Published : 15 Mar 2026, 08:49 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা শুরু হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের রায় এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ ঘিরে নতুন রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে।
ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণকে স্বাগত জানালেও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও অন্য দলের কয়েকজন সদস্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রশ্ন সামনে আনেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে সংসদে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়কার রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার সমালোচনাও এসেছে তাদের আলোচনায়।
রোববার অধিবেশনে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু তা সমর্থন করেন। এরপর আলোচনা শুরু হয়।
প্রথম দিন ১৪ জন সংসদ সদস্য ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নেন। এর পরে অধিবেশন আগামী ২৯ মার্চ বিকাল ৩টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ শুরু হয়। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ওইদিন অধিবেশন আহ্বান করেন এবং প্রথম দিনই ভাষণ দেন। এরপর রোববার সকাল ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করা হয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিবাদ ও ওয়াক আউটের ঘটনায় এদিন মুলতবি অধিবেশন শুরুর আগে থেকেই উত্তাপের আভাস ছিল।
শনিবার কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত আসে। সে দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিরোধী জোট আন্দোলনে নামার হুমকি দেয়।
ফলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য শপথ প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির অবস্থান নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
অন্যদিকে সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য রাষ্ট্রপতির ভাষণকে স্বাগত জানিয়ে নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন চাহিদা সামনে আনেন।

প্রথম বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপি সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি শুরুতেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অভিনন্দন জানান এবং তার ছাত্রজীবন, খেলোয়াড়ি জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার স্মৃতিচারণ করেন।
পরে তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তা জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগের ফল। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াই এক বিষয়, কিন্তু ‘জামায়াত প্রতিপক্ষ হলে কী হয়’ এবার তা মাঠে বোঝা গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একই সঙ্গে জামায়াতকে উদ্দেশ করে সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, খালেদা জিয়ার সময়কার সমঝোতার রাজনীতি এবং বিএনপির ভূমিকা যেন তারা ভুলে না যায়।
পিরোজপুর-১ আসনের জামায়াত সদস্য মাসুদ সাঈদী বলেন, গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘মাইলফলক’।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় এলেও বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে মানুষের প্রত্যাশায় ‘আঘাত’ করেছে।
মাসুদ সাঈদী বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের কথা থাকলেও তা হয়নি।
তার ভাষায়, “দেশের ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে,” কিন্তু সেই গণরায় বাস্তবায়ন আটকে আছে।
গোপালগঞ্জ-১ আসনের বিএনপি সদস্য সেলিমুজ্জামান মোল্লা বলেন, গোপালগঞ্জকে অন্য ৬৪ জেলার মতোই দেখা উচিত।
গোপালগঞ্জকে আলাদা রাজনৈতিক প্রতীকের জেলা হিসেবে না দেখে সাধারণ উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যেই বিবেচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পাবনা-১ আসনের জামায়াত সদস্য মো. নাজিবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশকে আইন হিসেবে মানতে হবে।
সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা টেনে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশ আইনের মর্যাদা পায়, ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নাজিবুর রহমান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়ের অভাবের যুক্তি টেকসই নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে পথ বের করা সম্ভব।
বরগুনা-১ আসনের ইসলামী আন্দোলনের সদস্য মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের অংশ থাকা একজন রাষ্ট্রপতির এ সংসদে ভাষণ দেওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘অপমান’ করার শামিল। তবে একই সঙ্গে তিনি ভাষণকে ‘সুলিখিত’ ও ‘সাবলীল’ বলেও তার মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
অলিউল্লাহর মতে, রাষ্ট্রপতির ভাষণে জুলাই ঘোষণা, জুলাই সনদ এবং সেই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি যথেষ্টভাবে আসেনি। তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনের কথা থাকলেও সংস্কারের রাজনৈতিক ভিত্তির কথা ভাষণে ‘অনুপস্থিত’।
হবিগঞ্জ-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য মোহাম্মদ জি কে গউছ নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সিলেট বিভাগের মানুষের যাতায়াত দুর্ভোগ অনেক পুরোনো। তিনি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা এবং রেলসেবার মান উন্নয়নের দাবি জানান।
সঙ্গে হবিগঞ্জে মেডিকেল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৃন্দাবন সরকারি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও তোলেন বিএনপির এই সংসদ সদস্য।
ফেনী-১ আসনের বিএনপি সদস্য মুন্সী রফিকুল আলম বলেন, খালেদা জিয়ার নির্বাচনি এলাকা হওয়ার কারণে গত ১৬ বছরে ফেনী উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি ফেনীতে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক উন্নয়নের দাবি জানান।
একই সঙ্গে আবাদি জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি বন্ধে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই সদস্য।
নাটোর-৩ আসনের বিএনপি সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন বিএনপি দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়নে আঞ্চলিক সম্ভাবনাগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি চলনবিল এলাকায় কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে অতীত শাসনের সমালোচনা আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেন সরকারি দলের এ সদস্য।
চট্টগ্রাম-১ আসনের সদস্য নুরুল আমিন মিরসরাইয়ের রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট উন্নয়নের দাবি তোলেন। তিনি বলেন, এলাকায় দীর্ঘদিন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।
একই সঙ্গে খালকাটা কর্মসূচি শুরু করার জন্য সরকারের প্রশংসা করেন নুরুল আমিন বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি দক্ষিণাঞ্চলের মতো অন্য এলাকাতেও প্রভাব ফেলবে।
পিরোজপুর-৩ আসনের সদস্য মো. রুহুল আমিন দুলাল বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণে জুলাই যোদ্ধাদের কথা এসেছে এবং ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের অপকর্মও উঠে এসেছে। সেই কারণে ভাষণের ইতিবাচক দিকও আছে।
পরে তিনি নিজের নির্বাচনি এলাকা মঠবাড়িয়ার হাসপাতাল, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডির কাজ এবং স্থানীয় উন্নয়ন বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সদস্য মো. জালালউদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে অতীত শাসনের অনাচার তুলে ধরে কার্যত ‘রাজসাক্ষী’ হয়েছেন।
তার ভাষায়, “রাষ্ট্রপতির লিখিত ভাষণে ফ্যাসিবাদী শাসনের জুলুম-নির্যাতনের কথা এসেছে, সে জন্য ভাষণের ওই অংশকে ধন্যবাদ দেওয়া যায়।”
একই সঙ্গে তিনি কটিয়াদি-পাকুন্দিয়া সড়ক ও হাসপাতালের উন্নয়ন ও সেতু করার দাবি জানান।
নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতের সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজেকে জুলাই যোদ্ধা ও জুলাই কারাবন্দি হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ছিল ন্যায্যতা, সমান অধিকার এবং সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ গড়া।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার আধুনিকায়ন, বিমানবন্দর আন্তর্জাতিককরণ, ১০০ শয্যার হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা এবং কিশোরগঞ্জে পৌরসভা গঠনের দাবি তোলেন বিরোধী দলের এই সদস্য।
ময়মনসিংহ-১০ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ৫ আগস্টের রাজপথ থেকে সংসদ কক্ষে আসার অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিজেকে জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, এখন দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের বিষয়গুলো সামনে আনা।
‘বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধিতা’ না করে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান আখতারুজ্জামান।
তার বক্তব্যে গফরগাঁও ও পাগলা এলাকার হাসপাতাল, উপজেলা উন্নীতকরণ এবং রেলব্যবস্থার অবনতির চিত্র উঠে আসে।
পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপির সদস্য এ বি এম মোশারফ হোসেন রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ব্যবহার করেন আওয়ামী লীগ আমলের বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক বক্তব্য দাঁড় করাতে। তিনি বলেন, “বিএনপিকে দুর্নীতির দায়ে কলঙ্কিত করার যে প্রচার ছিল, রাষ্ট্রপতির ভাষণের বাস্তব চিত্র তা খণ্ডন করেছে।”
কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, তৃতীয় সমুদ্রবন্দর সচল করা, রাঙ্গাবালীতে হাসপাতাল নির্মাণ এবং মহীপুর থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার দাবি জানান সরকারি দলের এই সদস্য।