Published : 05 Jul 2026, 11:32 AM
সাধারণত দামি জিনিসের কথা ভাবলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে নামী শিল্পীর আঁকা ছবি, কোনো বিলিয়নেয়ারের প্রমোদতরি বা নামী ব্র্যান্ডের দামি গাড়ি। তবে মানুষের তৈরি সবচেয়ে ব্যয়বহুল বস্তুটি পৃথিবীর বুকে নেই, ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে।
আধুনিক যুগে বিভিন্ন দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক অনন্য নিদর্শন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। মানুষকে অন্য গ্রহে যাওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে এই স্টেশন। এটি কেবল এক কারিগরি বিস্ময়ই নয়, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বস্তু হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারীও।
২০৩০ সালে অবসরে যাবে বিশাল এ ভাসমান স্টেশনটি। পুরো কাঠামোটি এতটাই জটিল ও বিশাল যে তা সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংসের মিশনেই প্রায় ১০০ কোটি ডলার খরচ হবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
মহাকাশ স্টেশনের নির্মাণ খরচ
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইএসএ শুরু থেকেই মহাকাশ স্টেশন প্রকল্পের অন্যতম প্রধান সদস্য। সংস্থাটির ধারণা অনুসারে, মহাকাশ স্টেশন তৈরির খরচ প্রায় প্রায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। আরও কিছু হিসাব বলছে, মহাকাশ স্টেশনটির উন্নয়ন ও নির্মাণে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, এই মোটা অংকের অর্থ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশের বার্ষিক জিডিপির চেয়েও বেশি।
নির্মাণ খরচের বাইরেও ২০২১ সালের এক অডিট অনুসারে, বর্তমানে এই স্টেশনের পেছনে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার খরচ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। তবে সহযোগী দেশগুলোর খরচ মেলালে এ অংকটি প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন আইএসএস-এর মতে, অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এর বার্ষিক পরিচালনা ব্যয় ৩২০ কোটি ডলারের আশেপাশেই থাকবে। সব মিলিয়ে এ যেন এক খরচ বেড়ে যাওয়ার দীর্ঘ গল্প।
২০০০ সালের শেষ দিকে প্রথম অভিযাত্রী দল মহাকাশ স্টেশনে বসবাস শুরু করে। তবে এ যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ ছিল না, বরং ছিল নানা বাধায় ভরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ ছিল আকাশচুম্বী বাজেট। প্রকল্পের শুরুতে মার্কিন কংগ্রেসকে জানানো হয়েছিল, এর খরচ হবে কেবল ৮০০ কোটি ডলার।
তবে ১৯৯০ সালের মধ্যেই সেই হিসাব বেড়ে ১২ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে আইএসএসকে ‘খরচ বৃদ্ধির এক অনন্য উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
২০০১ সালে মার্কিন প্রতিনিধি সভার এক শুনানিতে প্রকাশ পেয়েছিল, ১৯৯৩ সালে এই স্টেশনের মার্কিন অংশের খরচ ১৭৪০ কোটি ডলার ধরা হলেও ১৯৯৮ সালের মধ্যে তা বেড়ে ২১৩০ কোটি ডলারে দাঁড়ায় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও বহুগুণ বেড়েছে।
এ অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আইএসএসের নকশার বারবার পরিবর্তন। শুনানিতে কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের সদস্য মার্সিয়া এস. স্মিথ বলেছিলেন, “একটির পর একটি নতুন নকশা তৈরি করা হচ্ছে”। বারবার নকশা পরিবর্তনের মানে আগের করা বিভিন্ন কাজে বড় ধরনের সংশোধন বা পুরোপুরি বাতিল। ফলে নতুন করে প্রকৌশল কাজ, বাড়তি ইন্টিগ্রেশন ও পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন পড়ে। শুনানিতে আরও বেশ কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়, যেমন সময়ের অপচয়, পুরানো প্রযুক্তি, জটিলতা বুঝতে ভুল, যান্ত্রিক ত্রুটি ও রাশিয়ার সীমাবদ্ধতা।
প্রতিবছর বাধ্যতামূলক ও স্বাধীন অডিট না থাকা এবং একটি প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কত খরচ হতে পারে তার সঠিক পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হওয়া এই দুটি কারণও কয়েক শত কোটি ডলার বাড়তি খরচের পেছনে দায়ী ছিল।
স্টেশনের এই বিশাল নির্মাণ খরচের মধ্যে রকেট উৎক্ষেপণের খরচ অন্তর্ভুক্ত নেই। শুনানির সময় দেখা গেছে, স্টেশনের নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ করতে তখনও আরও ৭০টিরও বেশি রকেট উৎক্ষেপণের প্রয়োজন ছিল, যার খরচ আগের হিসাবে ছিল না। কেবল তাই নয়, কর্মীদের বেতন ও নিয়মিত পরিচালনার খরচও মূল বাজেটে ধরা হয়নি। অথচ প্রতিটি রকেট উৎক্ষেপণই অনেক ব্যয়বহুল। ২০০৬ সালে মহাকাশ স্টেশনে যেতে প্রতি সিটের জন্য প্রায় ২ কোটি ১৮ লাখ ডলার করে পরিশোধ করত নাসা।
আইএসএস অংশীদারদের ভূমিকা
মহাকাশ স্টেশনটি শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডা রাশিয়া ও তৎকালীন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ১১টি দেশের যৌথ এক প্রকল্প হিসেবে। এ অংশীদারদের কেউ কেউ স্টেশনটির খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনেও ভূমিকা রেখেছিল।
২০০২ সালের ‘জিএও’ রিপোর্ট অনুসারে, রাশিয়ার তৈরি বিভিন্ন ‘সয়ুজ’ যান মানসম্মত ছিল না। ফলে নাসাকে নভোচারীদের ফিরিয়ে আনার জন্য নিজস্ব যান তৈরিতে বাড়তি ১৫০ কোটি ডলার খরচ করতে হয়।
এ ছাড়া, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রতি এক মাস দেরি হওয়ার কারণে অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলার করে খরচ বাড়ত। শেষ পর্যন্ত মহাকাশ অভিযানের খরচ একাই অনেক কমিয়ে এনেছে স্পেসএক্স। প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিনিময়ে এই মহাকাশ স্টেশনটি ভেঙে ফেলার কাজও সম্পন্ন করবে মাস্কের এই কোম্পানিটি।
মহাকাশ স্টেশনের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর তালিকায় আরও রয়েছে শেভরন-এর ‘গর্গন গ্যাস প্ল্যান্ট’, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ‘হিংকলে পয়েন্ট সি’ পারমাণবিক চুল্লী কেন্দ্রের নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, মাস্কের দেওয়া তথ্য অনুসারে, স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার কোটি ডলার।