Published : 22 Aug 2023, 06:47 PM
‘যৌন নিপীড়নের জেরে প্রতিহিংসাবশত’ কক্সবাজার শহরে পৌর আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুদ্দিনকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। তবে এই দাবি ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রশ্নবোধক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে নিহতের পরিবার।
সোমবার একটি হোটেল কক্ষে আওয়ামী লীগ নেতার খুনে জড়িত সন্দেহভাজন এক তরুণকে আটকের পর মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এসে এমন দাবির কথা জানান জেলা পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুল ইসলাম।
সাইফুদ্দিনের শরীরে অন্যান্য আঘাতের চিহ্ন ছাড়াও ১৭টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং হত্যাকাণ্ডে একজনই জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
সোমবার রাতে আটক আশরাফুল ইসলাম (১৮) কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা এবং সেখানকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
তার সঙ্গে সাইফুদ্দিনের এক সপ্তাহ আগে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে ফেইসবুকে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
কক্সবাজার শহরের ঘোনারপাড়া এলাকার অবসরপ্রাপ্ত আনসার কমান্ডার আবুল বশরের ছেলে সাইফুদ্দিন কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা ছিলেন। সোমবার তার মরদেহ হলিডে মোড়ের সানমুন হোটেলের ২০৮ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
এ হত্যাকাণ্ডে পুলিশের দুটি বিশেষ টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছিল। আশরাফুল টেকনাফে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। রাতে হোয়াইকং চেকপোস্ট থেকে আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “রোববার সাইফুদ্দিন মোটরসাইকেলে করে আশরাফুলকে নিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করেন। পরে বড়বাজারে গিয়ে বাংলা মদ ও পেয়ারা কিনে হোটেলে এসে সময় কাটান। এ সময় ভিকটিমের ব্যক্তিগত চারিত্রিক স্খলন ঘটে।
“কিছুক্ষণ পর দুজনেই হোটেল থেকে মোটরসাইকেলে করে বেরিয়ে যায়। গোলদীঘির পাড়ে এস আলমের কাউন্টারের সামনে আশরাফুলকে নামিয়ে ১০০ টাকা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় সাইফুদ্দিন। তার কিছু পরে আবার সাইফুদ্দিন আশরাফুলকে ডেকে আনেন এবং দুজনে আবার হোটেলের একই কক্ষে প্রবেশ করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, “এবার কিন্তু আসামি আশরাফুল এর প্রতিবাদ করেন। সাইফুদ্দিন একপর্যায়ে আশরাফুলের গলা চেপে ধরেন। তখন আশরাফুল তার পকেটে থাকা ছুরি দিয়ে আঘাত করা শুরু করেন। সাইফুদ্দিনের পরনে প্যান্ট ছিল কিন্তু গায়ে জামা ছিল না।
“আশরাফুল ধাক্কা দিলে সাইফুদ্দিন বিছানায় পড়ে যান। তখন গোঙানির শব্দ বন্ধ করার জন্য চাদর দিয়ে গলা পেঁচিয়ে দেন আশরাফুল। সাইফুদ্দিনের বেল্ট দিয়েই তার দুটি বেঁধে রাখেন আশরাফুল।
“এরপর আশরাফুল রক্তমাখা হাত ধুয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন তিনি দেখতে পান তার শরীরে রক্তের দাগ লেগে আছে। তিনি তখন আবার হোটেলের কক্ষে যান এবং ধুয়ে বের হয়ে আসেন। আশরাফুল হোটেলের সামনে থাকা সাইফুদ্দিনের মোটরসাইকেল নিয়েই পালিয়ে যান।”
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল আসামির দেখানো নর্দমা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
ঘটনার তদন্ত মাত্র শুরু হয়েছে এমন মন্তব্য করে পুলিশ সুপার বলেন, “এর বাইরেও আরও কিছু থাকতে পারে, আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না। তার পেছনে কারা; কিংবা সম্মিলিতভাবে এর পেছনে কিছু আছে কি-না। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। এটা আশরাফুল স্বীকার করেছেন। একে ভিত্তি ধরে চারপাশে আরও কিছু থাকলে সেটাও আমরা খতিয়ে দেখব নিশ্চয়ই।”

পুলিশের বক্তব্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রশ্নবোধক: পরিবার
পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে সাইফুদ্দিনের পরিবার। তারা এই বক্তব্যকে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রশ্নবোধক’ বলে মন্তব্য করেছে।
সাইফুদ্দিনের ছোট ভাই মহিউদ্দিন মহিম সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশ সুপার গ্রেপ্তার আশরাফুল ইসলামের বরাত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সঙ্গে আমি এবং আমার পরিবার একমত নই। আমরা এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি।
খুনের যথাযথ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ট তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করার জন্য পুলিশ প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়ে মাহিম বলেন, “এটি অনেক অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রশ্নবোধক। আশরাফুলের একার পক্ষে আমার ভাইকে খুন করার দাবিটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তি বিশেষ কিংবা মহল আশরাফুলকে দিয়ে পরিকল্পনা মত খুনের ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে চেষ্টা করছে।
“আমার নিষ্পাপ ভাইয়ের চরিত্র হননের খেলায় মেতে উঠেছে বলে মনে করি । ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত পরিকল্পিত। এবং গ্রেপ্তার আসামি নিঃসন্দেহে একজন পেশাদার খুনি।
মাহিম আরও বলেন, “সাইফুদ্দিনকে চেতনানাশক কিছু দ্রব্য খাওয়ানোর পর অবচেতন করে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। আশরাফুল মাদ্রাসার ছাত্র এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গি। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাচ্ছি।”
আরও পড়ুন:
কক্সবাজারে সাইফুদ্দিনের শরীরে ১৭ ছুরিকাঘাত, খুনি একাই ছিল: পুলিশ
কক্সবাজারে হোটেল কক্ষে আওয়ামী লীগ নেতার হাত বাঁধা লাশ
কক্সবাজারে আওয়ামী লীগ নেতা খুন: সাদা পাঞ্জাবির যুবককে খুঁজছে পুলিশ