হামলার শিকার রাবির সেই দুই শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ মামলায় গ্রেপ্তার
রাকসু ও ছাত্র শিবির ধাওয়া করলে তারা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে গিয়ে আশ্রয় নেন।
রাকসু নেতা ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের হামলার শিকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুইজনকে ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের’ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন- ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আনাস আহমেদ আকাশ (২৮) এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবুল হাসান (২২)।
সোমবার রাতে মতিহার থানার ওসি মোহাম্মদ গোলাম কবির বলেন, “ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আগের করা একটি মামলায় ওই দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। বর্তমানে দুজন চিকিৎসাধীন।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, এদিন সকালে এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার একটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির দপ্তরে উপস্থিত হন।
পরে তারা দুজন রোববার রাতে প্রক্টরের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে আনাসকে প্রক্টর দপ্তরে ডাকেন। আনাস উপস্থিত হলে দুই পক্ষের কথা কাটাকাটির মাঝেই আনাসকে চড়-থাপ্পড় দেন জিএস ও এজিএস। এ সময় তাকে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের দাবিও তোলেন রাকসুর এই দুই নেতা। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় প্রক্টর আনাসকে ছেড়ে দেন।
তবে ছাড়া পাওয়ার পর আনাস তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে রাকসু কার্যালয়ে হামলা করেন বলে দাবি করেন জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।
পরে রাকসু এবং ছাত্র শিবির নেতারা তাদের ধাওয়া করলে তারা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আশ্রয় নেন। এ সময় রাকসুর জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস শাকিব, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজা ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে তাদের উপর হামলা করা হয়। এ সময় রিডিং রুমে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদেরকেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে লাইব্রেরির পরিচালক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনাস ও তার সঙ্গী দুইজনকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিতে গেলে জিএস আম্মারের নেতৃত্বে তাদের নামিয়ে ফের মারধর করা হয়।
এ বিষয়ে মো. আনাস বলেন, “প্রক্টর দপ্তরে আমাকে প্রথমে ছাত্রলীগ কর্মী আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়। পরে গ্রন্থাগারেও তার ওপর হামলা চালানো হয়। আমি কখনোই ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম না।”
ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তার বন্ধুদের সঙ্গে ছবি দেখিয়ে তাকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে মারধরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির এবং রাকসুর নেতারা এ সময় আনাস ও তার সঙ্গীদের গ্রেপ্তারের দাবিও জানায়। এ সময় প্রশাসনকে এক ঘণ্টার সময়ও বেঁধে দেন তারা।
এরপর প্রশাসন ওই দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, “ছাত্ররাজনীতির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়েছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিসিআরকে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা যায়।”
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে হামলার বিষয়ে প্রক্টর বলেন, “লাইব্রেরির রিডিং রুমে ঢুকে মারধরের ঘটনা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও ন্যক্কারজনক। প্রক্টরিয়াল টিমের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি।”
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ঢুকে ‘সন্ত্রাসী কায়দায়’ শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনায় তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “লাইব্রেরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ জায়গা। অথচ সেখানেই শিবিরে সন্ত্রাসীরা আজ হামলা করেছে। সেই হামলায় আবার তারাই ‘গুপ্ত শিবির’ যারা আগে ছাত্রলীগ করত, তাদের সঙ্গে নিয়ে হামলা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রক্টরের, অথচ সেই প্রক্টর দপ্তরেই তাদের উপর প্রথমে হামলা করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে এভাবে শিক্ষার্থীদের মারধর করে তারা ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। আমাদের সুস্পষ্ট দাবি হল, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষী প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে এভাবে ‘মব’ করে কোনো মোনাফেক সংগঠন কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে।”
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ছাত্রদল নেতারা। তারা দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “এখনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। তবে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যদের নাম হয়ত মঙ্গলবার প্রকাশ করতে পারব। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে হামলার ঘটনাটি প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে এবং তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
তিনি বলেন, “জুলাই-পরবর্তী সময়ে অনেকেই আবেগের বশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রশাসন কখনোই এটি মেনে নেবে না। আমরা কঠোর অবস্থানে আছি এবং শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করব। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে কিংবা দুষ্কৃতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
(সবশেষ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হয়েছে।)
আরও পড়ুন:
