Published : 04 May 2026, 03:58 PM
ঘড়িতে রাত সাড়ে দশটা। ফোন রেখে, বাতি নিভিয়ে দিলেন ঘুন। সকাল সাড়ে সাতটায় অ্যালার্ম। মানে ঘুম হয়েছে প্রায় নয় ঘণ্টা।
অথচ অফিসে বসে দুপুরের আগেই চোখ ভারী হয়ে আসছে। মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঝিমঝিম করছে।
মনে হচ্ছে— এত ঘুমালাম, তবু এই অবস্থা কেন?
এই প্রশ্নটা যাদের মনে আসে, তারা ভাবেন হয়তো আরেকটু ঘুমালে ঠিক হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধানটা আরও ঘুমানোয় নয় বরং সমাধানটা কারণ খুঁজে বের করায়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “বিছানায় অনেকক্ষণ থাকা আর শরীর আসলে বিশ্রাম পাওয়া— এই দুটো এক জিনিস নয়।”
রাতে বারবার ঘুম ভাঙলে, অস্থির ঘুম হলে বা গভীর ঘুমের পরিমাণ কম হলে সকালে সতেজ লাগে না। সময়ের হিসাবে নয় ঘণ্টা হলেও শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়নি।
“ঘুমের মধ্যে বিভিন্ন ধাপ থাকে। গভীর ঘুমের ধাপগুলোতেই শরীর মেরামত হয়, মস্তিষ্ক পরিষ্কার হয়। সেই ধাপগুলো ঠিকমতো না হলে সময় যতই কাটান, সতেজ বোধ হবে না”- বলেন এই চিকিৎসক।
নাক ডাকা
অনেকে জানেনই না যে, তারা রাতে নাক ডাকেন — পরিবারের কাছ থেকে শুনে জানেন। কিন্তু এই নাক ডাকা শুধু পাশের মানুষের ঘুম নষ্ট করে না, নিজের শরীরেরও ক্ষতি করতে পারে।
ডা. দিনা বলেন, ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ নামের একটি অবস্থায় ঘুমের মধ্যে শ্বাস কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে আবার শুরু হয়। এটি ঘুমকে বারবার ব্যাহত করে — যদিও যার হচ্ছে তিনি বুঝতে পারেন না। পরদিন সকালে মাথাব্যথা নিয়ে উঠেন, সারাদিন অতিরিক্ত ঝিমুনি থাকে।”
অনেকে বছরের পর বছর এই সমস্যা নিয়ে চলেন, ভাবেন ক্লান্তি স্বাভাবিক। আসলে এটা চিকিৎসাযোগ্য একটা সমস্যা।
শরীরে রক্তস্বল্পতা থাকলে যতই ঘুমান, ঘুমে সতেজ হবেন না
সারাদিন দুর্বলতা, ক্লান্তি, একটু কাজ করলেই হাঁপিয়ে যাওয়া— এই লক্ষণগুলো থাকলে রক্তস্বল্পতার কথা মাথায় রাখা দরকার।
শরীরে আয়রন বা লৌহের অভাব হলে লোহিত রক্তকণিকা কমে যায়। এতে শরীরের কোষগুলোতে অক্সিজেন পৌঁছানো কমে। ফলে দুর্বলতা আর ঘুম ঘুম ভাব সারাক্ষণ থাকে। নারীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
একটা সাধারণ রক্ত পরীক্ষাতেই রক্তস্বল্পতা ধরা পড়ে। তবে অনেকে এই পরীক্ষা না করে ভাবেন- ‘একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হবে।’ তবে ঠিক আর হয় না।
থাইরয়েড বা শর্করার সমস্যাও এই ঝিমুনির কারণ হতে পারে
থাইরয়েড হরমোন শরীরের পুরো যন্ত্রপাতির গতি নিয়ন্ত্রণ করে। এই হরমোন কম কাজ করলে শরীর যেন ধীর হয়ে আসে — সবকিছু করতে বেশি সময় লাগে, ক্লান্তি লাগে, ঠাণ্ডা বেশি লাগে, ওজন বাড়তে থাকে।
আর রক্তে শর্করার ওঠানামাও একটা কারণ। খাওয়ার পর যদি ঝিমুনি বেশি হয় বা কখনও মাথা ঘোরে। তাহলে রক্তে শর্করার পরীক্ষা করানো ভালো। ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় এই সমস্যা হতে পারে।
এই দুটো সমস্যাই খুব সাধারণ, এবং দুটোই পরীক্ষা করলে ধরা পড়ে।
মানসিক চাপও শরীরে ক্লান্তি হিসেবে ধরা দেয়
এটা অনেকেই বিশ্বাস করেন না। মনের সমস্যা শরীরে কেন আসবে? কিন্তু এটা সত্যি।
“বিষণ্নতা বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপে মানুষ শরীরে ক্লান্তি অনুভব করেন। অনেক সময় বেশি ঘুমান, কিন্তু শক্তি পান না। কাজে মন বসে না, উৎসাহ পান না। এই লক্ষণগুলো একসঙ্গে থাকলে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া দরকার” বলেন ডা. দিনা।
খোলাখুলি বলতে লজ্জা পেলেও, একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা এই অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি।
কিছু সহজ অভ্যাস বদলালে পার্থক্য আসে
এই চিকিৎসক বলেন, “সব ক্ষেত্রে সব কারণ চিকিৎসাসাধ্য সমস্যা নয়। অনেক সময় দৈনন্দিন অভ্যাস বদলালেই উন্নতি হয়।”
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং ওঠার অভ্যাস করুন— সপ্তাহান্তেও। শরীরের একটা ঘড়ি আছে, সেটা ঠিক রাখলে ঘুমের মান ভালো হয়।
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন বা স্ক্রিন রেখে দিতে হবে। নীল আলো মস্তিষ্ককে জাগিয়ে রাখে, গভীর ঘুমে বাধা দেয়।
হালকা শরীরচর্চা- হাঁটা, স্ট্রেচিং দিনের বেলা করলে রাতের ঘুম গভীর হয়। সুষম খাবার আর পর্যাপ্ত পানি পান করার বিষয়টাও এড়ানোর উপায় নেই।
বেশি ঘুমানো নয়, কারণটা খোঁজাটাই আসল সমাধান
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে অতিরিক্ত ঝিমুনি থাকে, কাজে প্রভাব পড়ে বা নাক ডাকার সঙ্গে ক্লান্তি মেলে, তাহলে এটাকে স্বাভাবিক ভেবে বসে থাকার সময় নেই।
একটা সাধারণ রক্ত পরীক্ষা, থাইরয়েড পরীক্ষা বা চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ— এই ছোট্ট পদক্ষেপই হয়তো বছরের পর বছরের ক্লান্তির কারণ বের করে দেবে।
আরও পড়ুন