Published : 27 Jul 2026, 03:03 PM
মধ্যবিত্তের টুকরো টুকরো সুখ-দুঃখের চিত্রকল্পের নাটক ‘এই সব দিনরাত্রির’ প্রযোজক মুস্তাফিজুর রহমান কেবল একজন পদাধিকারী ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন ‘সৃজনশীল’ মানুষ।
মুস্তাফিজুর রহমানের মৃত্যুর পর গ্লিটজের কাছে তাকে ঠিক এই বর্ণনায় তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক উপ মহাপরিচালক, লেখক খ ম হারূন।
রাজধানীর উত্তরায় নিজের বাসায় রোববার মারা গেছেন মুস্তাফিজুর রহমান। খ ম হারূন জানিয়েছেন, বয়স হলেও বেশ ভালোই ছিলেন তিনি। অবসর সময় কাটাচ্ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
হারূন বলেন, “বাসার সবার সঙ্গে কথা বলছিলেন। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার সময়টুকও পাওয়া যায়নি।”
উত্তরায় বাসায় তিনি ও তার স্ত্রী নজরুলসংগীত শিল্পী রওশন আরা মুস্তাফিজ থাকতেন। এই দম্পতির দুই ছেলে অভি মুস্তাফিজ ও রানা মুস্তাফিজ দেশের বাইরে বসবাস করেন। তারা ঢাকায় ফিরলে বৃহস্পতিবার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হবে।
বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। দুই হাজার পরবর্তী সময়ে বেসরকারি টেলিভেশন স্টেশন বাংলাভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। পরে যোগ দেন গাজী টেলিভিশনেও।
তাকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিতে ডুব দেন খ ম হারূন। বলেন, আশির দশক থেকে এই সময় পর্যন্ত মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গেছেন তিনি।
তার কথায়, “অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন সৃজনশীল মানুষ। কখনো উচ্চকন্ঠে কথা বলতেন না। কতশত শিল্পী তার হাত ধরে মিডিয়া ভূবনে নিজদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আমাদের তিনি তৈরি করেছেন। তার কাজ নিয়ে, অবদান নিয়ে বলে শেষ করা যাবে না।”
হারূন বলেন, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮০ সালে এক ঝাঁক প্রযোজক প্রথমবারের মত বিটিভিতে কাজ শুরু করেন।
“নাট্যকার আতিকুল হক চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মামুন, বিটিভির উপ-মহাপরিচালক মোস্তফা কামাল সৈয়দ ও মুস্তাফিজুর রহমান প্রোগ্রাম বিভাগকে সাজিয়ে তুলেছিলেন নিজেদের মত করে। তখন বিটিভির নিয়ন্ত্রণ বিটিভির হাতেই ছিল, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না। এই চারজনের কাছ থেকে সততা নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতার পাঠ নিয়েছি, কাছে থেকে বহু কিছু শিখেছি।”
অনেক সময় শক্ত ধাঁচের কাজের ফরমায়েশ নিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান তার বাসায় চলে আসতেন বলেও জানালেন হারূন।
“এসে বলতেন, শোনো, কাজগুলো কিন্তু তোমাকেই করতে হবে।”
১৯৮৫ সালে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ দর্শকদের জন্য নিয়ে আসেন ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’। এই নাটকটির পাণ্ডুলিপি পড়ে তা প্রযোজনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।
নাটকটির অসামান্য জনপ্রিয়তা পাওয়ার কৃতীত্ব খ ম হারূন দিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমানকে।
তিনি বলেন, “হুমায়ূন তখন সদ্য বিদেশ থেকে ফিরেছেন। এক পর্বের নাটক হিসেবে ‘এইসব দিনরাত্রি’ লিখেছিলেন। পাণ্ডুলিপি পড়ে মুস্তাফিজ ভাই বললেন নাটকটি ধারাবাহিক করলে কেমন হয়? বললেন, ‘তুমি এটা ধারাবাহিক করে লিখতে পারবা, চরিত্রগুলোকে ওরকমভাবে সাজাও’। হুমায়ূনের তখন আর্থিকভাবে আরেকটু স্বচ্ছল হওয়া প্রয়োজন ছিল। তিনিও লিখলেন। নাটকও সবাই পছন্দ করল। হুমায়ূনও জনপ্রিয় হলেন, পরিচিতি হলেন।
“হুমায়ূনের জনপ্রিয়তার পেছনে তিনিই (মুস্তাফিজুর রহমান) নেপথ্য কারিগর।”
‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকের অনুশীলনের একটি ঘটনা খ ম হারূন তুলে ধরেন গ্লিটজের কাছে।
তিনি বলেন, “ওই সময় অভিনেত্রী ডলি জহুরের কিছুটা আপত্তি ছিল হুমায়ূনের নাটকে কাজ করার ব্যাপারে। কারণ হুমায়ূন নতুন, তাকে ডলি জহুর চিনতেন না। কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমান বলেছিলেন, উনি (হুমায়ূন আহমেদ) ভালো লেখক, এমন লেখককে সামনে আনতে হবে। তবে ওই নাটকে আর কারো লেখককে নিয়ে আপত্তি ছিল না।”
হুমায়ূন আহমেদের গল্প ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সিনেমার পরিচালনাও করেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। সিনেমার চিত্রনাট্যও তারই করা।
খ ম হারূনের ভাষায়, মুস্তাফিজুর রহমান টেলিভিশন ‘বুঝতেন’। এই মাধ্যম নিয়ে তার আগ্রহ ছিল। বহু মানুষকে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন বর্তমান সময়ের মিডিয়ার উপযোগী হওয়ার জন্য।
মুস্তাফিজুর রহামনের মৃত্যুর খবর সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে অনেকে শোক জানিয়েছেন।
গ্লিটজের সঙ্গে কথা বলার আগে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন খ মা হারূনও।
এক সময়ের অভিনেতা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শামীম সাহেদ তার পোস্টে লিখেছেন, “শ্রদ্ধেয় মুস্তাফিজুর রহমান আর নাই। টুনি মারা গিয়েছিল বলে পুরো দেশবাসীর মন খারাপ ছিল- এই কথাটা কতজন মনে করতে পারবেন আমি জানি না। কিন্তু যদি বলি হুমায়ূন আহমেদ এর এইসব দিন রাত্রির কথা কার কার মনে আছে তাহলে অনেকেই হাত তুলবেন।
“এই নাটকের শেষ দিকেই দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে টুনি মারা গিয়েছিল আর পুরো দেশবাসী মন খারাপ করে ছিল। সেই আলোচিত নাটকটার প্রডিউসার ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি বিটিভির ডিজি হয়েছিলেন, বাংলাভিশনের সিইও হয়েছিলেন। এক সময়ের জাঁদরেল টেলিভিশন প্রযোজক। শঙ্খনীল কারাগারসহ বহু আলোচিত প্রযোজনা তাঁর নির্মিত। সেই মুস্তাফিজুর রহমান আর নাই। আজ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক ফেরদৌস হাসান বলেছেন, “মুস্তাফিজ ভাই আপনাকে ঐভাবে বিছানায় পড়ে থাকা দেখতে চাইনি। এই তো ভালো হলে অনন্তের পথে সেইভাবে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান। খটাখট শব্দ করে যেভাবে হেঁটে বেড়াতেন বিটিভির টানা বারান্দায়। আমি সেই শব্দ শুনে বাইরে আসতাম। আপনি দেখে হাসতেন। উত্তম কুমার যেভাবে হাসে সেভাবে। ওটুকুই যথেষ্ট। কত কম হেসে কত বেশি যে বলা যায় আমি শিখেছিলাম।”