Published : 08 Jul 2026, 10:17 AM
ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে তরুণদের আসক্ত করার অভিযোগে নজিরবিহীন ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার জরিমানার মুখে পড়তে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা।
চার মার্কিন অঙ্গরাজ্যের আনা এ মামলার আর্থিক ক্ষতিপূরণের পরিমাণ খোদ মেটার বাজার মূল্যের কাছাকাছি, যা কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইনি দুঃস্বপ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
মেটা’র বিরুদ্ধে মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, কোম্পানিটি তরুণ ব্যবহারকারীদের আসক্ত ও প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফেইসবুক ও ইনস্ট্রাগ্রাম ডিজাইন করেছে। এ ঘটনার জেরে এ নজিরবিহীন অংকের জরিমানার মুখে পড়তে পারে মেটা।
চোখ কপালে তোলার মতো এ মোটা অংকের বিষয়টি খোদ মেটা’ই সম্প্রতি আদালতে জমা দেওয়া এক নথিতে প্রকাশ করেছে, যা অ্যাটর্নি জেনারেলদের প্রস্তাবিত জরিমানার হিসাবের জবাবে দিয়েছিল কোম্পানিটি।
এ জরিমানার মোট পরিমাণ কোম্পানিটির বর্তমান বাজার মূল্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রায় কাছাকাছি।
অগাস্টে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ এ বিচার প্রক্রিয়ার আগেই এমন তথ্য সামনে এল। ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি, এ চার অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ, শিশু ও টিনএজারদের জন্য আসক্তি তৈরি করে এমন পণ্য বা ফিচার তৈরির মাধ্যমে মেটা অঙ্গরাজ্যের ভোক্তা অধিকার বা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রস্তাবিত এ জরিমানাকে ‘প্রমাণহীন’ বলে বর্ণনা করেছে মেটা।
আদালতের নথিতে কোম্পানিটি বলেছে, “ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার ইতিহাসে এত মোটা অংকের জরিমানার কোনো নজির নেই।”
মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর জমা দেওয়া মূল নথি এখনও সিলগালা অবস্থায় রয়েছে। তবে জুনের শুনানিতে প্রকাশ পেয়েছে, তারা এই সম্ভাব্য জরিমানার হিসাবটি কীভাবে করেছে।
অঙ্গরাজ্যের আইন অনুসারে, অনুমোদিত জরিমানার অংকের সঙ্গে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের সংখ্যা গুণ করে এই হিসাব বের করা হয়েছে। এ অভিযোগের সংখ্যা নির্ধারণ হয়েছে এর মাধ্যমে ক্ষতির মুখে পড়া শিশু ও টিনএজারদের আনুমানিক সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে।
ইউএস ডিস্ট্রিক্ট বিচারক ইভন গনজালেজ রজার্সের অধীনে অগাস্টের এ বিচারে আরও ২৯টি অঙ্গরাজ্যের আনা বিভিন্ন অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।
এসব অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ, যথাযথ অভিভাবকীয় সম্মতি বা অনুমতি ছাড়াই শিশুদের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মেটা ফেডারেল ‘চিলড্রেনস অনলাইন প্রাইভেসি প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ লঙ্ঘন করেছে।
মেটা বলেছে, ‘সামাজিক মাধ্যম আসক্তি’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত কোনো মানসিক রোগ বা ডায়াগনসিস নয়। ফলে তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম আসক্তি তৈরি করে না বলে কোম্পানিটি যে বিবৃতি দিয়েছিল, সেগুলোকে কোনোভাবেই মিথ্যা বা প্রতারণামূলক বলা যায় না।
অগাস্টের এ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াও মেটাকে আরও বেশ কিছু আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। আরও ১৪টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য নিজস্ব আইনের অধীনে একই ধরনের অভিযোগে মামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যার জন্য আগামী ফেব্রুয়ারিতে আলাদা এক বিচার শুরুর দিন ধার্য হয়েছে।
গেল মাসে অগাস্টের এ আইনি প্রক্রিয়া স্থগিতের জন্য মেটা’র করা অনুরোধটি খারিজ করেছেন বিচারক রজার্স।
তিনি বলেছেন, মেটা’র বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম আসক্তি তৈরি, কোম্পানিটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেভাবে এগুলো ডিজাইনের বিষয়টি মিথ্যাভাবে অস্বীকার এবং মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের লক্ষ্য করেছে কি না সে বিষয়ে এখনও বেশ কিছু অমীমাংসিত বিতর্ক রয়েছে।
এরপর ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা মেটা’র বিরুদ্ধে শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায়ের মুনাফাকে এগিয়ে রাখার অভিযোগ তোলেন।
একইসঙ্গে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে কোম্পানিটির ভূমিকার জন্য তাদেরকে ‘পুরোপুরি জবাবদিহিতার’ আওতায় আনার দৃঢ় প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।
ক্রমাগত আইনি চাপের মুখে পড়া বেশ কয়েকটি সামাজিক মাধ্যম কোম্পানির মধ্যে মেটা অন্যতম। স্ন্যাপ, অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন ইউটিউব ও বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন টিকটক’ও বর্তমানে হাজার হাজার মামলার মুখে পড়েছে।
এসব মামলায় অভিযোগ, কোম্পানিগুলো শিশু ও টিনএজারদের নিজেদের প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখার জন্যই এমন ডিজাইন তৈরি করেছে, যা বিশ্বজুড়ে তরুণদের ব্যাপক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম কারণ।
নিউ মেক্সিকো প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে আদালতে যায় এবং মার্চে এ মামলার রায়ে জুরিদের কাছ থেকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ জিতেছে।
জুরিরা বলেছেন, কোম্পানিটি ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করেছে। এখন এরসঙ্গে আরও অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ যোগ করে ইনস্টাগ্রাম, ফেইসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের কার্যপদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হবে কি না তা বিবেচনা করছেন একজন বিচারক।