Published : 02 Jul 2026, 12:15 PM
এ ধূসর দিন কিংবা ঊষর এ রাত্রি
কবে ছিল কার সহযাত্রী! দেবে কি ভুলেও সাক্ষ্য তারা
তুচ্ছ এই মর-জীবনের কোনো অমর স্মৃতির,
অঝোর বৃষ্টি বা বিস্মৃতির?
মেহগনি, মহানিম, কড়ই, ছাতিম, কৃষ্ণচূড়া,
আরও দূরে ছায়াহিম নির্জন জাম্বুরা—
এখন সংশয়ে ট’লে শুধুই নিজের সাথে কথা বলে
দুপুরের ছ্যাঁকা-খাওয়া ব্যথিত বল্কলে।
সংসদের এক কোণে কাঁচুমাচু-প্রাণ
ছোট্ট এই খেজুরবাগান
কাঁপে অল্প অল্প—হাওয়া কি জানে হাওয়ার সংকল্প?
প্রতিটি উদ্যানে পাতা ঝরে—পাখিরাও ওড়ে—
ঝিঁঝিডাকা জনতার এই ঝিমধরা কোলাহলে
বদগন্ধ বুড়িগঙ্গা ধীর পায়ে চলে।
*
এমন ধূসর দিন, এমনই ঊষর রাত্রি
ছিল নাকি সত্যি কোনোকালে আমাদের সহযাত্রী?
একদিন এ শহর, এই রাজধানী—যত দুঃখ, যত গ্লানি—
রাজাদের দম্ভ আর রানিদের শ্লেষ
চূর্ণ করতে এসেছিল উদ্ভিন্ন সারা দেশ—
যেন সারা দেহ থেকে রক্ত এসে জমেছিল
স্ফীতকায় হৃৎপিণ্ডে, দুলে উঠেছিল প্রাণ
সে কোন ইতিহাসের নতুন অলিন্দে!
*
হাতে হাত ধরে এসেছিল নারী ও পুরুষ,
এসেছিল গন্ধর্ব, কিন্নর, লিঙ্গহারা যত প্রেত—পুণ্যবল।
দেখেছিল ফিঙে, লেজঝোলা, কাঠবিড়ালির দল—
পথে পথে কত কত্থকের ভঙ্গি—সাম্বা নাচ—
জঙ্গি আর বজরঙ্গি মুভির ছোঁয়াচ,
সুগভীর সাবস্ট্যান্স—লুঙ্গি ছেঁড়া লুঙ্গিড্যান্স—
প্যান্টে-পাতলুনে, গামছা ও গেঞ্জিতে,
বুকে আঁকা উল্কি আর হাতে রাখা উল্কাতে
এসেছিল এ ধরার সরাখানা উল্টাতে—
ঠগে ভরা আমাদের মগের মুল্লুকে
হিজাবে, নেকাবে, উদ্ভাসিত মুখে,
মেঘে মেঘে উড়ন্ত দুরন্তকেশ—
যেন ঝলসে উঠেছিল কার প্রত্যাদেশ ।
*
ব্যাবেল শহর ছেড়ে তারা ছিল আগুয়ান কেনানের দিকে;
সিনাই প্রান্তরে দীর্ঘ বন্দিদশাটিকে
জর্ডান নদীর জলে ক্রমশ ভাসিয়ে আর ভেসে
এখানে তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা পার হয়ে
লক্ষ, লক্ষ, হাজারে হাজার, শ-য়ে শ-য়ে
ঢুকে পড়েছিল এঁকেবেঁকে
উত্তরা-পথের থেকে পূর্বাচল ঘেঁষে—
*
গদি থেকে গদিয়ানকে উৎখাত করতেই
চেয়েছিল তারা। ঠিক সবাই যেমন চায়।
যেমন ভোরের শাপলা-বিলে ঘুম-ভাঙা রৌদ্র—
রক্তরাঙা মেঘ-অপসারী।
অথচ আশ্চর্য এই, তাদেরও অন্তিম ইচ্ছা
অতি সনাতন ওই গদিতে বসারই—
হোক সে সন্ন্যাসী, ভিক্ষু—নগ্নপদ, ছিন্নকন্থা—
ডান-বাম কিংবা ছদ্মবেশী মধ্যপন্থা।
*
দিনগুলি রাত্রির মতোই অবসন্ন—
এ অবসন্নতা অশরীরী তবু নয়।
শরীরের ভাঁজে ভাঁজে তার—বুকে-পিঠে-কাঁধে
অরব আরব্য রজনীর গল্প দানা বাধে।
সেইসব জিনরাজ-পরিবালা-পরিবৃত গল্পের আঁচড়ে
বারবার ভেঙে পড়ে, থেঁতলে যায় স্খলিত পাথরে
কুমকুম-চুম্বনের রক্তরেণু মাখা
সঞ্জীবনী ফুলের একটি ছোট শাখা।
ছোপ ছোপ হাবশি অন্ধকারে কোনো আঙুরবিতানে
আমাদেরই স্বপ্নে ও শিথানে
শাহজাদা-শাহজাদি—দুটি রূপান্তরিত প্রজাপতি
বিষণ্ন তারার নিচে এখন ঘুমায়—
যখন মর্মর সাগরের ঢেউ ইজিয়ান সাগরের দিকে
ফণা তুলে চায়—করিন্থীয় ভাঙা থামের আড়ালে
যখন একাকী বুড়ো হাড়গিলে
পলিনিসিসের হাড় খুঁটে খায়।
*
এ কেমন জয় হে তোমার, জয়দ্রথ!
দ্রৌপদীর ধ্রুপদি ভঙ্গির ছাঁচে
পুড়ে যাওয়া পুরাণের আঁচে
নারীকেই নরকের কীটবৎ
পিষে ফেলতে বুঝি এই দনুজদলনী গান—
কেবলই শিশ্নের অভ্যুত্থান!
*
তোমার সকল বল কেন তবে আজ
বলাৎকারে পর্যবসিত, কেন তোমার পালনবাদ
সুলভে পালংশাক বিক্রিরই দোকান?
তোমার অন্তরে কেন অন্তর্ভুক্তি মানে
রুদ্ধদ্বার বৈদেশিক চুক্তি আর মুক্তহস্তে বিকানো বন্দর?
এখন অরণ্য জানে, জানে ওই পাহাড়ের প্রতিটি কন্দর
কুরঙ্গ-সুড়ঙ্গপথে কেন খুলতে এত তোড়জোর
মিনোতার তরে মানবিক করিডোর?
*
না হারাতে জাতিবাদী যুদ্ধের চেতনা
দিকে দিকে জাগালে কী ফিকির, ফেতনা—
ফণীমনসার মতো তাই দুলে উঠেছে তোমার
লকলকে জিব, ফুঁসে উঠেছে ফাল্গুনে
প্রফুল্ল আমের বনে—অগ্নিঝরা ফতোয়াসন্ত্রাস—
এই দীপুচন্দ্র দাস অথবা নুরাল পাগলার লাশ।
*
আদার ব্যাপারি এসে কোনোদিন জাহাজের খবর হয়তো
নেবে না, জাহাজডুবি থামবে কি তাতে?
ছেঁড়া কাঁথা মুড়ে নিরুদ্দেশ ঘুরে ঘুরে
ঘুম আর আকাশকুসুম রেখে বালিশের পাশটাতে
স্বপ্ন দেখা আমাদের হবে না তবুও শেষ।
তোমার-আমার অনিঃশেষ এই চাঁদমারি-খেলা
লোডশেডিংয়ের বিটুমিন-ঢালা রাত্রিবেলা।
বিদ্যুতের দাম কিংবা মাছের বাজারে পচা সবজির জোগান
সব ভুলে গেয়ে যাব তুমুল কাওয়ালি গান।
*
ঘাম-ঝরা দিন, হাম-ধরা রাত্রি...
কোথায় রইল নৈশ ভোজ, তুমি করছ ওষুধের খোঁজ—
ওই তো রাস্তার ওপারেই দুটি আমলকী গাছের আড়ালে
হামদর্দ, তামান্না, অ্যাস্টার, লাজফার্মা।
তোমাকেও আজ ঘিরে ধরছে কি বন্ধু
ভারত-মার্কিন-চীন, ফাঁকতালে বার্মা?
টের পাচ্ছ—পদ্মায় জাগছে চড়া, মেঘনায় ভাঙছে পাড়?
তুমি ভুলে গেছ, কবে শিখেছিলে নদীতে সাঁতার।
*
হাতের মুঠোর থেকে স্তন ফসকে যাওয়ার মতন
পুরুষের দুরাশার থেকে কত দূরে এইসব
ত্রস্ত আঁচলের গায়ে নীলাঙ্কিত
জারুল ফুলের গাছ, এইসব বিদগ্ধ দুপুর,
কেমিকেল-মেশা এই কারখানা-জল—
আকাশের ব্যথিত মুকুর!
*
ইতিহাস লিখতে এসে, দ্যাখো, ইতিহাসই
লিখছে তোমাকে। পোড়ামাটি-প্যাপিরাস-কাগজের স্তূপে
পুস্তানির কোনো দস্তানার ভাঁজে
হারিয়ে ফেলেছ কার মন ও মৌসুমি?
পরিশিষ্টেরও অবশিষ্ট তুমি,
মার্জিনে মন্তব্য কারো, এক বিন্দু ফুটনোট—
বুকের বৈয়ম খুলে যতই ছড়াও
সাকুরা, বাদাম, কিশমিশ, আখরোট...
*
এ ধূসর দিন কিংবা ঊষর এ রাত্রি
মৃতবৎসা কোনো প্রসূতির পাশে চিররুগ্ণ ধাত্রী।
আমরা কি ছিলাম তবু হায়
কোনো একদিন—আমাদেরই সহযাত্রী?