Published : 06 Apr 2026, 12:40 AM
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন করতে আরেকবার বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তার ভাষায়, জুলাই সনদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও তা কার্যকর করতে হলে শেষ পর্যন্ত সংসদের মাধ্যমেই সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে।
রোববার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধিতে আনা মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় সংসদ নেতার পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “সংবিধান রহিত, স্থগিত, সংশোধন বা বাতিল হয়; সংবিধান তো সংস্কার হয় না।”
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মতবিরোধের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এল।
একদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা বলছেন, গণভোট ও বাস্তবায়ন আদেশে যে কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটিকে পাশ কাটিয়ে শুধু সংসদীয় সংশোধনের পথে যাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদের যেসব বিষয় কার্যকর করতে হবে, সেগুলো সংবিধান ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আনতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দল সংস্কার চায়, কিন্তু সংশোধন চায় না। এমন ধারণা সঠিক নয়। কারণ, যেকোনো রাজনৈতিক দাবি বা সংস্কারের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আইনি রূপ নিতে গেলে তা সংশোধনীর মাধ্যমেই আসতে হয়।
তার ভাষায়, “অভিপ্রায়কে সংবিধানে ধারণ করার জন্য এই পার্লামেন্টে আসতে হবে, এমেন্ডমেন্ট নিয়ে আসতে হবে।”
সংবিধান সংশোধন করতে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব অবশ্য গেল মঙ্গলবারও সংসদে তুলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সেদিন জুলাই সনদের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে এ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
জবাবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারি ও বিরোধী বেঞ্চ থেকে সমান প্রতিনিধিত্ব রাখলে তারা এমন কমিটির কথা ‘ইতিবাচকভাবে’ দেখবেন।
‘জুলাই সনদ’ আর ‘জুলাই আদেশ’ এক নয়
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে’ আলাদা করে দেখান।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কিন্তু জুলাই আদেশ বলে যেটি দেখানো হচ্ছে, সেটিকে তিনি বৈধ আদেশ হিসেবে দেখেন না।
তার ভাষায়, “জুলাই জাতীয় সনদ যেটা সই হয়েছে, যেটা ঐতিহাসিকভাবে সই হয়েছে, সেটা আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। যেটা বলছে যে জুলাই আদেশ, ইট ইজ নো অর্ডার। এটা লেজিসলেটিভ ফ্রড। এটা কালারেবল লেজিসলেশন। এটা ফ্রড অন দি কনস্টিটিউশন।”
তিনি বলেন, জুলাই সনদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে তা সংবিধানের মধ্যেই ধারণ করতে হবে, আলাদা কোনো ব্যতিক্রমী কাঠামো দিয়ে নয়।
‘সংস্কার’ নয়, ‘সংশোধন’
আলোচনায় বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য ‘সংস্কার’ এবং ‘সংশোধন’ শব্দ দুটির পার্থক্য নিয়ে কথা বলেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক ভাষায় সংস্কারের কথা বলা যেতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক বাস্তবতায় সেটির অনুবাদ সংশোধন।
“আপনারা সংস্কার বলছেন, আমরা বলছি সংশোধন। ঠিক আছে, আপনারা মনে মনে খুশি থাকলে অসুবিধা নাই। কিন্তু সংবিধান তো এন্ডেড হবে, সংশোধিত হবে, এই সংসদেই হবে।”
তার মতে, গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায়কে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করা হবে। বরং সেই অভিপ্রায়কে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনে স্থান দেওয়ার মধ্যেই এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন।
গণভোটের ব্যাখ্যায় আপত্তি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণভোটের তফসিল ও ব্যালটের প্রশ্নের ব্যাখ্যা নিয়েও আপত্তি তোলেন। তার অভিযোগ, যেসব বিষয়কে জনগণের রায় হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তার সবকিছু গণভোটের তফসিলে একইভাবে ছিল না।
বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠন ও তার প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি নিয়ে তিনি বলেন, প্রশ্নে একভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলেও তফসিলে তার পূর্ণ প্রতিফলন নেই।
এ প্রসঙ্গে তিনি ‘ফ্রড অন দি কনস্টিটিউশন’ এবং ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ কথাগুলো ব্যবহার করেন।
তার বক্তব্য, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে জুলাই সনদকে অবশ্যই মর্যাদা দিতে হবে, কিন্তু সে নামে এমন কিছু চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, যা সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়াই বৈধতা দাবি করে।
‘জুলাই সনদ নিয়ে রাজনীতি করার দরকার নাই’
সালাহউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে জুলাই সনদের আবেগগত পটভূমিও টেনে আনেন। তিনি বলেন, এই সনদের পেছনে ১৭ বছরের সংগ্রাম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, পরিবারগুলোর বেদনা— সবকিছু আছে।
তবে সে কারণেই এটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বাস্তবায়নের পথ নিয়ে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত দরকার বলে মত দেন তিনি।
তার ভাষায়, “আমরা বারবার বলছি জুলাই সনদ নিয়ে রাজনীতি করার দরকার নাই। আমরা বারবার বলছি, আসুন জুলাই সনদের পথ ধরে হাঁটি।”
বিরোধী পক্ষকে খণ্ডন
বিরোধীদলের পক্ষ থেকে যেসব কথা এসেছে, তার কয়েকটির সরাসরি জবাবও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিশেষ করে সংসদ সার্বভৌম কিনা, বিচার বিভাগের ভূমিকা কতদূর এবং জনগণের অভিপ্রায়কে কীভাবে আইনি কাঠামোয় রূপ দিতে হবে, এসব প্রশ্নের দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস, কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগ হয় সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে।
“নির্বাচন কমিশন সংবিধান মেনে নির্বাচন দিয়েছে, সদস্যরা সংবিধান মেনেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণও সংবিধান অনুযায়ী হয়েছে। ফলে সুবিধামতো সংবিধান মানা আর অসুবিধামতো অস্বীকার করার সুযোগ নেই।”
তার ভাষায়, “সবকিছুতেই আমরা সংবিধান মানছি, আর এখন সংবিধান ভালো লাগে না, এই বক্তৃতা শুনতে চাই না।”
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও পুরোনো বিতর্ক
তার বক্তব্যে পঞ্চম সংশোধনী, ত্রয়োদশ সংশোধনী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, এমনকি সংবিধানে মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্বহালের প্রশ্নও আসে।
তিনি বলেন, এগুলোর কিছু বিষয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এসেছিল, কিছুতে ঐকমত্য হয়েছিল, কিছু পরে বাদ পড়েছে। তার মতে, এসব প্রশ্নও সংসদেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বহালের পক্ষে তাদের দল দীর্ঘ ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে। তবে গঠনপ্রণালী নিয়ে কিছু আলোচনার প্রয়োজন আছে।