Published : 06 Jul 2026, 01:44 PM
বর্তমানে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পুরু বরফের চাদরে ঢাকা পৃথিবীর দক্ষিণতম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা কিন্তু চিরকাল এমন ছিল না। প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে এ অঞ্চলটি ছিল বেশ নাতিশীতোষ্ণ ও সবুজ গাছপালায় ভরপুর।
অন্যদিকে, পৃথিবীর উত্তর মেরু তথা আর্কটিক অঞ্চল এর আরও আড়াই কোটি বছর পর পর্যন্ত বরফে ঢাকা পড়েনি। দুই মেরুর বরফ জমার এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান বা অসমতা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘকাল ধরে ভাবিয়ে তুলেছিল। এখন এ প্রাচীন রহস্যের সমাধান খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা।
বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের টপোগ্রাফি বা ভূসংস্থান গভীরভাবে মূল্যায়ন করে কোটি কোটি বছর ধরে এই ভূপৃষ্ঠ কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা পুনর্নির্মাণ করতে কম্পিউটার মডেলের সাহায্য নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
শক্তিশালী এক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার এক পর্বতমালা নতুন করে ওপরের দিকে উত্থিত হতে শুরু করে। একপর্যায়ে পর্বতটি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছায়, যা পাহাড়ের চূড়ায় হিমবাহ তৈরি এবং এর বিস্তৃতি ও স্থায়ীভাবে বরফ জমে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সে সময় আজকের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এ সময়ই পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বড় বরফের চাদরটি আত্মপ্রকাশ করে। আর এভাবেই দীর্ঘমেয়াদী এক বৈশ্বিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তর মেরুতে বরফের টুপি বা আইসক্যাপ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই দক্ষিণ মেরু স্থায়ী বরফে ঢেকে যায়।
পৃথিবীর ইতিহাসের ‘ইওসিন’ যুগের সমাপ্তির পর ‘অলিগোসিন’ যুগ শুরু হওয়ার ঠিক প্রাক্কালেই পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদরটি তার স্থায়ী রূপ নিয়েছিল।
অ্যান্টার্কটিকা একসময় দক্ষিণ গোলার্ধের ‘গন্ডোয়ানা’ নামের বড় এক সুপারকন্টিনেন্ট বা মহাদেশের অংশ ছিল, যার মধ্যে বর্তমানের আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আরব ও ভারতীয় উপমহাদেশও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরবর্তীতে প্লেট টেকটোনিক প্রক্রিয়ার কারণে পৃথিবীর উপরিভাগে মহাদেশীয় স্তরের বিভিন্ন প্লেটের এক অপরিবর্তনীয় ও ধীর গতিশীলতার খেলা চলে, যেখানে এসব ভূখণ্ড একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধীরে ধীরে বর্তমান অবস্থানে এসে পৌঁছায়।
বৃহস্পতিবারে গবষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ও ইংল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন’-এর ভূবিজ্ঞানী টমাস গার্নন বলেছেন, “আমাদের গবেষণায় ইঙ্গিত মেলে, আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে আফ্রিকা ও অ্যান্টার্কটিকার মহাদেশীয় ভাঙনের সময় প্রাচীন এক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কোটি কোটি বছর ধরে চলা এ প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে দিয়েছিল, আজ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে ‘ইওসিন-অলিগোসিন’ যুগ পরিবর্তনের সময় ঠিক কখন এবং কোথায় পৃথিবীর প্রধান বরফের চাদরগুলো তৈরি হবে।”
এ যুগ পরিবর্তনের কালটিই পৃথিবীর প্রাচীন উষ্ণ ‘গ্রিনহাউস’ জলবায়ু থেকে বর্তমানের শীতল বা ঠান্ডা আবহাওয়ার যুগে রূপান্তরের বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
আফ্রিকা মহাদেশটি অ্যান্টার্কটিকা থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরও অ্যান্টার্কটিকা আরও বহু কোটি বছর ধরে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে সময়ের বিবর্তনে একপর্যায়ে অ্যান্টার্কটিকা এদের থেকেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ভূবিজ্ঞানী টমাস গার্নন যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তা ‘ম্যান্টল ওয়েভস’ বা ভূ-অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ নামে পরিচিত, যা আসলে পৃথিবীর গভীর তলদেশে খুব ধীর গতিতে চলতে থাকা এক ধরনের আলোড়ন, যা মহাদেশীয় ভাঙনের সময় তৈরি হয়ে থাকে।
গার্নন বলেছেন, এসব তরঙ্গ টেকটোনিক প্লেটের নিচের অংশ থেকে ভারী ও ঘন বিভিন্ন শিলাকে সরিয়ে দিতে পারে। ফলে মহাদেশগুলো ওজনে হালকা হয়ে যায় এবং ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত মালভূমি ও পর্বতশ্রেণীর মতো উঁচু ভূমি গঠনে ভূমিকা রাখে।
এসব ‘ম্যান্টল ওয়েভস’ বা ভূ-অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ অ্যান্টার্কটিকার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এরা পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত গাম্বুরতসেভ পর্বতমালা ও বড় এক মালভূমি তৈরি করেছিল। এ পর্বতমালাটি প্রায় ১১ হাজার ১২০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হলেও বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফের চাদরের নিচে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে রয়েছে।
গবেষকেরা বলেছেন, এ তরঙ্গের কারণে হওয়া ক্ষয় ও ভূমি উত্থানের প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে এ অঞ্চলের উচ্চতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, যা বিশ্বের উষ্ণ জলবায়ুর মধ্যেও বরফ জমে তা স্থায়ী রূপ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
জলবায়ু ও ভূসংস্থানের মেলবন্ধন
গবেষণার অন্যতম প্রধান পরিচালক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন’-এর ভূবিজ্ঞানী থিয়া হিঙ্কস বলেছেন, “আমাদের এ গবেষণাটি পরিবর্তনশীল জলবায়ু ও পরিবর্তনশীল ভূসংস্থানের মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা সম্পর্কের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে।”
ভূবিজ্ঞানী গার্নন বলেছেন, ইওসিন যুগের শেষদিকে অ্যান্টার্কটিকায় স্থায়ী বরফ জমার প্রক্রিয়াটি সহজ করার জন্য ভূমির ন্যূনতম উচ্চতার সীমা ছিল আনুমানিক দেড় কিলোমিটার থেকে ২ কিলোমিটার।
গবেষণার সিমুলেশন বা কৃত্রিম বিভিন্ন মডেলে ইঙ্গিত মিলেছে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি বছর আগেই পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বড় অংশের ভূখণ্ড এ নির্দিষ্ট উচ্চতার সীমাটি পেরিয়ে ওপরে উঠে গিয়েছিল।
গার্নন বলেছেন, “আমরা যেমন কোনো উঁচু পাহাড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমতে দেখি ঠিক তেমনই উঁচুতে থাকা বিভিন্ন ভূখণ্ডে বছরজুড়ে বরফ জমে থাকার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। অ্যান্টার্কটিকায় বরফের চাদর পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই, গাম্বুরতসেভ পর্বতমালার যে অংশটি বরফ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চতায় ছিল এর পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।
“আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি বছর আগে এ অঞ্চলের কেবল এক-তৃতীয়াংশ অংশ সেই উচ্চতার সীমার ওপরে ছিল, যা প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে এসে অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।”
আর্কটিক বা উত্তর মেরুর পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে গত ৫ কোটি বছর ধরে হিমবাহের আকার কখনো বেড়েছে আবার কখনো কমেছে। তবে ১ কোটি বছর আগ পর্যন্ত সেখানে কোনো বড় বরফের চাদর স্থায়ী রূপ নিতে পারেনি। এর মূল কারণ, উত্তর মেরুতে আসলে কোনো প্রকৃত ভূখণ্ড বা স্থলভাগ নেই। উত্তর মেরু সম্পূর্ণভাবে আর্কটিক মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত।
সহজভাবে বললে, সেখানে আগেভাগে স্থায়ী বরফ গড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার মতো এমন কোনো উঁচু পাহাড় বা ভূখণ্ড ছিল না, যা সেই নির্দিষ্ট উচ্চতার সীমায় পৌঁছাতে পারত।
গবেষক গার্নন বলেছেন, “পরবর্তী সময়ে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব কমে আসার মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু আরও শীতল হয়ে উঠলে তখনই উত্তর মেরুর মতো বিভিন্ন নিচু এলাকাতে স্থায়ী বরফ জমতে শুরু করেছিল।”