নির্বাচন কমিশন সংস্কার: ইসির আপত্তি তোলা সুপারিশের কী হবে?
নির্বাচন কমিশন অধ্যাদেশ, সিইসি ও ইসির আচরণবিধি এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুষ্ঠু ভোটের ‘সার্টিফাই’ করার মতো সুপারিশ নিয়ে আপত্তি উঠেছে।
সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশ নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আপত্তি তুলেছে, সেগুলো শেষমেশ বাস্তবায়ন হবে কি না, সেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নিজেদের ‘স্বাধীনতা খর্ব’ করার মতো প্রস্তাবগুলো নিয়ে বেঁকে বসেছে নির্বাচন কমিশন। আপত্তির কথা জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে চিঠিও দিয়েছে তারা।
তবে ঐকমত্য কমিশন বলছে, আপত্তি উঠলেও কিছু বিষয়ে সমঝোতা হওয়ার বিষয়ে তারা এখনও আশাবাদী।
নির্বাচন কমিশন সংস্কারে গত ৩ অক্টোবর আট সদস্যের কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে প্রধান করা হয় সুশাসনের জন্য নাগরিক— সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারকে।
কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে গত ১৫ জানুয়ারি এ কমিশন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে প্রতিবেদন তুলে দেয়, যেখানে সুপারিশ আছে দেড়শর মতো।
কিন্তু কিছু সুপারিশ নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন সিইসিসহ কমিশনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।
তারা বলছেন, ইসির দায়বদ্ধতার জন্য শাস্তির বিধান, আর্থিক স্বাধীনতা, আইনি বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সম্মতি নেওয়া, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুষ্ঠু ভোটের ‘সার্টিফাই’ করা, স্বতন্ত্র সীমানা নির্ধারণ কমিশন ও স্বতন্ত্র জাতীয় নাগরিক ডেটা কমিশন গঠনের মতো সংস্কার ‘প্রয়োজন নেই’।
গত ১৫ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সংস্কার কমিশন প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা ‘ভেঙে’ গেছে। এটা জোড়া লাগানোর জন্য এই সংস্কার কমিশনের প্রচেষ্টা।
“১৮টি উল্লেখযোগ্য জায়গায় ১৫০টির মতো সুপারিশ করেছি। এসব সুপারিশের অন্যতম লক্ষ্য হলো, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; তাদের ক্ষমতায়িত করা। একই সঙ্গে তাদের দায়বদ্ধ করা।”
কিন্তু ‘দায়বদ্ধ’ করার সুপারিশ নিয়েই মূলত জোরালো আপত্তি তোলে ইসি।
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে কমিশনের বিরুদ্ধে সংসদীয় কমিটির তদন্ত করার ক্ষমতা, সীমানা নির্ধারণে স্বাধীন কমিশন ও এনআইডির আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাবে আপত্তি তোলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারও (সিইসি)।
গত ২৬ জানুয়ারি নির্বাচন ভবনে এক অনুষ্ঠানে এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, “এসব প্রস্তাব ইসির স্বাধীনতা খর্ব করবে।”
সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন সামনে আসে গত ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৭ মার্চ ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতির কাছে চিঠি দিয়ে ‘ইসির স্বাধীনতা খর্ব হয়’ এমন বিষয়গুলো তুলে ধরে আপত্তি জানায় ইসি সচিবালয়।
সেদিন ইসি সচিব বলেন, ভোটের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘সার্টিফাই’ করার সুপারিশের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন মনে করে, এর প্রয়োজন নেই। কারণ ফলাফলের যে গেজেট প্রকাশ হয়, সেটাই সার্টিফিকেশন।
নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা ও নির্বাচন কমিশনারদের শাস্তির বিষয়ে সংস্কার কমিশন যে সুপারিশ করেছে, তাতেও ভিন্নমত থাকার কথা তুলে ধরেন ইসি সচিব।
এর মধ্যে তবে কমিশন যেসব সুপারিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য ভেবেছে, সেগুলো গত ৩০ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানিয়ে দেয়। তাতে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ৯টি বিষয় থাকলেও ঠাঁই পায়নি ‘ভিন্নমত’ জানানো সুপারিশসমূহ।
ইসি যে নয়টি বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য ভাবছে, তার মধ্যে রয়েছে—গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন; নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন সংশোধন; নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন সংশোধন; নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও গণমাধ্যম নীতিমালা (স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক) পর্যবেক্ষণ ও সাংবাদিক নীতিমালা সংশোধন; রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা সংশোধন; হলফনামার খসড়া; ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ; পোস্টাল ব্যালট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন এবং রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও শুদ্ধাচার চর্চা নিশ্চিত করা।
নির্বাচনি আইনে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে ইসির সম্মতি আসার পর আইন মন্ত্রণালয় হয়ে উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন হতে হবে। এরপর সংশোধন অধ্যাদেশ আকারে তা জারি করা হবে।
এরই মধ্যে ভোটের সময়সীমা নিয়ে আলোচনা চলছে। শুরুতে এপ্রিলের প্রথমার্ধে ভোটের ঘোষণা আসে; এরপরই নির্বাচন প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের আলোচনাও হয়।
সংস্কার সুপারিশের অগ্রগতি ও ভোটের সময়সীমা নিয়ে আলোচনার মধ্যে ২৬ জুন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সিইসি। এরপর ৮ জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠক হয় সিইসির।
প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের পরই দ্রুত সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়নে তৎপরতা বাড়ে। সিইসির ভাষায়, “ফুল গিয়ারে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।”
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, সংস্কার কমিশনের সার্বিক সুপারিশ বাস্তবায়নে ইসি রাজি রয়েছে। কিছু বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তারা। আর যেসব সুপারিশ রাখা যাচ্ছে না, তাতে করার কিছু নেই।
এখনো ‘আশায়’ সংস্কার কমিশন
ইসির দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে এখনও হাল ছাড়তে চান না সংস্কার কমিশন প্রধান।
শুক্রবার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “ইসি কী অন্তর্ভুক্ত করেছে, কী করেনি, তা আমি দেখিনি। আমাদের সঙ্গে তো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
“আমরা কিছু বিষয়ে জানতে চেয়েছি। আর সীমানা পুনর্নির্ধারণে বিশেষায়িত কমিটির বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছে। আমরাও অপেক্ষা করি, দেখি ইসি কী কী করছে।”
ইসির সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের ৮ জুলাইয়ের বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা বিস্তারিত আলাপ করিনি। আমাদের সঙ্গে নীতিগত কিছু আলোচনা হয়েছে। এরপর তো নির্বাচন কমিশন কাজ করেছে। কোনটা গ্রহণ করেছে, কোনটা করেনি, নিশ্চিতভাবে জানি না।”
বদিউল আলম বলেন, “সময় স্বল্পতার বিষয় নেই। কিছু এখন প্রয়োগ করতে হবে, কিছু পরে করতে হবে। কেন সব প্রস্তাব রাখা যাবে না, হয়ত দু-একটা সুপারিশ রাখা না যেতে পারে। আমরা তো মনে করি, সবগুলো জিনিসই গুরুত্বপূর্ণ, সেজন্য আমরা প্রস্তাব করেছি।”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এ সদস্য বলেন, “৭-৮টা বিষয়ে ঐকমত্য হয়ে গেছে। আরও ৮-১০টা বিষয়ে আলোচনা হতে হবে এবং ঐকমত্যে পৌঁছাব আশা করি। এরপর সনদে সই হবে।”
