ছেলের শোকে শাবিতে বুলবুলের মা, চাইলেন বিচার

পরিবার চেয়েছিল বুলবুলের সঙ্গে থাকা ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে, কিন্তু পুলিশ তাতে সায় দেয়নি।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 31 July 2022, 12:39 PM
Updated : 31 July 2022, 12:39 PM

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে ‘ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে’ নিহত ছেলে বুলবুল আহমদের হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেন মা ইয়াসমিন বেগম।

ছেলের পড়াশোনার ক্যাম্পাস, থাকার কক্ষ, ছুরিকাঘাতের ঘটনাস্থল দেখার জন্য প্রতিনিয়ত বিলাপ করছিলেন শোকাগ্রস্ত মা; তাই রোববার সকালে পরিবারের সদস্যরা প্রায় দুইশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাকে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসেন।

‘ছেলের স্মৃতির শোক সইতে পারবেন না’ বলে ইয়াসমীন বেগমকে বুলবুলের থাকার কক্ষ ও ঘটনাস্থলে যেতে দেননি পরিবারের সদস্যরা। শাহপরাণ হলের প্রভোস্টের কক্ষে বসেই তিনি কথা বলেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইয়াসমীন বলছিলেন, “আমার পুত আর পাইতাম না গো। আমার পুত আমায় মা ডাহে না।”

‘‘ছেলে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত চাই, সুষ্ঠু বিচার চাই।”

এ সময় তার পাশে পরিবারের আট সদস্য ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও বুলবুলের সহপাঠীরা উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৫ জুলাই সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজীকালুর টিলায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে লোক প্রশাসন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বুলবুল আহমদ নিহত হন। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর মাধবদীর খড়িয়া এলাকায়। এ সময় তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীও ছিলেন।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ইশফাকুল হোসেনের দায়ের করা মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ; যারা এরই মধ্যে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডের ছয় দিনের মাথায় বুলবুলের মা, বড় ভাই মো. জাকারিয়া আহমেদ, বড় বোন সোহগী আক্তার, কানিজ ফাতেমা, মামা কামাল আহমেদসহ নয় সদস্য সকাল ১০টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসেন। সবার চোখে ছিল পানি, মুখ ছিল ভারী।

তাদেরকে বুলবুলের আবাসিক শাহপরাণ হলে রিসিভ করেন প্রভোস্ট অধ্যাপক মিজানুর রহমান। এই হলের বি ব্লকের ২১৮ নম্বর কক্ষে থাকতেন বুলবুল।

প্রভোস্টের কার্যালয়ে বসে বুলবুলের বড় ভাই মো. জাকারিয়া বলেন, “মাকে আমরা আটকিয়ে রাখতে পারছিলাম না। বুলবুল যেখানে থাকতো তিনি সেখানে আসতে চাচ্ছিলেন। তাই এই ক্যাম্পাসে নিয়ে আসি।”

‘‘বুলবুলের কক্ষে নিয়ে গেলে মা বেহুশ হয়ে পড়বেন। আমরাও যাইনি। আমরাও ভীষণভাবে ব্যথিত। যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানেও নিয়ে যাইনি। কারণ মা সইতে পারবেন না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিল বুলবুল। সে খুব আদরের ছিল। আট মাস আগে বাবা মারা যান।”

“এ অবস্থায় ওকে পড়ালেখা করাতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয় আমাদের পরিবারের। কষ্ট হলেও তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে পড়ালেখা করাচ্ছিলাম। আমার বোনটা ভীষণ কষ্ট করেছে বুলবুলের পড়ালেখার খরচ যোগাতে। সে বিয়ে পর্যন্ত করেনি।”

বড় বোন সোহাগী বলেন, “যারা এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে তাদেরকে রিমান্ডে নেওয়া হোক। গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই রাজমিস্ত্রি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদেরকে ওদের মতো লোকেরা খুন করে ফেলবে এটা হতে পারে না। নিশ্চয়ই এর পেছনে কারো হাত আছে।’’

‘‘আমাদের বিশ্বাস, অবশ্যই কারো হাত আছে। ছিনতাইকারীরা এমন নির্মমভাবে হত্যা করবে না। ছিনতাইকারী ছুরি দিয়ে একটা আঘাত করতে পারে। কিন্তু এভাবে আঘাত করবে এটা আমাদের বিশ্বাস হয় না। নিশ্চয়ই কারো হাত আছে। তার আঘাত দেখে মনে হয়েছে যে, তার ওপর কারো ক্ষোভ ছিল। এর মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।”

‘‘এমনও হতে পারে কেউ ওদেরকে টাকা দিয়ে বলছে, তোমরা কাজটি করো। তাদেরকে রিমান্ডে নেওয়া হোক। তাহলে সব সত্য বের হয়ে যাবে। আমরা আমাদের ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”

এর আগে বুলবুলের কক্ষ পরিদর্শনে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইশরাত ইবনে ইসমাইল, হল প্রভোস্ট মিজানুর রহমান, বুলবুল হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দেবাশীষ দেব, মামা কামাল আহমেদ প্রমুখ।

বুলবুলের কক্ষে থাকা তার ব্যবহারের জিনিসপত্র পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন হল কর্তৃপক্ষ।

প্রভোস্ট মিজানুর রহমান বলেন, বুলবুলের ব্যবহৃত ল্যাপটপ, বইপত্র,লেপ, তোষক, বালিশসহ প্রয়োজনীয় জিনিস পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

হল থেকে বেরিয়ে তারা প্রভোস্টের কার্যালয়ে আসেন। এ সময় তারা বুলবুলের সঙ্গে থাকা ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও পুলিশ তাতে অনুমতি দেয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মামলার তদন্তের স্বার্থেই ওই ছাত্রী কথা বলতে পারবেন না।

এ ব্যাপারে বুলবুলের ভাই জাকারিয়া বলেন, “বুলবুল হত্যার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ওই মেয়ে। কিন্তু আজকে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি।”

“আমি বুঝতেছি না, মেয়েটিকে কেন আড়াল করা হচ্ছে? মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, সপ্তাহখানেক পরে নাকি কথা বলা যাবে। আমার ভাই হারিয়েছি। তার অন্তিম সময়ে সেই মেয়েটিই কাছে ছিলেন। তার কাছ থেকে দুটি কথা শুনতে পারতাম, কী ছিল তার শেষ কথা”, কান্নায় ভেঙে পড়েন জাকারিয়া।

“আমার ভাই আমার চেয়ে পাঁচ আঙ্গুল লম্বা ছিল। তার মতো দুই-তিনটা ছেলে তাকে মেরে ফেলতে পারে এটা আমার বোধগম্য নয়। মেয়েটি কিসের জন্য হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে? কললিস্ট মুছে দিয়েছে? ছুরিকাঘাতের পর ১৫ মিনিট রক্তক্ষরণ হয় ওই এলাকায়। ১৫ মিনিট পরে মেয়েটি নিচে এসে মানুষ ডেকেছে।”

জাকারিয়ার ভাষ্য, “এ অবস্থায় সময় বেশি গড়িয়ে গেলে হত্যার ঘটনাটি হালকা হয়ে যাবে। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করেছেন কি-না জানতে চাইলে বুলবুলের ভাই বলেন, “গতকাল রাতে ভিসির সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি আজ নরসিংদী যেতেন, কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যেতে পারেননি। আমরা সিলেটে আছি বললে উনি জানান, তিনি ঢাকায় যাচ্ছেন।”

বুলবুলের মামা কামাল আহমেদ বলেন, তার মায়ের একটাই দাবি, সত্যিকারের যারা দোষী তাদের বিচার যেন হয়।

শাহপরাণ হল থেকে বুলবুলের পরিবারকে প্রক্টরের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় প্রক্টরের সঙ্গে কথা হয় পরিবারের। সেখানে ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক আমিনা পারভীন উপস্থিত ছিলেন। বুলবুলের পরিবারের সদস্যরা দুপুর পৌনে ২টার দিকে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

এ ব্যাপারে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইশরাত ইবনে ইসমাইলকে একাধিকবার কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

ছাত্রকল্যাণ উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক আমিনা পারভীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলনে, “বুলবুলের পরিবার চাচ্ছিলেন ওই মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন যে, তদন্তের জন্য তার সঙ্গে এখন দেখা করা যাবে না। তারা চান এই হত্যাকাণ্ডের যেন সুবিচার হয়।”

“আমরা তাদেরকে আশ্বাস দিয়েছি যে, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। আমরা চাই, এ ঘটনার একটি সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং সুবিচার হোক।”

আরও পড়ুন:

Also Read: বুলবুলের বিভাগে ১০ দিন ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত

Also Read: শাবিতে বুলবুল হত্যা: আরও দুই জনের জবানবন্দি

Also Read: শাবিতে বুলবুল খুন: সহপাঠীদের চার দাবি

Also Read: শাবি শিক্ষার্থী বুলবুলের শরীরে ৩ আঘাতের চিহ্ন: চিকিৎসক

Also Read: শাবিতে বুলবুল খুনের দুদিনের মাথায় আদালতে জবানবন্দি

Also Read: শাবি শিক্ষার্থী বুলবুল হত্যায় আটক আরও ৩

Also Read: শাবির বুলবুলের গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম

Also Read: বুলবুলের খুনিদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার ‘আল্টিমেটাম’ শাবি শিক্ষার্থীদের

Also Read: শাবি শিক্ষার্থী খুন: আশ্বাসে সড়ক ছাড়ল সহপাঠীরা, মামলা দায়ের

Also Read: শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ছুরিকাঘাতে নিহত

Also Read: ক্যাম্পাসে খুন হওয়া বুলবুলের মরদেহ বাড়ির পথে

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক