Published : 22 Jul 2026, 07:54 PM
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দিতে সরকার পরিকল্পনা করছে বলে তুলে ধরেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
এতে সরকারের বিল আদায়ের হার বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক বোঝা কমবে বলে মনে করছেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার কথা তুলে ধরে বুধবার ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক এক নীতি আলোচনায় এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রীরও স্পষ্ট নির্দেশনা হল, ‘সরকারি অর্থে আর সবকিছু করার প্রয়োজন নেই। যেখানে সম্ভব বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দিন।’ আমার অধীন যেসব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে আমি সেগুলোর বেসরকারিকরণ দেখতে চাই।”
রাজধানীতে হোটেল সোনারগাঁওয়ে বাংলা দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘পলিসি কনক্লেভে’ তিনি বলেন, “আমি সব বিতরণ কোম্পানিকে বেসরকারিকরণ করতে চাই। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পাইকারি বিক্রি করতে পারে, সরকার খুচরা ব্যবসা করতে পারে না। গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণের কাজটি বেসরকারি খাতেরই করা উচিত।“
বর্তমানে দেশে সরকারি কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বিতরণ ও সঞ্চালনের পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকারি একাধিক কোম্পানি।
অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে বিল আদায়ের হার বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক বোঝা কমবে, জবাবদিহিতা ও বিল আদায় নিশ্চিত হবে।”
দেশে গত ১৭ বছরে একটি গ্যাসকূপও খনন হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, “২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে জ্বালানি প্রয়োজন, সেই গ্যাস অনুসন্ধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গত ১৭ বছরে একটি গ্যাসকূপও খনন করা হয়নি। ফলে বর্তমানে পুরো দেশ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
“কিন্তু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে দেশে মাত্র দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) এলএনজি খালাসের কাজ করছে। এর একটি সম্প্রতি দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ গ্যাস পাচ্ছে না, সিএনজিও পাচ্ছে না। অনেক জায়গায় মানুষ সড়ক অবরোধ করছে। এটি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।"
খুলনা অঞ্চলের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রসঙ্গে টুকু বলেন, সেখানে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় সেগুলো এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। ভোলা থেকে গ্যাসের পাইপলাইন নির্মাণ, গ্যাসের প্রাপ্যতা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিয়ে এখনও কাজ চলছে।“
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প না থাকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “আমাদের এনার্জির যে লোকাল রিসোর্সেস আছে এটা আসলে খুব বেশি না। আমাদের সামান্য কয়লা আছে, যেটা উত্তোলন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। গ্যাস যেটা বাংলাদেশের অন্যতম সম্পদ, ২০১৬/১৭ সালে প্রতিদিন প্রায় ২৬০০ থেকে ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সাপ্লাই দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখন প্রতিদিন স্থানীয় উৎস থেকে ১৭০০ মিলিয়ন সাপ্লাই হচ্ছে। আমাদের আরো গ্যাস আছে কিনা, এখনো নিশ্চিত না।”
ভারত ও মিয়ানমারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মিয়ানমার তার দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি ১০০ টিসিএফ রিজার্ভ পেয়েছে, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ একই সময় পেয়েছে ২৯ টিসিএফ। কিন্তু আমাদের বঙ্গোপসাগরে গত ১৭ বছরে কোনো অনুসন্ধান করতে পারিনি। আমরা যদি সার্ভে শেষ করতে পারি, তারপরও কমপক্ষে পাঁচ বছর লাগবে, আমাদের জানতে যে অফশোরে গ্যাস আছে কিনা।”
দেশের উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত না হলে নতুন গ্রাহকদের সংযোগ দেয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজ।
তিনি বলেন, “বর্তমানে তিতাসের কাছে পাঁচ শতাধিক গ্রাহক ডিমান্ড নোট অনুযায়ী অর্থ জমা দিয়ে অপেক্ষায় আছে। সরবরাহ-সংকটের কারণে তাদের সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না।
“তিতাসের আওতাধীন ১২ থেকে ১৩টি জেলার শিল্প প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে চালাতে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস প্রয়োজন। অন্তত ১ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া গেলে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে তারা পাচ্ছেন মাত্র ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস।"
সম্প্রতি একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহের ওপর আরো চাপ তৈরি হওয়ার কথা বলেন তিনি।
ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরীর অভিযোগ, “আমরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে বিনিয়োগ করি, সেগুলোর অর্থায়ন মূলত সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এ ধরনের সংস্থা থেকে হওয়ার কথা ছিল।
"কিন্তু তারা তা করতে না পারায় ব্যাংকগুলো এগিয়ে এসেছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অনেক ব্যাংক বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাস। শুধু ট্রাস্ট ব্যাংকেরই প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ গ্যাস সংকটের কারণে আটকে আছে।"
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “আগে সোলার জেনারেশন সেট ও ক্যাপিটাল মেশিনারি ১%-এ আমদানি করতে পারতাম এখন ১৭ শতাংশ হয়েছে। এখানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) যুক্ত করা হয়েছে।"
সরকারের এ নীতিকে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতিমালা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজনীতার কথা তুলে ধরেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) এই উপাচার্য বলেন, “একক কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং নবায়নযোগ্য শক্তি, কয়লা ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে একটি টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।”
তিনি বলেন, “অতীতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধারাবাহিকভাবে যে অবহেলা করা হয়েছে, তার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।”
বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় কনক্লেভে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বিশ্ব ব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্য পেম, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (আইডিকল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোরসেদ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অন্তর্বর্তীকালীন) মো. এনামুল হক, ওমেরা রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিম বক্তব্য রাখেন।