Published : 30 Jun 2026, 02:22 PM
মঙ্গল গ্রহের অভ্যন্তরে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা বা গলিত লাভা ব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
নাসার ‘ইনসাইট’ মিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া এ আবিষ্কারটি আগের সব ধারণা বদলে দিয়েছে, যা সৌরজগতের বাইরের অন্যান্য পাথুরে গ্রহেও প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মঙ্গলের অভ্যন্তরে ‘বড় ও লুকিয়ে থাকা ম্যাগমা বা গলিত লাভা ব্যবস্থা’ রয়েছে, যা ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধানে এক বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, নতুন এ তথ্য থেকে ইঙ্গিত মেলে, মঙ্গলে একসময় পৃথিবীর মতোই বড় ম্যাগমা ব্যবস্থা সচল ছিল। অথচ মঙ্গল গ্রহে কোনো ‘প্লেট টেকটোনিক্স’ বা ভূত্বকীয় পাত নেই, যা আগে এ ধরনের ম্যাগমা ব্যবস্থা থাকার জন্য জরুরি বলে মনে করা হত।
ফলে মহাবিশ্বের অন্যান্য পাথুরে বিভিন্ন গ্রহের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, “আমরা আগে যা ভাবতাম, তার চেয়েও হয়ত বেশি সংখ্যক পাথুরে গ্রহে প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ বা উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে।”
মঙ্গল গ্রহকে সাধারণত ‘স্থবির ঢাকনা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কারণ পৃথিবীর মতো মঙ্গলের উপরিভাগ গতিশীল টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত নয়।
পৃথিবীতে আগ্নেয়গিরি তৈরি হওয়া ও বিভিন্ন মহাদেশ গঠনের পেছনে এসব টেকটোনিক প্লেটগুলোই দায়ী। এ কারণে গবেষকদের অনুমান ছিল, মঙ্গলে কোনো জটিল ও বিবর্তিত ভূত্বক থাকা সম্ভব নয়।
তবে নতুন এ গবেষণা বলছে, “মঙ্গল গ্রহে আসলে নিজস্ব উচ্চমাত্রায় বিবর্তিত ভূত্বক থাকতে পারে, যা ভিন্ন কোনো প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে।”
নাসার ‘ইনসাইট’ মিশন থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষকেরা এ নতুন আবিষ্কারটি করেছেন। উল্কাপিণ্ডের আঘাত বা ‘মঙ্গল-কম্প’-এর কারণে মঙ্গলের বুকে যে সিসমিক তরঙ্গ বা ভূকম্পন তরঙ্গের তৈরি হয় তা পরীক্ষার জন্যই এ মিশনটি তৈরি হয়েছিল।
মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার গভীরে থাকা রহস্যময় এক সীমানা বা স্তর পরীক্ষা করতে গবেষকেরা এসব তথ্য ব্যবহার করেছেন।
নতুন গবেষণার লক্ষ্য, মঙ্গলের গভীরে থাকা ওই সীমানা বা স্তরটি আসলে দুটি ভিন্ন ধরনের শিলার মধ্যকার কোনো রূপান্তর ক্ষেত্র কি না তা খুঁজে বের করা।
নাসার ল্যান্ডার থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন শিলার গাঠনিক উপাদানের তুলনা করার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এ কাজটি করেছেন।
তারা বলছেন, ওই রহস্যময় সীমানার নিচের দিকের বিভিন্ন শিলা ‘আল্ট্রাম্যাফিক’ শিলা দিয়ে গঠিত, যাতে অনেক পরিমাণে লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে। অন্যদিকে, এর উপরের অংশের বিভিন্ন শিলা ‘ম্যাফিক’ ধরনের, যা অধিক সিলিকাওয়ালা।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র টোবারমোরি ম্যাককে-চ্যাম্পিয়ন বলেছেন, “আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গলের আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা বা অগ্ন্যুৎপাতের প্রক্রিয়াটি বেশ সরল।
“তবে এ আবিষ্কার থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, মঙ্গলে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী এমন ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে, যেখানে গলিত শিলা বিবর্তিত হয়ে পুরো ভূত্বক জুড়েই নিজেকে পুনর্গঠন করেছে। আমাদের সৌরজগতের বাইরের পাথুরে গ্রহগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা সাধারণ বা স্বাভাবিক হতে পারে তা নিয়ে রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার তৈরি করেছে।”
মঙ্গলে যদি এ ধরনের সক্রিয়তা বা ক্রিয়াকলাপ থেকে থাকে, যা আগে কেবল পৃথিবীর জন্যই অনন্য বা একচ্ছত্র বলে মনে করা হত তবে অন্যান্য গ্রহও প্রাণের বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ তৈরি করে নিতে পারে।
এ গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক ও ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র গবেষক জন ওয়েড বলেছেন, “গ্রহ বিজ্ঞানের অন্যতম বড় প্রশ্ন পৃথিবী কি আসলেই অনন্য? মঙ্গল যদি প্লেট টেকটোনিক্স ছাড়াই এ ধরনের জটিল ভূত্বক তৈরি করতে পারে, তবে আমরা যতটা ভাবতাম তার চেয়েও বেশি গ্রহে প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।
“যেসব গ্রহকে এদের আকার বা আপাতদৃষ্টিতে টেকটোনিক সক্রিয়তার অভাবের কারণে আগে আমরা তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিলাম সেগুলোতেও এমন পরিবেশ থাকা সম্ভব।”
‘সিসমিক এভিডেন্স ফর আ মেল্ট-ডিপ্লিটেড লোয়ার ক্রাস্ট অ্যান্ড ট্রান্সক্রাস্টাল ম্যাগমাটিজম অন মার্স’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’তে।