Published : 01 Jul 2026, 06:18 PM
রাতের আকাশে দেখা অসংখ্য তারা, গ্রহ, ছায়াপথ, এমনকি পৃথিবীতে মানুষ, গাছপালা বা বাতাস, সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ। কেবল আমাদের দৃশ্যমান জগতই নয়, শত শত কোটি আলোকবর্ষ দূরেও যে ছায়াপথ, নক্ষত্র, কোয়াসার বা শ্বেত বামন আছে, সেগুলোর সব যোগ করে যে ভর পাওয়া যায়, সেটাই মহাবিশ্বের কেবল পাঁচ শতাংশ।
বাকি ৯৫ শতাংশই আমাদের অজানা!
এই ৯৫ শতাংশের অস্তিত্বের পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকলেও সেটি আসলে কী দিয়ে গঠিত বা কীভাবে কাজ করে, তার নির্দিষ্ট উত্তর এখনো জানা যায়নি। এই অজানা অংশের একটি ভাগকে বিজ্ঞানীরা বলেন ডার্ক ম্যাটার, অন্যটিকে ডার্ক এনার্জি।
আধুনিক জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হয়ে উঠেছে এই দুই উপাদানের প্রকৃতি।
নোবেলজয়ী পদার্থবিদ জেমস পিবলসের মতে, এই অজানা অংশই আধুনিক মহাজাগতিক তত্ত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২০ সালে নোবেল ফাউন্ডেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিকে এমন দুটি ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেন, যেগুলোর গভীর ভৌত অর্থ আছে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো তা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি।
নাসার ‘ডার্ক ম্যাটার’ তথ্যপাতা বলছে, “ডার্ক ম্যাটার একটি অদৃশ্য পদার্থ, যা মহাবিশ্বের প্রায় ২৭ শতাংশ গঠন করে।” আর ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে সংস্থাটির তথ্যপাতায় দেখা যায়, “ডার্ক এনার্জি একটি রহস্যময় শক্তি, যা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণকে আরও দ্রুততর করছে।”
ডার্ক ম্যাটারের ধারণা এসেছে ছায়াপথের ঘূর্ণন, মহাকর্ষীয় লেন্সিং, গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ভর এবং মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো বিশ্লেষণ থেকে। অন্যদিকে ডার্ক এনার্জির ধারণা প্রতিষ্ঠা পায় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে, যখন দূরবর্তী সুপারনোভা পর্যবেক্ষণে দেখা যায় মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীর হওয়ার বদলে বরং দ্রুততর হচ্ছে।
১৯৯৮ সালের এক গবেষণাপত্রে জনস হপকিন্স উইনভার্সিটির গবেষক অ্যাডাম রিস ও তার সহকর্মীরা লিখেছিলেন, “আমরা ১৬টি উচ্চ-রেডশিফট সুপারনোভার পর্যবেক্ষণ থেকে ত্বরান্বিত মহাবিশ্ব এবং একটি ধনাত্মক মহাজাগতিক ধ্রুবকের আবিষ্কারের কথা জানাচ্ছি।”

পরে এই দ্রুততর সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব তত্বের জন্য ২০১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জেতেন রিস।
বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মহাজাগতিক মডেল, ল্যাম্বডা-কোল্ড ডার্ক ম্যাটার মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ সাধারণ পদার্থ, প্রায় ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার এবং প্রায় ৬৮ শতাংশ ডার্ক এনার্জি। তবে এই দুই উপাদানকে এখনো সরাসরি শনাক্ত করা যায়নি। তবে, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ থেকে তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি কি কেবল তাত্ত্বিক ধারণা?
জ্যোতির্পদার্থবিদদের মতে, এগুলো কল্পিত নয়। বরং বহু স্বাধীন পর্যবেক্ষণকে একসঙ্গে ব্যাখ্যা করার জন্য বর্তমান মহাজাগতিক মডেলে এদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এগুলো আসলে কী দিয়ে তৈরি, বা কী ধরনের মৌলিক ভৌত প্রক্রিয়া এর পেছনে কাজ করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি উদ্ঘাটনে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি মহাকর্ষের বিকল্প ব্যাখ্যাও প্রস্তাব করেছেন কিছু গবেষক। তবে এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে প্রচলিত ল্যাম্বডা-কোল্ড ডার্ক ম্যাটার মডেলের সমকক্ষ কোনো বিকল্প প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সম্প্রতি সোশাল সায়েন্স রিসার্চ নেটওয়ার্কে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও পদার্থবিজ্ঞানের এসব মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা এসেছে।
তবে সোশাল সায়েন্স রিসার্চ নেটওয়ার্ক একটি প্রিপ্রিন্ট প্ল্যাটফর্ম। সেখানে প্রকাশিত গবেষণা আনুষ্ঠানিক সহকর্মী পর্যালোচনার আগে প্রকাশিত হয়। ফলে এসব গবেষণার উপসংহারকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পিবলসের মতে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে কোনো ঘটনার নামকরণ করা আর সেটির প্রকৃত স্বরূপ জানা এক বিষয় নয়। ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান এখনো সেই অনুসন্ধানের মধ্যেই রয়েছে। আর সেই কারণেই আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যগুলোর একটি হয়ে আছে এই দুই রহস্যের প্রকৃতি উন্মোচন।
আর এই রহস্যের একেবারে গোড়ায় আছে বিগ ব্যাং, যার মাধ্যমেই মহাবিশ্বের শুরু বলে ব্যাখ্যা করা হয়।
জেমস পিবলসের ভাষায়, “শুরুর কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, মহাবিশ্বের সূচনা বলতে আসলে কী বোঝায়, সে বিষয়ে আমাদের কাছে এখনো কোনো গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব নেই।”