Published : 23 Jul 2026, 06:16 PM
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ- এর বিভিন্ন স্থাপনায় ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় ইরানকে
লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়া সহায়তা করেছে কিনা বা অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে কিনা তা খতিয়ে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তারা জানান, হামলায় রাশিয়ার জড়িত থাকার বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
তবে হামলার কার্যকারিতা, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ, এবং ইরানকে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সহায়তাই এর প্রমাণ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন তারা।
রয়টার্সসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পাশাপাশি মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের হামলায় রাশিয়া সাধারণভাবে লক্ষ্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছে।
তবে সিআইএ স্থাপনাগুলোতে হামলার ক্ষেত্রে রাশিয়ার জড়িত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের বিষয়টি এর আগে কখনও সামনে আসেনি।
রয়টার্স ও অন্যান্য গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, গত মার্চে অন্তত দুটি সিআইএ স্থাপনায় হামলা হয়। এর একটি ছিল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসে অবস্থিত সিআইএ স্টেশন। আর অন্যটি ছিল, ইরাকের পূর্বাঞ্চলের একটি সিআইএ স্থাপনা।
কয়েকটি সূত্রে বলা হয়েছে, আরও কিছু সিআইএ স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছিল, তবে নিরাপত্তার কারণে তারা বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
গোয়েন্দা নথিতে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত:
একটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীন নথিতে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সিআইএ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে রাশিয়া সম্ভবত ভূমিকা রেখেছে। নথিটি দেখেছেন এমন এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা একথা জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে ব্রিফিং পাওয়া উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদি আরবে হামলায় রাশিয়ার প্রযুক্তিতে আধুনিকায়ন করা ইরানের দুটি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল।
তারা জানায়, একটি ড্রোন দূতাবাস ভবনের বাইরের দেয়ালের দুর্বল অংশে আঘাত করে ছিদ্র তৈরি করে। এরপর দ্বিতীয় ড্রোনটি সেই ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্ফোরিত হয়। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তেহরানকে মস্কোর সহযোগিতা করাটা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। কিন্তু সিআইএ- এর মতো স্পর্শকাতর স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করা হলে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান ব্যাহত করতে মস্কোর ভূমিকা নেওয়ার অভিপ্রায় হতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
গত সপ্তাহ শেষে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর রাশিয়া ইরানকে লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত তথ্য দিচ্ছে কিনা সেটি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ জানানো হলে হোয়াইট হাউজ সেটি সিআইএ-এর কাছে পাঠালেও তারা কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জাতিসংঘে ইরানের মিশন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরব সরকারও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।
গোপন স্থাপনা:
উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়া ইরানের শাহেদ ড্রোনের লক্ষ্যভেদী ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। তাদের ধারণা, রিয়াদের হামলায় ইরান এসব আধুনিক সংস্করণের ড্রোনই ব্যবহার করেছিল।
আরেকটি সূত্র জানায়, রাশিয়া ইরানকে 'কমেটা-এম' নামের একটি স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা দিয়েছে, যা শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ি দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা ইরানের প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের বিরুদ্ধে বেশি কার্যকর।
গত মার্চে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ প্রথম এই তথ্য প্রকাশ করলেও ক্রেমলিন তা 'ভুয়া সংবাদ' বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
বিদেশে সিআইএ-এর কার্যক্রমের মধ্যে বিভিন্ন দেশে দূতাবাসে থাকা প্রধান স্টেশন ছাড়াও সিআইএ ভিবিন্ন কার্যালয় নিরাপদ বাড়ি, লজিস্টিক হাব, নজরদারি ও অন্যান্য গোপন অভিযান স্থাপনা রেখে থাকে। এসব স্থাপনার অবস্থান গোপন রাখা হয়।
সূত্রগুলো হামলার শিকার সিআইএ স্থাপনার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা অবস্থান প্রকাশ করেনি। এক সূত্র জানান, হামলার সংখ্যা “একাধিক, তবে এক ডজনের কম”। আরেকজন জানান, কয়েকটি স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে।
লক্ষ্য নির্ধারণে রাশিয়ার সহায়তা:
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা তদন্ত করে দেখছেন, রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলায় ইরান রাশিয়ার দেওয়া লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করেছিল কিনা। তবে এ বিষয়ে এখনও সন্দেহ রয়ে গেছে।
কয়েকটি সূত্র সতর্ক করে বলেছে, ইরানের লক্ষ্য হয়ত সাধারণভাবে মার্কিন দূতাবাসই ছিল, কিন্তু ঘটনাক্রমে সিআইএ স্টেশনও হামলার শিকার হয়েছে।
তবে কয়েকজন বিশ্লেষক বলছেন, রাশিয়া ছাড়া খুব কম দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সংগ্রহ এবং তা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতা ও আগ্রহ রাখে।
সাবেক সিআইএ স্টেশন প্রধান ও গোপন গোয়েন্দা অভিযানের কর্মকর্তা ড্যানিয়েল হফম্যান বলেন, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব থাকার কারণে রাশিয়া যদি ইরানকে সিআইএ-এর স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করেই থাকে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
তিনি বলেন, “তাদের উভয়েরই স্বার্থের বিষয় হল- নিজেদের প্রভাববলয়ের মধ্যে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানো কিংবা পুরোপুরি দূর করে ফেলা।”