Published : 10 Jul 2026, 11:36 AM
প্লুটোর সীমানা পেরিয়ে পৃথিবী থেকে প্রায় ৯৫০ কোটি কিলোমিটার দূরে দীর্ঘ এক বছর সুপ্তাবস্থায় থাকার পর অবশেষে জেগে উঠেছে নাসার দূরপাল্লার মহাকাশযান নিউ হরাইজনস।
সম্পূর্ণ সচল ও নিখুঁত অবস্থায় থাকা এ মহাকাশযানটি এবার সৌরজগতের শেষ সীমানা অঞ্চলের হাইড্রোজেন ও সূর্যের প্রভাব বলয় নিয়ে গবেষণায় অংশ নিতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট স্পেসডটকম।
সৌরজগতের সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বড় দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার সময় নিউ হরাইজনস’কে প্রায়ই মাসের পর মাস নিষ্ক্রিয়ভাবে বা খুব কম কাজ নিয়ে পথ চলতে হয়েছে।
এ দীর্ঘ যাত্রাপথে কেবল পরোক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহ ছাড়া মহাকাশযানটির তেমন কোনো কাজ থাকে না। এ কারণে শক্তি সাশ্রয় করতে যানটিকে এক ধরনের বিশেষ সুপ্তাবস্থা বা ‘হাইবারনেশন মোড’-এ পাঠিয়ে দিয়েছিল নাসা।
এমন অবস্থায় এর প্রধান বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তথ্য সংগ্রহ সচল রাখলেও অন্যান্য বেশিরভাগ সিস্টেম বা প্রযুক্তিগত কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। গেল বছরের অগাস্টে নিউ হরাইজনস’কে তেমনই এক দীর্ঘ ঘুমে পাঠানো হয়েছিল।
প্রায় ৩২১ দিন পর অবশেষে সফলভাবে জেগে উঠেছে এ যাযাবর। পৃথিবী থেকে বর্তমানে মহাকাশযানটির দূরত্ব প্রায় ৯৫০ কোটি কিলোমিটার, যা আমাদের গ্রহ থেকে এতটাই দূরে অবস্থান করছে যে, সেখান থেকে পাঠানো একটি রেডিও সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছাতে প্রায় ৯ ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর এখন নিউ হরাইজনস গত ৩২১ দিনে সংগ্রহ করা বৈজ্ঞানিক তথ্য পৃথিবীতে পাঠাতে শুরু করবে। একইসঙ্গে গভীর মহাকাশের চরম শীতল ও অন্ধকার পরিবেশে এর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেমন আছে সেই সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হেলথ রিপোর্ট’ও পাঠাবে নাসার গ্রাউন্ড কন্ট্রোলারদের কাছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, মহাকাশযানটি এখন পর্যন্ত ঠিকঠাক অবস্থায় রয়েছে।
নাসা’র বিবৃতিতে ‘জনস হপকিন্স অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরি’ বা এপিএল-এর নিউ হরাইজনস মিশন অপারেশন ম্যানেজার অ্যালিস বোম্যান বলেছেন, “এই দীর্ঘ হাইবারনেশন পিরিয়ডের প্রতিটি স্ট্যাটাস রিপোর্টে সংকেত ছিল সবুজ। মানে, প্রতি সপ্তাহে নিউ হরাইজনসের ভেতরে থাকা সব সিস্টেম বা কলকব্জা ঠিকভাবে কাজ করেছে ও সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল।”
ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র মহাকাশযান হিসেবে ২০১৫ সালে প্লুটোর বুক ছুঁয়ে গিয়েছিল নাসা’র এ সাহসী প্রোব।
এর ঠিক চার বছর পর প্লুটো থেকেও আরও ১৬০ কোটি কিলোমিটার দূরে গিয়ে পৃথিবীর সৌরজগতের ইতিহাসে খোঁজ করা সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু তুষারমানবের মতো দেখতে ‘অ্যারোকথ’ নামের এক গ্রহাণু নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চালায় এ দূরপাল্লার মহাকাশযানটি।

সেই ঐতিহাসিক অভিযানের পর থেকে অনবরত আমাদের সূর্যের প্রভাব বলয়ের একদম শেষ সীমানাটি খতিয়ে দেখছে মহাজাগতিক এই পরিব্রাজক।
পাশাপাশি নেপচুন গ্রহের বাইরে অবস্থিত বরফশীতল ও ডোনাট আকৃতির বড় বলয় ‘কুইপার বেল্ট’-এর বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু নিয়েও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাসা’র তথ্য অনুসারে, বর্তমানে নিউ হরাইজনস প্রতি বছর পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৮ কোটি ৩০ লাখ কিলোমিটার গতিতে আরও দূরের গভীর মহাকাশের দিকে ছুটে চলেছে।
তিন সপ্তাহ পর নিউ হরাইজনস তার পরবর্তী মিশন শুরু করতে যাচ্ছে। এবার মহাকাশযানটি আউটার হেলিওস্ফিয়ার বা বহিঃ-সূর্যমণ্ডলে থাকা হাইড্রোজেনের ওপর বিশেষ গবেষণা চালাবে।
হেলিওস্ফিয়ার মহাকাশের এমন একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল, যা সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত বয়ে যাওয়া চার্জিত কণার তীব্র প্রবাহ বা ‘সৌরঝড়ের’ মাধ্যমে প্রভাবিত হয়।
সৌরজগতের এ দূরতম প্রান্ত থেকে মহাকাশযানটির সংগ্রহ করা বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন তথ্য মানব ইতিহাসে প্রথম ধরনের। এসব তথ্য বিজ্ঞানীদের সূর্যের প্রভাব বলয় ও আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশের মধ্যবর্তী সীমানাটি বুঝতে বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘টার্মিনেশন শক’।
এর আগে, কেবল দুটি মহাকাশযান এ রহস্যময় সীমানাটি পেরতে পেরেছে। যার মধ্যে রয়েছে নাসার যমজ প্রোব ‘ভয়েজার ১’ ও ‘ভয়েজার ২’।
বহুদূরে হারিয়ে যাওয়া এসব প্রাচীন অন্বেষণকারী যানগুলোতে নিউ হরাইজনসের মতো আধুনিক ও উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছিল না। ফলে নিউ হরাইজনস সৌরজগতের এ প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংবেদনশীল ও সূক্ষ্ম পরিমাপ চালাতে পারবে।
এর আগে ‘জনস হপকিন্স অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরি’র নিউ হরাইজনস প্রকল্পের বিজ্ঞানী পন্টাস ব্র্যান্ড্ট বলেছিলেন, “টার্মিনেশন শক অঞ্চলের এসব তথ্য বিশ্বজুড়ে থাকা মহাকাশ পদার্থবিদদের জন্য অমূল্য রত্নভাণ্ডার হতে যাচ্ছে, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা এ বিস্তীর্ণ সীমানাটি আসলে কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
“ভয়েজার ও নিউ হরাইজনসের মতো অগ্রগামী বিভিন্ন মিশনের এসব আবিষ্কার আমাদের মূলত এটাই মনে করিয়ে দিয়েছে, এ সীমানার ওপারের জগত নিয়ে আমাদের জ্ঞান কতটা সীমিত।”