Published : 01 Jul 2026, 04:36 PM
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, নিদর্শন ও দলিল সংরক্ষণ, গবেষণা এবং প্রদর্শনের জন্য যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর করা হয়েছে, তা খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত সরকারকে সময় দিয়ে অভ্যুত্থানের এই নেতা বলেন, “৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই জাতীয় জাদুঘর খুলে দিতে হবে, না হলে জনগণ নিজেরাই সেই জাদুঘর কিন্তু খুলে নিবে এবং নিজেরাই সেই জাদুঘরে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে।”
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের যে আন্দোলন সরকার পতনের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল সেই জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার রায়েরবাজারে শহীদদের গণকবর জিয়ারত করার পর নাহিদ ইসলাম সাংবাদিককদের মুখোমুখি হন।
সকালে বৃষ্টির মধ্যেই এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। জিয়ারতের পর তারা মোনাজাত করেন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।
সেই খবর পেয়ে তখনকার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের দখল নেয় জনতা। আনন্দ উৎসবের আমেজে সরকারপ্রধানের বাসভবনে ভাঙচুর, লুটপাট চলে।
পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ শুরু হয়। উপদেষ্টা পরিষদ ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর এ প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। পরে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই পূর্তকাজেরও অনুমোদন হয়।
এই জাদুঘরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের চূড়ান্ত পর্বের পাশাপাশি তার আগের দীর্ঘ ‘দুঃশাসনের’ নমুনাও তুলে ধরা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ জারি করেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
১২ ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ত্রয়োদশ সংসদে এই অধ্যাদেশটি কিছু সংশোধনীসহ বিল আকারে পাস করা করা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, শুধু নামকাওয়াস্তে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পালন করলে হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা—সংস্কার বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে আছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাথে আছে।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমাদের যে অন্যতম দাবি যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংস্কার বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন। আমরা দেখলাম এই নির্বাচনের যে গণভোট এবং নির্বাচনের অন্যতম ‘কমিটমেন্ট’ ছিল কাঠামোগত সংস্কার, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। আমরা এই সংস্কার এখনো পাইনি।
“ফলে এবারের জুলাই গণঅভ্যুত্থান উদযাপন, সেটার বার্ষিকী পালনের আমাদের অন্যতম ‘মটো’ হচ্ছে গণহত্যার বিচার এবং সংস্কার বাস্তবায়ন।”
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মঙ্গলবার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের প্রসঙ্গ টানে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, “কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই রায় বাংলাদেশের জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

“আমি মনে করি, সেই রায়ের মাধ্যমে আমরা যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম, যারা শহীদ পরিবার, যারা আহতযোদ্ধা রয়েছে, তারা ন্যায়বিচার পায়নি। জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, যিনি আওয়ামী লীগের সহযোগী, তাদের যে ‘অ্যালায়েন্স’ ছিল সেটার অংশ ছিলেন, তিনি কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রত্যক্ষভাবে গণহত্যায় মদত জুগিয়েছিলেন। গণহত্যার যে প্রধান সিদ্ধান্তকারী শেখ হাসিনা ছিলেন, তিনি তাকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছেন।”
তিনি বলেন, “ফলে আমরা মনে করি, দশ বছর করে যে সাজা হয়েছে এটা ‘এনাফ’ নয়, যথেষ্ট না। আমাদের আবেদন থাকবে রাষ্ট্রপক্ষ যেন এটা আপিল করে এবং আমরা এটাতে কঠোর থেকে কঠোর বিচার প্রত্যাশা করছি।”
এনসিপি প্রধান বলেন, “এই সরকার আসার পর মাত্র দুইটি মামলার রায় আমরা পেয়েছি। তদন্ত দাখিলে আমরা যথেষ্ট ধীরগতি দেখছি।”
ট্রাইব্যুনাল এবং সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার নিষ্পন্ন করবে, এমন আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “শেখ হাসিনার মামলার রায় হয়েছে, আমরা আশা করবো যে, শেখ হাসিনাসহ জুলাই গণহত্যাকারী এবং ওসমান হাদির হত্যাকারী যারা পালিয়ে রয়েছে, তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। এবং শেখ হাসিনার যে ফাঁসির রায়, সেটি কার্যকর করা হবে।”
এ সময় এনসিপির উত্তর অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম নাহিদ ইসলামের কানে-কানে কিছু বললে, বিরোধী দলের চিফ হুইপ বলেন, “শহীদ পরিবারদের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তাদের আর্থিক সহায়তা, জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, সেসকল কার্যক্রম যেন যথাযথভাবে পালন করা হয়।”
তিনি আবু সাঈদ, মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরামসহ নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে নেমে আসা সকল শিক্ষার্থীদের স্মরণ করার পাশাপাশি শ্রমিক, নিম্নবিত্ত মানুষ, যারা জীবন দিয়ে ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের পতন ঘটিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান নাহিদ ইসলাম।
এ সময়ে সেখানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।