Published : 07 Jul 2026, 01:04 PM
ফিটনেস ও ক্যালরি ট্র্যাকিং অ্যাপগুলোর অতিরিক্ত কঠোরতা ব্যবহারকারীদের সুস্থ করার চেয়ে উল্টো মানসিকভাবে আরও অসুস্থ করে তুলছে বলে উঠে এসে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাজার হাজার পোস্ট বিশ্লেষণ করে গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাপের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়ে বহু ব্যবহারকারী তীব্র মানসিক হীনম্মন্যতা, লজ্জা ও হতাশায় ভুগছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ফিটনেস ও ক্যালরি ট্র্যাকিং বিভিন্ন ডিভাইস বা অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মনে তীব্র ‘লজ্জা’ বা অপরাধবোধের জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে যখন তারা নিজেদের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো পূরণে ব্যর্থ হন।
‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’ ও ‘লাফবরো ইউনিভার্সিটি’র বিশেষজ্ঞরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এর হাজার হাজার পোস্ট বিশ্লেষণ করতে এআই ব্যবহার করেছেন।
তাদের এ গবেষণায় বাজারের সবচেয়ে লাভজনক পাঁচটি ফিটনেস অ্যাপ নিয়ে আলোচনা করা প্রায় ৫৮ হাজার ৮৮১ পোস্ট চিহ্নিত করা হয়, যা জনপ্রিয় এসব ডিজিটাল টুলের সম্ভাব্য নেতিবাচক মানসিক প্রভাবকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
পরবর্তী ধাপে গবেষকেরা এসব পোস্টকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করেন, যাতে ব্যবহারকারীদের মনে জমে থাকা ‘নেতিবাচক অনুভূতি’ বা ক্ষোভের বিষয়টি বোঝা যায়। ফলে প্রায় ১৩ হাজার ৭৯৯টি এমন পোস্ট পাওয়া গেছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা এসব অ্যাপ নিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গবেষকরা বলছেন, ব্যবহারকারীরা যখনই তাদের তালিকায় কোনো অস্বাস্থ্যকর খাবারের কথা লিখতেন তখনই তাদের মনে এক ধরনের লজ্জাবোধ তৈরি হত। পাশাপাশি এসব অ্যাপ থেকে ঘন ঘন পাঠানো নোটিফিকেশনের কারণে তাদের মনে তীব্র বিরক্তি ও নিজের সেট করা লক্ষ্য পূরণ করতে না পারায় গভীর হতাশা তৈরি হত।
গবেষণায় এসব অ্যাপের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা সাধারণত একজন মানুষের ওজন কমানোর লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে ‘ব্রিটিশ জার্নাল অফ হেলথ সাইকোলজি’তে।
গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা লিখেছেন, “এসব অ্যাপ এমন কিছু অ্যালগরিদমের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে কাজ করে, যা বাস্তব জীবনের নানামুখী জটিলতা, নমনীয়তা বা মানুষের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও শারীরিক ভিন্নতাকে বিন্দুমাত্র বিবেচনায় নেয় না।”
উদাহরণ হিসেবে তারা একজন ব্যবহারকারীর পোস্টের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে ওই ব্যক্তি হতাশা নিয়ে লিখেছিলেন, “আমি যদি আমার কাঙ্ক্ষিত ওজনে পৌঁছাতে চাই তবে আমাকে দিনে মাইনাস ৭০০ ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে, যা বাস্তবিকভাবে অসম্ভব ও চরম অস্বাস্থ্যকর।”
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ব্যবহারকারীদের চরমভাবে ‘নিরুৎসাহিত’ করে তোলে, যার ফলে তারা একপর্যায়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণের আশাই ছেড়ে দেন।
এ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গবেষকেরা ফিটনেস অ্যাপগুলোকে কেবল ‘কঠোর’ ক্যালরি গণনা ও ব্যায়ামের নিয়মের মধ্যে সীমিত না রেখে, স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সার্বিক বিভিন্ন দিকের ওপর নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ও ‘ইউসিএল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ ইনফরমেটিক্স’-এর ড. পওলিনা বোন্দারোনেক বলেছেন, “এসব অ্যাপের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে এর আগে খুব কম গবেষণাই হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিপুল পরিমাণ তথ্য রয়েছে, যা আমাদের এসব প্রভাব বুঝতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি এআই ব্যবহারের ফলে আমরা দ্রুততার সঙ্গে বড় আকারের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পেরেছি।
“এসব পোস্টে আমরা মানুষের মনে নিজেদের প্রতি এক ধরনের দোষারোপ ও লজ্জাবোধ লক্ষ্য করেছি, যেখানে ব্যবহারকারীরা প্রতিনিয়ত ভাবছেন, যতটা ভালো করার কথা ছিল তারা ততটা করতে পারছেন না।
“এ মানসিক চাপ শেষ পর্যন্ত মানুষের ভেতরের অনুপ্রেরণা ও তাদের স্বাস্থ্যেরই ক্ষতি করতে পারে। ফলে ওজন কমানোর মতো সংকীর্ণ ও কঠোর মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করে সাফল্য বিচার না করে, স্বাস্থ্যবিষয়ক অ্যাপগুলোর উচিত মানুষের সার্বিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং মানসিক আনন্দ ও সন্তুষ্টির ওপর জোর দেওয়া।”
ড. বোন্দারোনেক বলেছেন, “আমাদের নিজেদের প্রতি আরও একটু সদয় হতে শেখা দরকার। আমরা প্রায়ই ভাবি নিজেদের দোষারোপ করলে বা লজ্জিত হলে হয়ত আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে। তবে বাস্তবে এর ফল হয় সম্পূর্ণ উল্টো।
“তবে এ গবেষণায় কেবল নেতিবাচক পোস্টগুলোই মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে এসব অ্যাপের সার্বিক ভালো দিকগুলো এতে উঠে আসেনি। নেতিবাচক দিক থাকার পাশাপাশি এসব অ্যাপ নিশ্চয়ই অনেকের অনেক উপকারও করছে।”
এ বিষয়ে এ গবেষণার সহ-লেখক ও ইউসিএল-এর ‘সাইকোলজি অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ সায়েন্সেস’ বিভাগের ড. লুসি পোর্টার বলেছেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত পর্যবেক্ষণ করে আমরা দেখেছি, ফিটনেস অ্যাপগুলো অনেক সময় মানুষকে এতটাই মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে যে তারা সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার অবস্থায় চলে যায়, যা আসলে এসব ডিজিটাল টুল তৈরির মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
“আগের বিভিন্ন গবেষণা থেকে আমরা জেনেছি, নিজের সম্পর্কে লজ্জিত বা ভেঙে পড়া মনোভাব কখনোই স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে না। এখন আমাদের জানা প্রয়োজন, মানুষের মনোবল ও মানসিক সুস্থতার ওপর এসব নেতিবাচক প্রভাব আসলে কতটা গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
“পাশাপাশি আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে, এসব ফিটনেস অ্যাপে এমন কোনো পরিবর্তন বা সমন্বয় আনা সম্ভব কি না, যার ফলে এগুলো মানুষের বাস্তব চাহিদা ও মানসিক অবস্থাকে আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।”