Published : 08 Jul 2026, 11:51 AM
বায়ু দূষণ কেবল ফুসফুসেরই ক্ষতি করছে না, বরং পুরুষের শুক্রাণুতে জিনের কার্যপদ্ধতিও বদলে দিচ্ছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, অন্যতম বড় এ প্রজনন গবেষণায় দেখা গেছে, ওজোন ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মতো সাধারণ বায়ু দূষকগুলোর সংস্পর্শে এলেও শুক্রাণুর ডিএনএ’তে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন ঘটে।
গবেষণা বলছে, শুক্রাণু তৈরির সময় যেসব পুরুষ সাধারণ বায়ু দূষণ উপাদানের সংস্পর্শে এসেছিলেন তাদের ডিএনএ’তে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। এসব পরিবর্তন জিন সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলে, যা পুরুষের প্রজনন সক্ষমতা বা উর্বরতা কমানোর ক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মঙ্গলবার লন্ডনে ‘ইউরোপিয়ান সোসাইটি অফ হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি’র বার্ষিক সভায় এ গবেষণাপত্রটির তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে ওজোন ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডকে এমন দূষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা এ প্রচলিত ‘এপিজেনেটিক’ পরিবর্তনের সঙ্গে সবচেয়ে জোরালোভাবে জড়িত।
এ গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া ‘ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট’-এর এপিডেমিওলজিস্ট ড. ক্যারি নোবেলস বলেছেন, “আমাদের প্রাপ্ত তথ্যে ইঙ্গিত মেলে, শুক্রাণু তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোতে বায়ু দূষণের সংস্পর্শে আসা শুক্রাণুর ডিএনএ পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।”
২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ইউটাহর সল্ট লেক সিটির দুই হাজারেরও বেশি পুরুষের ওপর এ গবেষণা চালানো হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়ার সময় এবং পরবর্তীতে দুই, চার ও ছয় মাস পর পর নিজেদের বীর্যের নমুনা দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।
প্রতিটি নমুনার বীর্য সংগ্রহের আগের তিন মাস, অর্থাৎ শুক্রাণু তৈরির সময়কালে অংশগ্রহণকারীরা ওজোন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণাসহ অন্যান্য বায়ু দূষকের সংস্পর্শে কতটা এসেছিলেন তার সম্ভাব্য এক মাত্রা হিসাব করেছেন গবেষকরা।
আগের গবেষণার বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত করছে, বায়ু দূষণ পুরুষের উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে। তবে এর ভেতরের জৈবিক প্রক্রিয়াটি এতদিন অস্পষ্টই ছিল।
সাম্প্রতিক গবেষণাটি এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ‘ডিএনএ মিথাইলেশন’কে নির্দেশ করেছে, যা ডিএনএ’র সঙ্গে যোগ থাকা এক ধরনের রাসায়নিক ট্যাগ। ডিএনএ মিথাইলেশন মূল জেনেটিক কোড পরিবর্তন না করেই জিন সক্রিয় নাকি নিষ্ক্রিয় থাকবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
বিজ্ঞানীরা গবেষণার ষষ্ঠ মাসে ফলো-আপ নমুনা দেওয়া ১ হাজার ২২০ জন পুরুষের শুক্রাণুর ডিএনএ মিথাইলেশন বিশ্লেষণ করেছেন। তারা বায়ু দূষণের মিশ্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত ৩৯টি ডিএনএ পরিবর্তন চিহ্নিত করেছেন, যেখানে ওজোন ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের শক্তিশালী প্রভাব দেখা গেছে।
ভ্রূণ বা এমব্রায়ো গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ এপিজেনেটিক ট্যাগ মুছে যায়। তবে কিছু কিছু জিনে এসব পরিবর্তন স্থায়ী ‘ছাপ’ রেখে যায়, যার মানে এগুলো পরবর্তীতে ভ্রূণের বিকাশ ও তার পরবর্তী সময়েও প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে।
চিহ্নিত বিভিন্ন জিনের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘জিএনএএস’, যা এর আগেও নিম্নমানের বীর্য ও ভ্রূণের ত্রুটিপূর্ণ বিকাশের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণ মিলেছে।
ড. ক্যারি নোবেলস বলেছেন, “জিনের কার্যপ্রকাশের এসব পরিবর্তন পুরুষের উর্বরতার ওপর প্রভাব ফেলার সক্ষমতা রাখে। এ কারণে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। বায়ু দূষণের কারণে শুক্রাণুর ডিএনএ মিথাইলেশনে যে পরিবর্তন ঘটে তার সঙ্গে উর্বরতার সরাসরি কী সম্পর্ক রয়েছে তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।”
‘ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি’র অ্যান্ড্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক অ্যালান পেসি বলেছেন, এ গবেষণাটি পরিমাপযোগ্য প্রভাব দেখাতে পেরেছে। তবে, তিনি এ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না।
“বর্তমানে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে, শুক্রাণুর ডিএনএ মিথাইলেশনের এসব পরিবর্তন চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে পুরুষের বন্ধ্যাত্বের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এমনটা প্রমাণ করতে আরও গবেষণা করতে হবে।”
‘নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটি’র রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজির অধ্যাপক রিচার্ড লি বলেছেন, “গুরুত্বপূর্ণটি গবেষণা। কারণ এতে বাতাসবাহিত দূষকগুলোর কারণে শুক্রাণুর গুণগত মান ক্ষতির মুখে পড়ে এমন বিভিন্ন প্রমাণকে আরও শক্তিশালী করল।”