Published : 27 Jul 2026, 04:12 AM
মানুষের জীবনে আনন্দ আর বেদনা, দুই অনুভূতির প্রকাশ ঘটে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। তবে কখনও কি ভেবেছি, কারও মৃত্যু বা জীবনের বড় কোনো বিচ্ছেদে কাঁদার জন্যও এককালে পেশাদার মানুষ ভাড়া করা হতো!
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, পুরনো রাশিয়ার সমাজব্যবস্থায় ‘পেশাদার বিলাপকারী’ বা ‘রোদনকারিণী’ ছিলেন সম্মানিত এবং অপরিহার্য এক শ্রেণির শিল্পী। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি বড় বাঁকে বা রূপান্তরের মুহূর্তে তাদের ডাক পড়ত। তারা কেবল চোখের জল ফেলতেন না, বরং তাদের কান্নার সুরে মিশে থাকত জীবনদর্শন ও লোকজ ঐতিহ্য।
প্রাচীন রাশিয়ায় বিলাপকারীদের এই পেশাকে অন্যতম প্রাচীন ও পূজনীয় মনে করা হতো। এই কাজ কেবল শেষকৃত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিয়েবাড়ি, সৈন্যদের বিদায় অনুষ্ঠান কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কঠিন সময়েও তাদের উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক।
রুশ সমাজে বিশ্বাস করা হতো, মানুষের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর। আর এই রূপান্তরের সময়টাতে শোক বা আবেগ প্রকাশের নির্দিষ্ট শৈল্পিক ধরণ থাকা প্রয়োজন, যা কেবল এই দক্ষ বিলাপকারীরাই পারতেন।
তবে বিলাপকারিণীরা হুট করে তৈরি হতেন না। গ্রামজুড়ে তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে থাকত এবং অনেক সময় পাশের গ্রাম থেকেও গুণী বিলাপকারীদের ভাড়া করা বা আমন্ত্রণ জানানো হতো। এই শিল্পের হাতেখড়ি হতো একেবারে শৈশব থেকে। সাধারণত পরিবারের বড়দের দেখে বা বংশপরম্পরায় তারা এই বিদ্যা রপ্ত করতেন।
তাদের পারিশ্রমিক নির্ভর করত গলার স্বর কতটা হৃদয়স্পর্শী, কান্নার তীব্রতা কত বেশি এবং কতক্ষণ ধরে তারা এই আচার পালন করতে পারছেন তার ওপর। কান্না যত বেশি বুকফাটা আর আবেগঘন হতো, পারিশ্রমিকও তত বেশি জুটত। তবে কেবল নগদ টাকা নয়, অনেক সময় ভোজের নিমন্ত্রণ কিংবা ঐতিহ্যবাহী নানা উপহারও তারা মজুরি বা সম্মানী হিসেবে গ্রহণ করতেন।
পেশাদার বিলাপকারীদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও স্মরণসভা। সেই সময়ের রুশ লোকবিশ্বাসে মনে করা হতো, মৃত ব্যক্তির আত্মার সঠিক পরলৌকিক যাত্রার জন্য বিলাপ করা অত্যন্ত জরুরি। শোকের এই মাতম না করলে আত্মা হয়তো ‘অশুভ আত্মায়’ পরিণত হতে পারে কিংবা পরপারে ‘শান্তি পাবে না’।
যখনই গ্রামে কারও মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ত, তখন থেকেই শুরু হতো এক সুনির্দিষ্ট আচার। মৃতদেহ ধোয়া, কাফন বা শেষ বিদায়ের পোশাক পরানো এবং ঘরের কোণে ধর্মীয় চিত্রকর্মের সামনে শায়িত করা- সবই হতো বিলাপকারীদের করুণ সুরের মূর্ছনায়।
তাদের এই কান্না কেবল চোখের জল ফেলা নয়, বরং হয়ে উঠতো মৃত ব্যক্তির জীবনের মহাকাব্য। বিলাপকারী তার ছন্দের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির গুণগান, তার জীবনের সংগ্রাম এবং পরিবারের বর্তমান হাহাকারের কথা ফুটিয়ে তুলতেন। আধুনিক যুগের খবরের কাগজের শোকবার্তার মতো তাদের এই বিলাপ পুরো গ্রামকে জানিয়ে দিত মানুষটি কেমন ছিলেন।
টানা তিন দিন চলত এই রোদন। প্রথমে ঘরে, তারপর রাস্তায় যখন কফিন বের করা হতো, আর সবশেষে সমাধিতে মাটি দেওয়ার আগ পর্যন্ত বিলাপকারীরা তাদের সুর থামাতেন না। তাদের কণ্ঠের সেই আর্তনাদ শোকাতুর পরিবারকে মানসিক স্বস্তি দিত, যেন তাদের মনের না বলা কথাগুলোই বিলাপকারীরা সুর দিয়ে প্রকাশ করছেন।

হয়তো ভাবছেন, এতটুকু না হয় ঠিক আছে, কিন্তু আনন্দের অনুষ্ঠান বিয়েতে কেন কাঁদার লোক ভাড়া করা লাগবে? কিন্তু পুরনো রাশিয়ার প্রেক্ষাপটে বিয়ে মানেই কেবল আনন্দ নয়। এর মানে একজন তরুণীর কুমারী জীবনের ‘মৃত্যু’ এবং স্ত্রী হিসেবে নতুন ও কঠিন এক জীবনে পদার্পণ। এই রূপান্তরকে চিহ্নিত করা হতো শোকের আবহে।
কনেকে তার ফেলে আসা জীবনের জন্য রীতি অনুযায়ী শোক পালন করতে হতো, আর বিলাপকারীরা সেই শোককে আরও গভীর ও শৈল্পিক করে তুলতেন। তারা কনের হয়ে তার কুমারী জীবনের স্বাধীনতা আর বাবার বাড়ির প্রতি টান নিয়ে এমন সুরে কাঁদতেন যে পুরো বিয়েবাড়িতে করুণ পরিবেশ তৈরি হতো।
পুরনো রাশিয়ায় সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া মানে ছিল জীবন থেকে এক দীর্ঘ বিরতি। বিশেষ করে সেই সময়ে যখন সামরিক চাকরির মেয়াদ দীর্ঘ ২৫ বছর। পরিবারের কোনো যুবক যখন সেনাবাহিনীতে যেত, তাকে এক প্রকার ‘জীবন্ত মৃত’ হিসেবে গণ্য করা হতো।
কারণ ২৫ বছর পর সে ফিরে আসবে কি না, বা ফিরলেও ততদিনে তার চেনা জগৎ কতটা বদলে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বিলাপকারীরা সেই তরুণের জন্য এমনভাবে কাঁদতেন যেন তার ‘জানাজা’ হচ্ছে। তার হারানো স্বাধীনতা আর আসন্ন অনিশ্চিত জীবনের জন্য তারা সুর তুলে বিলাপ করতেন।
এছাড়া কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে কিংবা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গ্রামের ক্ষতি হলে বিলাপকারীদের স্মরণ করা হতো। তারা জনমানুষের সম্মিলিত শোককে একটি নির্দিষ্ট রূপ দিতেন, যা পুরো সমাজকে একসঙ্গে শোক কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করত বলে মনে করা হতো।
পেশাদার বিলাপকারীদের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন ইরিনা আন্দ্রিয়েভনা ফেদোসোভা (১৮২৭–১৮৯৯)। তিনি কোনো সাধারণ বিলাপকারী নন; যেন নিজেই হয়ে উঠেছিলেন রাশিয়ার লোকজ ঐতিহ্য। জাওনেজিয়ে অঞ্চলের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া ইরিনা শৈশব থেকেই এই লোকজ সুর আর কবিতাগুলো আত্মস্থ করেছিলেন।
ইরিনার স্মৃতিশক্তি ছিল দারুণ। শোনা যায়, তিনি হাজার হাজার পদ্য, মহাকাব্য এবং শোকগাথা মুখস্থ জানতেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি আগের বলা কথাগুলোর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কথা জুড়ে দিতেন, যা ওই বিশেষ পরিবারের পরিস্থিতির সঙ্গে হুবহু মিলে যেত।
তার এই প্রতিভা কেবল গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছিল। রুশ লোকসংগীত গবেষক ই. বারসভ তার তিন খণ্ডের বই ‘লামেন্টস অফ দ্য নর্দার্ন ল্যান্ড’-এ ইরিনার শিল্পকে অমর করে রেখেছেন। রাশিয়ার প্রখ্যাত সুরকার রিমস্কি-কোরসাকভ, গায়ক ফিওদর শ্যালিয়াপিন এবং লেখক মাক্সিম গোর্কি পর্যন্ত তার এই শোকগাথা বা বিলাপের প্রশংসা করেছেন। এমনকি রাশিয়ার পেত্রোজভোদস্ক শহরে আজও এই কালজয়ী বিলাপকারিণীর সম্মানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে।
আজকের দিনে পেশাদার বিলাপকারী বা ভাড়া করা কান্নার ধারণা আমাদের কাছে বাণিজ্যিক বা কৃত্রিম মনে হতে পারে, কিন্তু পুরনো রাশিয়ার মানুষের কাছে এটি ছিল ‘পবিত্র সামাজিক দায়িত্ব’। বিলাপকারীরা কেবল কাঁদতেন না, ছিলেন শোকের সঞ্চালক। রাশিয়ার সেই বিস্তৃত প্রান্তরে আজও হয়তো লোককথার আড়ালে প্রতিধ্বনিত হয় সেইসব মায়াবী বিলাপকারীদের কণ্ঠস্বর।
সূত্র: গেটওয়ে টু রাশিয়া।