Published : 23 Jul 2026, 05:30 PM
ঘুমানোর সময় অনেকেরই তীব্র নাক ডাকার অভ্যাস থাকে। সাময়িকভাবে এটিকে গভীর ঘুমের লক্ষণ মনে করা হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ নামক জটিল রোগের লক্ষণ ধরা হয়।
এই রোগে ঘুমের ঘোরে শ্বাসনালী বারবার বন্ধ হয়ে যায়, ফলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা হঠাৎ কমে গিয়ে দম আটকে মানুষের ঘুম ভেঙে যায়।
ওজন বৃদ্ধি এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ এই সমস্যাকে আরও মারাত্মক করে তোলে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-বিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথ ডটকমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সঠিক নিয়মে জীবনযাত্রা পরিবর্তনের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে ৭টি বিশেষ খাবার রাখলে, কোনো ওষুধ ছাড়াই এই রোগের তীব্রতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
ফ্লোরিডার স্বাস্থ্য গবেষক লিন্ডসে কার্টিস এবং মার্কিন নিউরোলজিস্ট ও ঘুম-বিষয়ক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. স্মিতা প্যাটেল –এর তথ্য অনুযায়ী, স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীদের জন্য উপকারী ৭টি খাবারের তালিকা নিচে তুলে ধরা হল।
সবুজ শাকসবজি
পালং শাক, কলমি শাক বা বাঁধাকপির মতো সবুজ শাকে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকে।
ডা. স্মিতা প্যাটেল বলেন, “ম্যাগনেসিয়াম শরীরের পেশিগুলোকে শিথিল করতে পারে। আর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শ্বাসনালীর ভেতরের কোষের ফোলাভাব বা প্রদাহ কমায়, যা রাতে সহজে শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
ওমেগা-থ্রি সমৃদ্ধ চর্বিযুক্ত মাছ
ইলিশ, রুই, স্যামন বা টুনা মাছের মতো চর্বিযুক্ত মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস থাকে।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওমেগা-থ্রিস রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা কমায়।
যেহেতু স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, তাই এই স্বাস্থ্যকর চর্বি হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতেও দ্বিগুণ সাহায্য করে।
লাল চাল ও ওটস
আঁশযুক্ত খাবার যেমন— ওটস, লাল চালের ভাত বা কিনোয়া ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে ঘুমের সময় শ্বাসনালীর ওপর চর্বির চাপ কম পড়ে, যা স্লিপ অ্যাপনিয়ার পরিমাণ বা দম আটকে যাওয়ার ঘটনা কমিয়ে আনে।
বিভিন্ন ধরনের বাদাম
কাঠবাদাম, কাজুবাদাম বা চিনা বাদামে রয়েছে ভিটামিন-ই, মেলাটোনিন এবং ম্যাগনেসিয়াম।
মেলাটোনিন হরমোন প্রাকৃতিকভাবে শরীরের ঘুমের চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীকে একনাগাড়ে গভীর ও আরামদায়ক ঘুম এনে দিতে পারে।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ বেরি
কালো জাম, স্ট্রবেরি বা ব্লুবেরির মতো ফলে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। ঘুমের মধ্যে বারবার অক্সিজেন কমে যাওয়ার কারণে শরীরে যে ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ বা কোষের ক্ষতি হয়, বেরি ধরনের ফল সেই ক্ষতি পূরণ করে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ থেকে শরীরকে বাঁচায়।
চর্বিহীন প্রোটিন
মুরগির মাংস, ডিম এবং টফু বা সয়াবিন ধরনের চর্বিহীন প্রোটিনে ‘ট্রিপটোফ্যান’ নামক একটি অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। এটি মস্তিষ্কে মেলাটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা মেটাবলিক সিন্ড্রোম এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে ঘুমের গুণগত মান বাড়ায়।
কম চর্বিযুক্ত টক দই বা দুধ
২০১৮ সালে ‘সেজ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘হোয়াট ইউ ইট কুড এফেক্ট ইয়োর স্লিপ: ডায়েটারি ফাইন্ডিংস ইন পেশেন্টস উইথ নিউলি ডায়াগনোসড অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়, স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত স্থূলকায় ব্যক্তিরা যদি প্রতিদিন অন্তত দুই কাপ কম চর্বিযুক্ত দুধ বা টক দই খান, তবে তাদের শ্বাসকষ্টের তীব্রতা অনেক কমে আসে।’
ডেইরি প্রোডাক্ট বা দুগ্ধজাত খাবারের প্রদাহ-নাশক ক্ষমতা, এই ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।
স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে যে খাবারগুলো বর্জন করা উচিত
প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এমন কিছু খাবারের কথা বলেছেন যা শ্বাসনালীর পেশিকে শিথিল করে বা কফ বাড়িয়ে রোগটিকে আরও মারাত্মক করে তোলে।
অ্যালকোহল বা মদ: এটি গলার পেশিগুলোকে অতিরিক্ত শিথিল করে দেয়, ফলে ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালী পুরোপুরি লক বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অতিরিক্ত মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজত কার্বোহাইড্রেইট: কেক, পেস্ট্রি বা কোমল পানীয় রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং শরীরে মেদ জমিয়ে শ্বাসনালী সরু করে ফেলে।
কলা: ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন স্কুল অফ মেডিসিনের তত্ত্বাবধানে করা গবেষণায় দেখা গেছে, কলা খাওয়ার ফলে শরীরে কফ বা শ্লেষ্মার উৎপাদন বাড়তে পারে, যা স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীর শ্বাস চলাচলের পথকে আরও সংকীর্ণ করে তোলে।
দেরিতে ক্যাফেইন গ্রহণ: দুপুর বা সন্ধ্যার পর কফি, চা বা চকলেট খেলে, সেগুলো স্বাভাবিক ঘুমচক্রকে ব্যাহত করে।
এছাড়াও, ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্তে খুব ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত, অন্যথায় অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে শ্বাসনালীতে জ্বালাপোড়া হয়ে রাতে দম আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি