Published : 26 Dec 2025, 01:17 PM
বর্তমানে ‘বন্ধ্যাত্ব’ বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার জন্য একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
সন্তান ধারণের বয়সে সকল দম্পতির প্রায় ১২.৫ শতাংশ এই রোগে ভুগছে যার মধ্যে জিনগত, জীবনধারা ও পরিবেশগত কারণ জড়িত।
বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য সংস্থা বন্ধ্যাত্বকে জনস্বাস্থ্যের জন্য তৃতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে, যা হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের পরেই অবস্থান।
সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে আছে- ডিম্বস্ফোটনের কর্মহীনতা, এন্ডোমেট্রিওসিস, পিসিওস, ফ্যালোপিয়ান টিউবের অস্বাভাবিকতা এবং ইমোনোলজিক্যাল ব্যাধি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১৭.৫ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যাত্বের শিকার।
আর এর থেকে উত্তরণের একটি পথ হতে পারে সঠিক খাদ্যাভ্যাস। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন দিনাজপুরের ‘রাইয়ান হেল্থ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’য়ের পুষ্টিবিদ লিনা আকতার।
আমরা যা খাই তা প্রজনন এবং উর্বতার স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কেননা খারাপ খাবার হরমোনের ভারসাম্য ও শরীরের ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ তৈরির মাধ্যমে শরীরে কোষ ক্ষতিকর করে। ফলে নারীদের ডিমের গুনমান ও পুরুষের শুক্রাণুর গুনমান হ্রাস করে।
‘আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’য়ে প্রকাশিত গবেষণা অনুসারে, যেসব মহিলা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এবং ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার খান- তাদের সুস্থ গর্ভাবস্থার সম্ভাবনা, কম খাদ্যাভ্যাস গ্রহণকারী মহিলাদের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি।
বয়স এবং বংশগতি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করলেও জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস নারীর ডিমের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন করে ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত উর্ববতার উন্নত করতে পারে। অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন উর্বতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মহিলাদের অতিরিক্ত ওজন ইস্ট্রোজেন অতিরিক্ত উৎপাদন করতে পারে যা ডিম্বাশয়ের সমস্যা তৈরি করে। অন্যদিকে কম ওজন ডিম্বস্ফোটকে বাধাগ্রস্ত করে।
পুরুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজনের ফলে টেস্টোস্টোরনের মাত্রা কমে যেতে পারে যা শুক্রাণুর গুনমান খারাপ হওয়ার একটি কারণ।
আসুন জেনে নেওয়া যাক ‘ফার্টিলিটি’ বা উর্ববতা বৃদ্ধি করতে কী ধরনের খাবার গ্রহণ করা উচিত।
প্রথমত উর্বতার বৃদ্ধি করতে সুষম খাবার গ্রহণ করা জরুরি। কেননা এটি শরীরে উর্বতার পাশাপাশি সুস্থ থাকতে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
জটিল শর্করা
গবেষনায় দেখা গেছে যে মহিলারা সরল শর্করা ধরনের খাবার গ্রহণ করেছিলেন তাদের ডিম্বস্ফোটন ও বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বেশি ছিল। আর জটিল শর্করা ধীরে ধীরে শক্তি নির্গত করে এবং হজম হতে বেশি সময় নেয়।
এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে, হরমোনের ভারসাম্য এবং উর্বতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
আর রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীরে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে যা বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বাড়ায়।
জটিল শর্করা সমৃদ্ধ খাবার হল বেশিরভাগ আঁশসমৃদ্ধ যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। এসব খাবারের মধ্যে আছে- গোটা শস্য, ওটস, বাদামি চাল, কুইনোয়া, মসুর ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, আপেল, পেয়ারা ইত্যাদি।
স্বাস্থ্যকর চর্বি
ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস এবং মনোআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাস’য়ের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রোজেস্টেরণ ও ইস্ট্রোজেন এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরণ সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
মনোস্যাচুরেইটেড ফ্যাটস ইনসুলিন সংবেদনশীলতা, প্রদাহের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখে যা পিসিওস সম্পর্কিত সমস্যা উন্নত করে।
ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস-যুক্ত প্রাণিজ খাবারগুলো হল- চর্বিযুক্ত মাছ যেমন ইলিশ, পাঙ্গাশ, রুই ইত্যাদি। এগুলো সপ্তাহে অনন্ত দুবা বার খাওয়া উচিত।
উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের মধ্যে আছে- অ্যাভোকাডো, জলপাই তেল, তিলের তেল। বিভিন্ন প্রকার বাদাম যেমন- আখরোট, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, হ্যাজেলনাট, ব্রাজিল নাট এবং বীজের মধ্যে রয়েছে কুমড়ার বীজ, সূর্যমুখীর বীজ ইত্যাদি।
গবেষনায় দেখা গেছে প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে আখরোট খেলে শুক্রাণুর গতিশীলতা ও মহিলাদের ডিম্বানু সুস্থ রাখতে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।
প্রোটিন
পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় রাখুন, যেমন- ডিম, মাছ, মাংস (চর্বি ছাড়া)। কারণ প্রোটিন শরীরের কোষ তৈরি ও মেরামতের জন্য খুব জরুরী যা হরমোন ভালো রাখতে ও উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি
গবেষণায় দেখা গেছে উর্ববতা বৃদ্ধি করতে এবং গর্ভবতী হতে পাতাযুক্ত সবুজ শাক অনেক উপকারী। কারণ পাতাযুক্ত শাকসবজি ফোলেইটের ভালো উৎস যা নারীদের গভৃাবস্থায় ভ্রুণের ও মেরুদণ্ডের বিকাশে এবং পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা উন্নত করতে অত্যাবশ্যক।
এছাড়া পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজিতে লৌহ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে যা নারীদের ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় সহায়তা করে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হল- অক্সিডেন্টের স্ট্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে রক্ষক হিসেবে কাজ করে যা ডিম্বানু ও শ্রুক্রাণুর ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং গুণমান বজায় রাখতে সাহায্য করে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ এবং ভিটামিন ই, সেলেনিয়াম প্রভৃতি যা টক ও বেরি ধরনের ফল, পাতাযুক্ত শাকসবজি, বিভিন্ন প্রকার বাদাম, বীজ এবং হলুদ থেকে পাওয়া যায় ইত্যাদি।
টক ফল
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখে এবং লৌহ শোষণ উন্নত করে। এগুলো নারীদের ডিমের সর্বোত্তম স্বাস্থ্যের জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেমন- কমলালেবু, লেবু, আঙ্গুর ইত্যাদি।
কিছু মসলা
আদাতে প্রদাহ বিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা হজমশক্তি এবং রক্তসঞ্চালণ উন্নত করার পাশাপাশি পিরিয়ড নিয়ন্ত্রণ করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
এছাড়া দারুচিনি রক্তে শর্করার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে এবং ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা উন্নত করে।
হলুদে আছে কারকিউমিনস নামে শক্তিশালী উপাদান যা ডিমের গুণগত মান উন্নত করে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
আর্দ্র থাকা
সুষম খাদ্যের পাশাপাশি আর্দ্র থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এটা হরমোন এবং ‘সার্ভিকাল মিউকাস’ উৎপাদনকে সমর্থন করে।
শুক্রাণু ও ডিম্বানু পরিবহন এবং বেঁচে থাকার জন্য ‘সার্ভিকাল মিউকাস’ অপরিহার্য যা গর্ভধারনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এজন্য দিনে ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করুন।
টিপস
আরও পড়ুন
মেনোপজের ৬ লক্ষণ উপেক্ষা করা উচিত নয়