Published : 09 Jul 2026, 01:40 PM
ইউক্রেইনের নিখুঁত ও দূরপাল্লার ড্রোন হামলা ঠেকাতে ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করছে রুশ বাহিনী।
রণক্ষেত্রে রসদ সরবরাহ সচল ও ড্রোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে রাশিয়া এখন আধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামিং ডিভাইস ও ছদ্মবেশী বেসামরিক যানবাহন ব্যবহার করছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
ইউক্রেনীয় ড্রোন কমান্ডার ও পাইলটরা রয়টার্সকে বলেছেন, ইউক্রেইনের দূরপাল্লার ‘মিড-স্ট্রাইক’ বা মাঝারি পাল্লার আঘাতকারী ড্রোন হামলা ঠেকাতে রুশ বাহিনী তাদের রসদ বা কার্গোগুলো ছদ্মবেশে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
পাশাপাশি, ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা ব্যাহত করতে শক্তিশালী জ্যামিং সিস্টেম বা সিগনাল প্রতিরোধী প্রযুক্তি বসিয়েছে রাশিয়া।
ইউক্রেইনের তৈরি ‘মিড-স্ট্রাইক’ ড্রোনগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগের কয়েক ডজন কিলোমিটার ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে ও কম খরচে আঘাত হানতে পারে। এগুলো স্টারলিংক ইন্টারনেটের সহায়তায় পরিচালিত, যা ইউক্রেইন যুদ্ধের মোড় অনেকটাই বদলে দিয়েছে।
এ বছরে সমন্বিত এক মিড-স্ট্রাইক অভিযানের মাধ্যমে ইউক্রেইন রাশিয়ার সাপ্লাই লাইন বা রসদ সরবরাহ লাইন, জ্বালানি সংরক্ষণাগার, প্লেন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও কমান্ড সেন্টারগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। ফলে রুশ বাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে রুশ-অধিকৃত ক্রিমিয়ায় তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
রাশিয়া এখন এসব মাঝারি পাল্লার ড্রোন হামলা ঠেকাতে বেশ কিছু পাল্টা উপায় তৈরি করছে। দক্ষিণ জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে কর্মরত ইউক্রেইনের ৪২২তম আনম্যানড সিস্টেমস রেজিমেন্ট পরিদর্শনকালে রয়টার্সের কর্মীদের কাছে এ তথ্য তুলে ধরেছেন চারজন ড্রোন কমান্ডার ও পাইলট।
জ্যামিং ডিভাইস বা সিগনাল প্রতিরোধী প্রযুক্তি
ইউক্রেনীয় ড্রোন ক্রুরা বলছেন, জ্বালানি ও অন্যান্য সামরিক রসদ রক্ষায় রাশিয়ার বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে রয়েছে সাধারণ বেসামরিক যানবাহনে লুকিয়ে মালামাল পরিবহন করা। আরও রয়েছে ড্রোন চালনায় ব্যবহৃত সংযোগ বিচ্ছিন্নের জন্য আধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামিং ডিভাইসের ব্যবহার।
তারা বলেছেন, রুশ বাহিনী বিভিন্ন শহর ও সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি এসব জ্যামিং ডিভাইস বসিয়েছে, যার মধ্যে কিছু ডিভাইস মাস্কের স্পেসএক্সের মাধ্যমে পরিচালিত স্টারলিংক ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
ইউক্রেইনের বেশিরভাগ মিড-স্ট্রাইক মিশন স্টারলিংক ব্যবহার করেই চালানো হয়, যা পাইলটকে দূর থেকে ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সাহায্য করে। এতদিন এটাকে জ্যামিং মুক্ত বলেই মনে করা হত।
ইউক্রেইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সের্হি বেসক্রেস্টনভ বলেছেন, রাশিয়া ‘ভোলনা কুপল গ্যারান্ট’ নামের জ্যামিং সিস্টেম মোতায়েন করছে, যা প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় স্টারলিংক সংযোগকে অস্থিতিশীল করে দেওয়ার মতো শক্তিশালী সিগনাল তৈরি করতে পারে। এখন পর্যন্ত এ ধরনের প্রায় ১০টি সিস্টেম শনাক্ত করা হয়েছে।
এসব জ্যামিং সিস্টেম এখন ইউক্রেনীয় ড্রোন ক্রুদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যাতে তারা তাদের ড্রোন ওড়ানোর ক্ষেত্রে সব ধরনের বাধা দূর করতে পারে।
৪২২তম রেজিমেন্টের কর্মকর্তা কোলেসনিক বলেছেন, তারা এ ধরনের দুটি সিস্টেমে আঘাত হানার অভিযানে অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে একটি সিস্টেম শনাক্সের কেবল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেইনের গোয়েন্দা সংস্থা ‘এসবিইউ’-এর সঙ্গে এক যৌথ অভিযানে ধ্বংস হয়।
এমনই এক হামলার ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি ড্রোন ট্রেলারের মতো দেখতে ছয়টি বড় বাক্সের এক স্থাপনায় আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে বড় আকারের বিস্ফোরণ ঘটে।
‘ডিরিহেন্ট’ কলসাইন ব্যবহারকারী একজন ক্রু কমান্ডার বলেছেন, “আমরা ওই স্থাপনাটিতে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের স্টারলিংকের বিভিন্ন ড্রোন কোনো সমস্যা ছাড়াই উড়তে শুরু করে।”
এদিকে, মস্কো যাতে নিজেদের ড্রোন হামলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য রুশ বাহিনীকে স্টারলিংক ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন মাস্ক।
এ প্রতিবেদনের বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি স্পেসএক্স ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া, হামলা এড়াতে রাশিয়ার ব্যবহৃত এসব কৌশল রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

বেসামরিক যানবাহনে সামরিক রসদ পরিবহন
রয়টার্সের পরিদর্শনের সময় ৪২২তম রেজিমেন্টের ইউক্রেনীয় সেনারা হেডটর্চের হালকা লাল আলোয় একটি মাঠের মধ্যে ডানাওয়ালা ড্রোনে শক্তিশালী বিস্ফোরক ঠাসা একটি ওয়ারহেড লোড করছিলেন।
ড্রোনটির প্রপেলার ইঞ্জিন প্রথমে একটু ঘড়ঘড় শব্দ করে ও পরেই গর্জে ওঠে। একটি ‘ক্যাটালপট’ বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপক যন্ত্রের সাহায্যে উৎক্ষেপণের পর ‘জোজুলিয়া’ নামের ড্রোনটি অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ-পূর্বে ক্রিমিয়ার দিকে উড়ে যায়, যেখানে তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল রুশ ড্রোন পাইলটদের ব্যবহৃত একটি ঘাঁটি।
কোলেসনিক ও অন্যান্য ড্রোন কমান্ডাররা জ্বালানি ও রসদ রক্ষায় মস্কোর কিছু কৌশলের কথা তুলে ধরেছেন। কোলেসনিক বলেছেন, “আমরা পানির ট্যাংকারে আঘাত হেনেছিলাম এবং এসব ট্যাংকার দাউ দাউ করে জ্বলছিল। কারণ সেগুলোর ভেতরে আসলে পেট্রোল ছিল। আমরা রং করা দুধের গাড়িতেও আঘাত করেছি যেগুলোতে ডিজেল পরিবহন করা হচ্ছিল।”
ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা বলেছেন, রুশ বাহিনী এখন মেশিনগান বসানো পিকআপ ভ্যানের পাহাড়ায় জ্বালানি ট্যাংকারের ছোট ছোট বহর পরিচালনা করছে। নজরদারি এড়াতে তারা প্রধান সড়ক ছেড়ে ছোট ছোট রাস্তা ব্যবহার এবং মালামাল বহনের জন্য বেসামরিক যানবাহন বেছে নিচ্ছে।
ইউক্রেইনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, রুশ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে জ্বালানি, গোলাবারুদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহনের জন্য ছোট বেসামরিক গাড়ি, কোয়াডবাইক ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে।
এ ছাড়া তারা রসদ লুকিয়ে রাখার জন্য ছদ্মবেশী বা আড়াল করা বাঙ্কার, পরিত্যক্ত বাড়িঘর ও কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত স্থাপনা ব্যবহার এবং সামরিক বাহিনীর জ্বালানি মজুদের জন্য বেসামরিক বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প কাজে লাগাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর সিনিয়র ফেলো রব লি বলেছেন, ইউক্রেইনের এসব মিড-স্ট্রাইক সম্ভবত এ বছরের যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। মস্কো এখন এগুলো ঠেকানোর ক্ষেত্রে সফলতা পেতে শুরু করেছে।
“তারা যদি এসব জ্যামারের উৎপাদন আরও বাড়াতে পারে তবে ইউক্রেইনের পক্ষে এসব মাঝারি পাল্লার অভিযান চালানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে।”
এ অভিযানের বড় প্রভাব থাকার পরও ইউক্রেইনের ওপর রাশিয়ার প্রাণঘাতী বিভিন্ন হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরুর চার বছর পরও ইউক্রেইনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ও ইউক্রেইনের সব ড্রোন হামলা সফল হয় না।
রয়টার্সের পরিদর্শনের সময় ৪২২তম রেজিমেন্ট যখন জ্বালানি ট্যাংকার লক্ষ্য করে ‘আরএম-২এক্স’ ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল তখন তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ট্রাকটিকে অনুসরণের জন্য ব্যবহৃত নজরদারি ড্রোনটি রাশিয়ার ‘টর সারফেইস-টু-এয়ার’ বা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল সিস্টেমের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়।
‘ডিজিটাল ব্যাটলফিল্ড টার্গেটিং সিস্টেম’-এ ওই টর মিসাইল সিস্টেমের অবস্থানটি নথিভুক্তের সময় ক্রুদের একজন বলেছেন, “আমরা এখন জানি যে, ওটা ওখানে আছে”, যা অন্য কোনো দিনের অভিযানের জন্য নতুন লক্ষ্যবস্তু হিসেবে জমা রইল।