো আলাদা করেও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে।
এ জোটের তরফে ১৪ মার্চ হুমকি আসে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন’ ডাকা না হলে তারা রাজপথে নামবে।
সবশেষ গত শুক্রবার জামায়াতের মজলিসে শূরার অধিবেশনেও গণভোটের রায় অবিলম্বে বাস্তবায়নের বিষয়টি ওঠে।
তবে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা বলছেন, সরকারকে চাপে রাখতে তারা দাবি জানানো অব্যাহত রাখবেন। কিন্তু আন্দোলনের দিকে এখনই তারা যেতে চাইছেন না।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই ‘সংবিধান সংশোধনে’ সংসদে থাকা সব দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উঠলেও তা আর গৃহীত হয়নি।
জামায়াত শেষমেশ থাকবে?
জামায়াতে ইসলামী শেষমেশ জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আন্দোলনে থাকবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা জানিয়েছেন দলটির সঙ্গে জোটে থাকা অন্যান্য দলের একাধিক নেতা।
তাদের আশঙ্কা, এনসিপি তাদের রাজনীতির স্বার্থে ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে মাঠে থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর ‘আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে’।
এ বিষয়ে গোপনে ‘সরকারের সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগ থাকতে পারে’ বলেও ১১ দলীয় ঐক্যের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত ‘সঠিক অবস্থানে’ আছে বলে দাবি করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের কর্মসূচি চলমান আছে। সারা বছর আমরা কর্মসূচি পালন করেছি। সাধারণ মানুষ মনে করে, আমরা ‘রাইট পয়েন্টে’ আছি। সংসদে সোচ্চার, বাইরেও সোচ্চার আছি আমরা।”
তিনি বলেন, “আমরা ধাপে-ধাপে আন্দোলন এগিয়ে নেব, হুট করে তো আন্দোলন হয় না; মানুষ একটা পছন্দ করে না।”
সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ধাপে ধাপে এগোনোর আভাস দিয়েছে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক দল এনসিপি।
দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জুলাই গণহত্যার বিচার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ইতোমধ্যে দলের কর্মসূচি এসেছে।
“আমরা সারা দেশের উপজেলায় পথসভা করব। অন্তত ৫০টির মত পথসভা হবে। ফলে এনসিপি রাজপথেই আছে।”

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে অন্য কোনো দল না থাকলেও আমরা সক্রিয় থাকব, এটাই আমাদের দলের সিদ্ধান্ত।”
সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির আগ্রহের ঘাটতি দেখছেন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে থাকা আরেক দল এবি পার্টি।
দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির আদেশ অবৈধ’, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ অসাংবিধানিক’ ইত্যাদি ছুতায় তারা এখন সংস্কার থেকে পিছু হটছে।
বিএনপি ও তাদের মিত্ররা যা বলছেন
বিএনপির সঙ্গে যারা আছেন, তারা অবশ্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখছেন না।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “বিএনপি অঙ্গীকার করেছে, অক্ষরে-অক্ষরে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। প্রতিদিন তাদের নেতারা বলছেন। আমরা তাদের কথায় আস্থা রাখতে চাই।”
তবে গুম, মানবাধিকার, দুদক ও বিচার বিভাগসহ চারটি অধ্যাদেশ সরকার প্রত্যাহার করায় ‘বহুমাত্রিক প্রশ্ন’ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এই রাজনীতিক।
নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়া সাইফুল বলেন, “অন্তবর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে এসব বিষয়ে একমত হয়েছিল। সেই ভিত্তিতে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। বিএনপিও এর অংশ ছিল। কিন্তু তারা এই বিলগুলো তুলে নিল, পর্যালোচনা করবে বলে।
“পর্যালোচনা মানে নির্বাহী বিভাগকে কনফ্লিক্ট করবে না, সেটা নিশ্চিত করা। সেই বিবেচনা রেখে তারা সংস্কারের পথে যেতে পারেন, এমন কথাই কিন্তু সংসদের ভেতরে-বাইরে চাউর হয়েছে।”
এখানেই ‘আসল গোলমালের আশঙ্কা’ রয়ে গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এখন সরকারি দল কীভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু করে, সেটা বিবেচনা করে ‘পলিটিক্যাল ইস্যু’ সামনে আসবে।”
বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি জোটে থাকা গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতার মতে, দলীয়ভাবে জুলাই সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মোটা দাগে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ মিলিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন বলেও মনে করছেন কোনো কোনো নেতা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, জুলাই সনদের আলোকে দলীয় ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলো বিএনপি বাস্তবায়ন শুরু করবে।
“বাজেট অধিবেশনের পর বিষয়টি আলোচনায় আসবে বলে মনে করি।”
এর বাইরে বিষয়টি নিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ–স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে কোনো আলোচনা নেই বলে জানান একাধিক নেতা।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ একজন নেতা বলেন, “রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশে কেবল ১৯৯০ সালে ঐকমত্য হয়েছিল। এরপর রাজনৈতিকভাবে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি বড় দলগুলো।
“আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবং যখন দলটির রাজনীতির বৈধতা নেই আইনিভাবে, এক্ষেত্রে জুলাই সনদের ‘সর্বজনীন’ ফল ঘরে তোলা বিএনপির পক্ষে কি সম্ভব?”
এ কারণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আগে বিএনপিকে আরো বেশি করে ভাবতে হচ্ছে বলে ভাষ্য এই বিএনপি নেতার।
তিনি বলেন, “প্রতিশ্রুত উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা; রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা; নারী আসন বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত আছে। কিন্তু কার্যকরের সময় গুরুত্বপূর্ণ।”
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “জুলাই সনদে তো আমরা সই করেছি, যা যা সই করেছি, প্রত্যেকটি আমরা বাস্তবায়ন করব।”
তবে বিএনপির এই নেতা এটাও যোগ করেন, “গণভোটের সঙ্গে জুলাই সনদের কোনো মিল নেই। আমরা যা যা সই করেছি নোট অব ডিসেন্টসহ, সেটাই বাস্তবায়ন করব।”
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন কী
জুলাই সনদ নিয়ে যে গণভোট হয়েছে, তাতে কিছু ত্রুটি থাকার কথা বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারিক মানজুর।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ তৈরির সময় থেকে চূড়ান্ত করা পর্যন্ত বিভিন্ন দলের মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় মতানৈক্য দেখা গেছে। একে সমন্বিত করা সহজ ছিল না। সেটার একটা রূপ শেষ পর্যন্ত দাঁড় করানো হয়েছিল এবং এর সঙ্গে থাকা দলগুলো তাতে কিছু শর্তসাপেক্ষে সই করে।
“এই সনদকে ‘হ্যাঁ/না’ গণভোটের মাধ্যমে পাস করানোর উদ্যোগের মধ্যে কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে। কারণ চারটি ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নে একই উত্তর সবক্ষেত্রে আশা করা যায় না। তাছাড়া জুলাই সনদের কিছু ধারা বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে ভালো কিনা, সেই প্রশ্নও আছে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “যেমন, বর্তমান পদ্ধতিতে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করা সহজ নয়, তাতে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন পড়ে। নতুন প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। তার মানে অর্ধেকের বেশি সদস্যের সমর্থনেই সংবিধান পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই শিক্ষকের মতে, “জুলাই সনদের মূল প্রেরণাই হলো, কোনো দল বা ব্যক্তি যেন ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে। অন্তত সংবিধান যেন তাকে সেই শক্তি না দেয়।”


রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন জুলাই সনদের সর্বজনীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, “জুলাই সনদের গণভোটে যেসব প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, সেগুলো কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝতেও পারেনি। অধিকাংশ মানুষই জানেন না প্রশ্নপত্রে কী রয়েছে।
“এজন্য একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য মানুষকে দূরে রেখে কোনো কিছু আরোপ করে দিলে সেটা কিন্তু মানুষের হয়ে ওঠে না। যে কারণে আমি মনে করি না, জুলাই সনদের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের সমর্থন, যোগাযোগ এবং এটা যে নিজের, সেগুলো আছে। এটা কয়েকটি বড় রাজনৈতিক দলের চাওয়া হয়ে থাকতে পারে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক বলেন, “এখনো বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতির অনুসারী ও সমর্থক আছে, যারা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ শতাংশ। তারাও কিন্তু বাইরে আছেন।
“এদের বাইরে যে ৬০ শতাংশ আছেন, তাদের মধ্যে যদি জরিপ করেন, তাহলেও কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, মানুষ বুঝতে পারে না। আমার মনে হয়, জুলাই সনদ জনগণের মধ্য দিয়ে হয়নি, জনগণ যতটুকু চেয়েছে, ততটুকু হয়নি।”
এমন পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে জনগণ ‘দুভাবে রিঅ্যাক্ট’ করতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “একটি হতে পারে অগ্রহণযোগ্য, অন্যটি হল প্রত্যাখ্যান। জনগণ দুটোই করতে পারে।”
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক খালিদুর রহমান মনে করেন, গেল দুই বছরে মানুষের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
“তবে সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। নির্বাচিত সরকারকে সংবিধান, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হয়। জনগণ এখন বিচার, সুশাসন, জবাবদিহি এবং সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।”
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এই শিক্ষকের দৃষ্টিতে, “জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। এটিকে দলীয় প্রতিযোগিতার বিষয় বানানো উচিত নয়।”
তার ভাষ্য, “নির্বাচিত সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের সঙ্গে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার সমন্বয় করে কার্যকর সংস্কার এগিয়ে নেওয়া।”
সম্পর্কিত খবর
'জুলাই সনদ' নিয়ে জামায়াত মিথ্যাচার করছে: মির্জা ফখরুল
জুলাই সনদে 'নোট অব ডিসেন্ট' নিয়ে কাজ করছে সরকার: আইনমন্ত্রী
জুলাই সনদের মীমাংসা সংসদে না হলে রাজপথে গড়াতে পারে: নাহিদ
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে? সংস্কারের ভবিষ্যৎ কী?
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ: ফের কমিটি গঠনের প্রস্তাব সরকারি দলের
জুলাই সনদ: সংসদে বিরোধী দলকে এক হাত নিলেন পার্থ
রাষ্ট্রপতির ভাষণ: ধন্যবাদ প্রস্তাবে বিরোধীদের আলোচনাজুড়ে জুলাই সনদ
জুলাই সনদে স্বাক্ষর করল এনসিপি, ধন্যবাদ দিলেন প্রধান উপদেষ্টা
'ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার' সংস্কার চায় বিরোধী দল: সংসদে প্রতিমন্ত্রী মুহিত