Published : 07 Jul 2026, 10:47 PM
ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য এবং ভারতের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ আগ্রার তাজমহল আসলে কী মোগল সম্রাট শাহজাহানের তৈরি স্মৃতিসৌধ নাকি এটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির ‘তেজো মহালয়’? এই আইনি বিতর্কে এবার হস্তক্ষেপ করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
বিশ্ব ঐতিহ্যের ওই জায়গাটিতে আসলে ‘তেজো মহালয়’ নামে পরিচিত প্রাচীন হিন্দু মন্দির ছিল- এমন দাবি করা একটি আবেদন গ্রহণের পর এলাহাবাদ হাইকোর্ট ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া বা এএসআই)-কে হলফনামা জমা দেওয়া নির্দেশ দিয়েছে।
আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআই-এর কাছে জানতে চেয়েছেন, বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য কেন এই সৌধের জরিপ করা যাবে না।
এর আগে নিম্ন আদালত তাজমহল নিয়ে কোনও জরিপ পরিচালনা করা কিংবা সেগুলোর বন্ধ ঘরগুলোতে কী আছে তা খুলে দেখার আর্জি খারিজ করেছে। ২০১৫ সালে আগ্রার একটি দেওয়ানি আদালতে এ বিষয়ে প্রথম মামলা দায়ের করা হয়েছিল|
২০১৯ সালে আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক (সিনিয়র ডিভিশন) পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে এবং আইনি গ্রহণযোগ্যতার কারণ দেখিয়ে তাজমহলে জরিপ চালানোর আবেদন খারিজ করে দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ এও ছিল যে, আবেদনকারীরা জমির সংশ্লিষ্ট রাজস্ব নথি দাখিল করতে পারেননি।
আবেদনকারীরা এরপর জেলা আদালতে রিভিশন পিটিশন করেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজ এই আবেদনটিও অযোগ্য বলে খারিজ করে দেন। এরপর আর কোনও পথ না পেয়ে আবেদনকারীরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।
হাইকোর্টে এই রিভিশন পিটিশনের শুনানির পরই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) মতামত ও অবস্থান জানতে চেয়েছে আদালত।
আইনজীবী হরি শঙ্কর জৈনসহ আরও কয়েকজন হাইকোর্টে এই আবেদন করেন। তাদের দাবি, তাজমহলের স্থাপত্যে অন্তত ১০৯টি এমন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে এটি একটি মন্দির ছিল। স্মৃতিস্তম্ভটি পরিদর্শন এবং সেটির ছবি ও ভিডিওগ্রাফির জন্য একজন ‘অ্যাডভোকেট কমিশনার’ নিয়োগেরও আবেদন জানিয়েছেন তারা।
তাদের যুক্তি, কেবল স্থাপত্যশৈলীর উপর নির্ভর না করে এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে কাঠামোটি আদতে কোনও শিব মন্দির ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। আবেদনকারীরা তাজমহলকে একটি মন্দির হিসাবে ঘোষণা করার দাবি জানানোর পাশাপাশি সেখানে পুজোপাঠ এবং প্রার্থনারও অনুমতি চেয়েছেন।
তাদের যুক্তি, সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। তাজমহল কেন মন্দির ছিল, তার স্বপক্ষে যুক্তিও দিয়েছেন আবেদনকারীরা। স্থাপত্যগত কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা তারা উল্লেখ করেছেন। তারা বলছেন, তাজমহলের মূল গম্বুজের ওপরের পদ্মপাপড়ির নকশা ও চূড়া স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য।
তাছাড়া, তাজমহলের ভেতরে একটি কাঠামোকে এএসআই-এর নথিতে ‘গোশালা’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন আবেদনকারীরা। তারা জানান, এ ধরনের স্থাপনা মন্দিরের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ‘তেজো মহালয়’ নামে পরিচিত প্রাচীন শিব মন্দিরটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা পরমার্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন। পরে এটি জয়পুরের রাজা মান সিং ও রাজা জয় সিংয়ের নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর মোগল সম্রাট শাহজাহান এটিতে ইসলামি স্থাপত্যশৈলী যোগ করে তার স্ত্রী মমতাজের স্মৃতিসৌধে রূপান্তরিত করেন।
এএসআই স্মৃতিস্তম্ভটির কয়েকটি তলা তালাবদ্ধ রেখে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত করেছে বলেও আবেদনকারীরা অভিযোগ করেছেন।
তাদের দাবি, নিম্ন আদালত মূল বিষয়ের পরিবর্তে অপ্রাসঙ্গিক কারণ দেখিয়ে আবেদন খারিজ করেছে। যেহেতু স্মৃতিস্তম্ভটিতে তাদের অবাধ প্রবেশাধিকার নেই, তাই মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তির স্বার্থে আদালতের নিয়োগ করা একজন কমিশনারের মাধ্যমে পরিদর্শন, ছবি ও ভিডিয়োগ্রাফির অনুমতি দেওয়া উচিত।
এর পাশাপাশি একটি অন্তর্বর্তীকালীন আবেদনেও এএসআই-এর পরিচালককে নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে তাজমহলের ভেতরের ও বাইরের ছবি তুলে তা হাইকোর্টে জমা দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই কেন্দ্র ও এএসআই-কে হলফনামা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট । নির্দেশ অনুযায়ী নোটিস জারির প্রক্রিয়া ১০ দিনের মধ্যে কার্যকর করতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।