Published : 07 Jul 2026, 11:33 PM
অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর মগবাজার থেকে মৌচাক-মালিবাগ আর শান্তিনগর এলাকার যে পরিস্থিতি হয়, সেটি স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় সবারই জানা; বহু পুরনো এ সমস্যা বাড়ে প্রতি বছর বর্ষার সময়ে।
এ মৌসুমে দিনভর বৃষ্টিতে ওই এলাকায় দুর্ভোগের সীমা থাকে না। গোড়ালি থেকে শুরু করে হাঁটু কিংবা কোথায় আবার কোমর পর্যন্তও পানি উঠে যায়। ড্রেন-নালা আর বৃষ্টির পানি মিলে একাকার হয়ে যায়।
মঙ্গলবার দিনভর বৃষ্টিতেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ওই এলাকায়। বিভিন্ন সড়কে হাঁটুসমান পানি জমেছে। তাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা।
এদিন ভারি বৃষ্টিতে শান্তিনগর সংলগ্ন সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শান্তিবাগ ও শান্তিনগরের ভেতরের সড়কগুলোতেও জমে আছে পানি। মালিবাগ ও মৌচাকের সড়কগুলোতে পানি জমেছে।
জলজটের কারণে এসব রাস্তায় চলা যানবাহনগুলো যানজটে বিপাকে পড়েছে। রিকশায় চলাচলেও হয়েছে দুর্ভোগ। পথচারী অনেককে জুতা হাতে নিয়ে নোংরা পানি মাড়িয়ে চলতে দেখা গেছে।
মালিবাগের বাসিন্দাদের একজন আবদুল করিম চুন্নু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৃষ্টি একটু হলেই এলাকা তলিয়ে যাবে, আমাদের ভাবনায় এখন এটাই স্বাভাবিক; এখন আর অবাক হই না।”
শান্তিবাগের বাসিন্দা তুহিন নামে একজন বলেন, “এই বৃষ্টি চলতে থাকলে রাতের মধ্যে রাস্তায় নৌকা নিতে বেরোতে হবে, অথবা সাঁতার কাটতে হবে।”
মৌচাকের বাসিন্দা আব্দুল হাই বলেন, “আমার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে আজ ৫ বছর। ডাক্তার বলেছেন, পায়ের ব্যাপারে যত্নশীল হতে। কিন্তু থাকি এমন এক এলাকায়, একটু বৃষ্টিতে সব ডুবে যায়। পায়ে ময়লা পানি লাগা থেকে বাঁচার উপায় আছে কোনো?”
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৪৬ মিলিমিটার।
আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকায় ক্রমাগত বৃষ্টি চলতে থাকবে ১১ জুলাই পর্যন্ত। এরপর ১২ তারিখ থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমে গেলেও একেবারে থেমে যাবে না।”
মঙ্গলবার বিকালে মৌচাক এলাকায় গিয়ে দুর্ভোগে পড়েন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী সিয়াম আহম্মেদ। জলজটে রিকশা ভাড়া বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “ফুটপাত থাকে হকারের দখলে, আর রাস্তায় তো হাঁটু পানি। রিকশাওয়ালারাও ‘পাগলের মত’ ভাড়া চায়।
“আমাদের মত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের ভোগা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাব কবে?”
মো. সোহেল নামে মৌচাকের এক রিকশাচালক বলেন, “রাস্তায় কোথায় গর্ত, কোথায় ম্যানহোল আছে বোঝা যায় না। যাত্রীও কম পাওয়া যায়। আবার অনেকেই ভাড়াও বেশি দিতে চায় না।”
বৃষ্টিতে যানজটের ভোগান্তি নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শর্মিলা ধর বলেন, “জ্যাম তো এই এলাকায় নতুন কিছু নয়। কিন্তু বৃষ্টিতে জ্যাম আরো বেড়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে অফিস থেকে বাসায় ফিরতে ৪০ মিনিট লাগে। আজ দেড় ঘণ্টার উপর লেগেছে।”
মগবাজারের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “সকালে দোকান খুললেও পানি জমে থাকায় ক্রেতা খুব কম এসেছে। বৃষ্টির দিনে ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।”
মগবাজার-মালিবাগ এলাকায় বৃষ্টি আর জলজটের ভোগান্তি নিয়ে এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেছিলেন, এক্সপ্রেসওয়েসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ড্রেনেজ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মগবাজার-মালিবাগ এলাকায় সমস্যাটি বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মালিবাগ এলাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
“এখন তো পাম্প করে মাঝে মাঝে পানি সরানো হয়। কিন্তু পুরো পানি যদি বুড়িগঙ্গায় নেওয়া না যায়, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এটা করতে সময় লাগবে। আপাতত পাম্প করে যতটুকু পানি সরানো যায়, সেটাই করা হচ্ছে।”
নগর পরিকল্পনাবিদ আকতার মাহমুদ বলেন, “মালিবাগের মত এলাকায় জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ আছে। এর মধ্যে এলাকার নিচু ভূ-প্রকৃতি, ড্রেন পরিষ্কার না থাকা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপ্রতুল সক্ষমতা অন্যতম।
“ঢাকা শহরে কিছু কিছু ‘ডিপ্রেশন এরিয়া’ বা নিচু এলাকা আছে। সেখানে পানি এসে জমা হয়। রাস্তার পাশের ড্রেনগুলো অনেক সময় পরিষ্কার থাকে না। সেখান থেকে পানি মূল ড্রেনে যেতে দেরি হয়। আবার কোথাও ময়লা আটকে থাকলে পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়।”
আকতার মাহমুদ বলেন, “বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হলে ড্রেনেজের যে সক্ষমতা আছে, সেটা সেই পরিমাণ পানি দ্রুত সরিয়ে নিতে পারে না। ফলে পানি জমে থাকে।
“এটার একমাত্র সমাধান হচ্ছে সমন্বিত ড্রেনেজ পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন। আংশিকভাবে বা অ্যাডহক ভিত্তিতে কিছু উদ্যোগ নিলে স্থায়ী ফল পাওয়া যাবে না।”
মালিবাগের জলাবদ্ধতাকে নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে যদি ড্রেনেজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে এত বছরেও সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।”