Published : 05 Jul 2026, 10:18 AM
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ এক সরকারি সংস্থা ও মানবাধিকার গ্রুপ।
যুক্তরাজ্যের এ বাস্তবতা যেহেতু কোনো দেশের সীমানায় আবদ্ধ নয়, ফলে এ সতর্কতা বাংলাদেশেও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি এবং ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে সতর্ক করেছে যে, অনলাইনে প্রকাশিত শিশুদের ছবি ব্যবহার করে শিশু যৌন নিপীড়নের কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে।
সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাস্তবসম্মত শিশু যৌন নিপীড়নের ৮ হাজারের বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করেছে ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ১৪ শতাংশ বেশি।
ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক টিম রাইট বলেন, “আমরা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহকর্মীরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে সংস্থাটি নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করেছে, যেখানে শিশুদের অনলাইনে নিরাপদ রাখতে অভিভাবকেরা কী কী পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা তুলে ধরা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করতে চাইলে অভিভাবকদের প্রাইভেসি সেটিংস পর্যালোচনা করা উচিত অথবা সীমিত পরিসরে ছবি শেয়ারের জন্য ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ভিত্তিক আলাদা গ্রুপ তৈরি করা যেতে পারে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠছে।”
এতে আরও বলা হয়, “যদিও এর অনেক সুবিধা রয়েছে, তবে এর অপব্যবহারও বাস্তব বিষয়। বিশেষ করে এমন ব্যক্তিরা এটি ব্যবহার করতে পারে, যারা শিশুদের নগ্ন, অর্ধনগ্ন বা যৌন প্রকৃতির ছবি ও ভিডিও তৈরি, পরিবর্তন বা ছড়িয়ে দেয়।”
ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে সংস্থাটির বিশ্লেষকেরা শিশু যৌন নিপীড়নের ১৩টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ভিডিও শনাক্ত করেছিলেন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪০টিতে।
যুক্তরাজ্যে এ ধরনের ছবি ও ভিডিও শিশু যৌন নিপীড়নের অবৈধ কনটেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য সরকার তথাকথিত ‘নিউডিফিকেশন’ অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর জন্য এমন বিধান আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশু যৌন নিপীড়নের কনটেন্ট তৈরি করা না যায়।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি ও ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন বলেছে, নতুন নির্দেশনার লক্ষ্য হলো শিশু যৌন নিপীড়নের কনটেন্টের ঝুঁকি এবং এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করা।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “অভিভাবক বা পরিচর্যাকারী হিসেবে এ ধরনের তথ্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তবে আপনি একা নন।”
এতে আরও বলা হয়, “আপনার শিশুকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। এর অনেকগুলো হয়তো আপনি ইতোমধ্যে অনুসরণও করছেন।”
সংস্থাগুলো তিনটি মূল পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছে।
প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রাইভেসি সেটিংস পর্যালোচনা করে পোস্ট কারা দেখতে পারবে তা সীমিত করা অথবা অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত রাখা।
দ্বিতীয়ত, আগে প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিও পরীক্ষা করা। বিশেষ করে শিশুর মুখ, স্কুলের ইউনিফর্ম বা পরিচয় শনাক্ত করা যায় এমন কোনো তথ্য দৃশ্যমান কি না, তা খেয়াল করা। প্রয়োজনে ছবি মুছে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, ছবি ব্যবহারের অনুমতি বিষয়ে নতুন করে ভাবা। বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, স্কুল বা ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত হওয়া যে শিশুদের ছবি কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, শিশুদেরও এ বিষয়ে আলোচনায় যুক্ত করা কার্যকরী হতে পারে। এতে তারা নিজের ছবি কোথায় তোলা হচ্ছে বা শেয়ার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে মতামত দিতে এবং প্রয়োজন হলে ‘না’ বলতে আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।
‘শেয়ারেন্টিং’ নিয়ে নতুন উদ্বেগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিভাবকদের সন্তানদের ছবি বা ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করার প্রবণতাকে ‘শেয়ারেন্টিং’ নামে ডাকা হয়। বছরের পর বছর ধরে শিশু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ‘শেয়ারেন্টিং’ নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।
২০১৬ সালে শব্দটি কলিন্স ইংলিশ ডিকশনারিতে যুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের চর্চা শিশুদের পরিচয় চুরি, প্রতারণা এবং ভবিষ্যতের প্রাইভেসি ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এখন এর সঙ্গে নতুন উদ্বেগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ছবি বিকৃত করার প্রযুক্তি। এমন কিছু টুল ইতোমধ্যে সহজলভ্য হয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে ছবিতে থাকা ব্যক্তির পোশাক সরিয়ে ফেলে ভুয়া ছবি তৈরি করা সম্ভব।
ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কেরি স্মিথ বলেন, “আমরা বলতে চাই না যে, যাদের আপনি ভালোবাসেন এবং বিশ্বাস করেন তাদের সঙ্গে সন্তানদের ছবি শেয়ার করবেন না। তবে আমরা চাই সবাই সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকুক এবং সব তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নিন।”
তিনি আরও বলেন, “এগুলো কাল্পনিক হুমকি নয়, এগুলো বাস্তব।”