Published : 18 Jul 2025, 08:44 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘নির্বাচনকালীন কর্তৃত্ব’ বাড়াতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে নির্বাচন কমিশন।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে মতবিরোধ হলে ইসির চাহিদা প্রাধান্য পাবে––এমন বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) যুক্ত করার কথা রয়েছে এসব প্রস্তাবে।
সেখানে আরো বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার ৪৫ দিন আগেই প্রশাসন, পুলিশসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইসির অধীনে চলে যাবে; সরকারি কর্মকর্তারা নির্দেশনা না মানলে গোপনীয় অনুবেদন ও শাস্তির ব্যবস্থা নিতে পারবে ইসি।
এছাড়া দুই প্রার্থীর ভোট সমান হলে লটারির নিয়ম বিলোপ করে পুনঃভোটের আয়োজন, নির্বাচনী ব্যয় তদারকিতে কমিটি গঠন, দলের নির্বাচনী ব্যয় ও আয়-ব্যয়ের তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপ; প্রতীক বরাদ্দের আগেই মামলার নিষ্পত্তি; হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে ভোটের পরেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ; মিথ্যা অভিযোগ দিলে মামলা করার মত বেশ কিছু প্রস্তাব ইসির বিবেচনায় রয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের শতাধিক সুপারিশ মিলিয়ে এসব প্রস্তাব এখন ইসির আলোচনায় রয়েছে। পরবর্তী কমিশন সভায় আরপিও সংশোধনের এসব প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কথা। কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে আরপিও সংশোধনের খসড়া উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তোলা হবে। সেখানে অনুমোদন পেলে অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে।
১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ এর জাতীয় নির্বাচনে যুক্ত থাকা সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলছেন, নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব বাড়ানোর যে সুপারিশগুলো রয়েছে, সেটা ‘ভালো’।
“সাংবিধানিক সংস্থা বা তার কর্তৃত্ব থাকলে অসুবিধা নাই। তাদের হাতে ক্ষমতা থাকা দরকার।”
তবে এ বিশ্লেষকের ভাষ্য, ইসির কর্তৃত্ব কাগজে থাকলে হবে না, সরকারের সদিচ্ছাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আর জনগণের মধ্যে আস্থা ফেরাতে হবে।
“এসব তো কাগজের কথা। কাগজের কথা মানলে ঠিক আছে। কিন্তু না মানলে… লেখা থাকল ইলেকশন কমিশনের কথা গুরুত্ব পাবে, কিন্তু সরকার মানল না। তাহলে কী করবেন?”

কর্তৃত্ব কোথায় বাড়বে?
নির্বাচন কমিশনকে প্রাধান্য দিতে ‘কার্পণ্য বা কর্তব্যে অবহেলা’ করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা চাইছে ইসি।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন আরপিওর ৫ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে নতুন দুটি দফা (৩ ও ৪) যুক্ত করার সুপারিশে করেছে।
সরকার ও ইসির মধ্যে কোনো মতবিরোধ হলে ‘ইসির চাহিদাকে’ প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টিও আরপিওতে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা সরকারের কোনো বিভাগ কর্তব্যে অবহেলা করে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারী বা বিভাগের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে ইসি।
নির্বাচনের সময় ইসিকে সহায়তা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে সরকারের সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের ওপর।
তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন সরকারের সময় সহায়তা পেতে ইসির তেমন বেগ পেতে হয় না। কিন্তু দলীয় সরকারের সময় ইসির চাহিদা কখনও কখনও সাড়া পায় না। এ নিয়ে অতীতে কোনো কোনো সিইসি উষ্মাও প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনি কাজে বা ভোটের ফলাফলে প্রভাব খাটালে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইসি নির্দেশনাও দেয়।
আরপিওর ৭ অনুচ্ছেদে দুটি নতুন অনুচ্ছেদ [৭(৭)(ঘ) ও ৭(৭)(ঙ)] যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। সেখানে বলা থাকবে, দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা চাকরি বই ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) উল্লেখ থাকতে হবে।
সবশেষ গাইবান্ধা-৫ উপ নির্বাচন পুরোপুরি বন্ধ করার পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে ইসির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। নতুন বিধান যুক্ত হলে অনিয়মকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় এখতিয়ার বাড়বে ইসির।
‘নিরপেক্ষ ভোটের স্বার্থে’ নির্বাচনকালীন প্রশাসনের ওপর ইসির কর্তৃত্বের সময়ও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে অথবা তফসিল ঘোষণার ৪৫ দিন আগে থেকে ফলাফল ঘোষণার ১৫ দিন পর পর্যন্ত ইসির অনুমতি ছাড়া জেলা থেকে বিভাগীয় প্রশাসন-পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলি করা যাবে না।
বিদ্যমান বিধানে তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ কর্তৃত্বের সুযোগ রয়েছে।
কোনো কর্মকর্তাকে বদলি বা প্রত্যাহার করার দরকার হলে ইসি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা করতে হবে। নির্দেশ পালনে বিলম্ব বা অনীহা দেখালে ইসি সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে গোপনীয় অনুবেদন দেবে যা তাদের পদোন্নতি বা শাস্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে।
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনপূর্ব সময়ে, নির্বাচনকালীন বা নির্বাচনের পরে কোনো অভিযোগ উঠলে তদন্ত করবে ইসি; তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেয়ে তা নিষ্পত্তি করা হবে।
পাশাপাশি তদন্তে মিথ্যা, সাজানো বা ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রমাণ হলে অভিযোগকারীকে সতর্ক করা হবে বা তার বিরুদ্ধে মামলা করবে ইসি।

লটারি নয়, পুনঃভোট
দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির নিয়ম বাদ দিয়ে পুনঃভোটের বিধান চালুর প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
বদিউল আলম মজুমদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের একগুচ্ছ সুপারিশেও এ প্রস্তাব রয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৩৮ অনুচ্ছেদে সমান ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে লটারি করে একজনকে নির্বাচিত করার ক্ষমতা রয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তার।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, দুই প্রার্থী সমান ভোট পেলে রিটার্নিং অফিসার তা লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে জানাবে; এরপর কমিশন সমান ভোটপ্রাপ্তদের মধ্যে পুনঃভোটের নির্দেশ দেবে।
দুই বা ততোধিক প্রার্থীর মধ্যে ভোটের সংখ্যা সমান হলেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
জোট করে ভোট করলেও মার্কা নিজ দলের
আরপিও সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনে জোট করলেও নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে।
২০ অনুচ্ছেদে নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে–একাধিক দল জোটগতভাবে/যৌথভাবে মনোনয়েনের ক্ষেত্রে স্ব স্ব রাজনৈতিক দলের নির্ধারিত প্রতীক (প্রার্থীর দলের নিজস্ব প্রতীক)বরাদ্দ পাবে।
অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপির সঙ্গে জোট করে অন্যদলের প্রার্থীরা নৌকা বা ধানের শীষে ভোট করেছেন। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, জোট করার তিন দিনের মধ্যে কমিশনকে জানাতে হয় এবং অন্যের প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দিতে হয়।
নতুন সংশোধনী এলে বড় দলের সঙ্গে জোট করলেও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর যে দলের প্রার্থী ভোটে থাকবে তার মার্কায় ভোট করতে হবে।
ব্যয় মনিটরিং ও দলের আয় ব্যয় ওয়েবসাইটে
নির্বাচনী ব্যয়ের অনিয়ম রোধে ‘নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি’ করার বিধানও রয়েছে ইসির প্রস্তাবে।
সেখানে বলা হয়েছে, ব্যয়ের রিটার্ন অডিট ফার্মের মাধ্যমে করতে হবে। অনিয়ম ধরা পড়লে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হবে। ব্যয় রিটার্ন নির্ধারিত সময়ে দিতে না পারলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
দলের নির্বাচনী ব্যয় এবং দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনকে নিরীক্ষা করতে হবে, পাশাপাশি ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করতে হবে। ইসির নিরীক্ষায় অনিয়ম ধরা পড়লে কমিশন ব্যবস্থা নেবে।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, প্রার্থী ও দলের ব্যয় এবং বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ইসি নিরীক্ষা করে না। ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করে না।

ইসির শুনানির আগে আদালতের আদেশ নয়
মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির পর ইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে বলে সুপারিশ করা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে ইসিকে শুনানির সুযোগ না দিয়ে আদালতের কোনো আদেশ না দেওয়ারও প্রস্তাব রয়েছে।
অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনে আপিল নিষ্পত্তির পর অনেকেই আদালতে গিয়ে প্রার্থিতা ফিরে পান বা কারো প্রার্থিতা বাতিল হয়। ব্যালট পেপার ছাপানো শেষ হলেও অনেক সময় ভোটের মাত্র কয়েকদিন আগে আদালতের আদেশ নিয়ে আসেন প্রার্থী। তখন বেশ বেগ পেতে হয় ইসিকে।
প্রতীক বরাদ্দের পর ব্যালট পেপার চূড়ান্ত করতে জটিলতা পরিহারে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
রিটার্নিং অফিসার মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাইয়ের পর সংক্ষুব্ধরা কমিশনে আপিল করতে পারে। আপিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। তবে যদি কোনো সংক্ষুব্ধ প্রার্থী কমিশনের আপিল আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন, তাহলে প্রতীক বরাদ্দের আগেই তা নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরদিন প্রতীক বরাদ্দ করে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। আর্থিক সাশ্রয়, নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার জটিলতা পরিহারে প্রতীক বরাদ্দের আগে মামলা নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে।

হলফনামা, নিবন্ধন স্থগিত, আরও যত সংস্কার
প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা ও হলফনামায় নতুন বিষয় যুক্ত করার সুপারিশ রয়েছে ইসির আলোচনায়।
এর মধ্যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা অন্য কোনো পদে থাকলে, প্রার্থী হতে ন্যূনতম স্নাতক পাস, কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যনিবাহী হলে লাভজনক পদ হিসেবে বিবেচনা করা, হলফনামায় দেশে ও বিদেশে আয়ের উৎস জানানোর বিষয় রয়েছে।
হলফনামায় সবশেষ সার্টিফিকেট দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্দিষ্ট করা নেই।
এবার শিক্ষাগত যোগ্য স্নাতক নির্ধারণের জন্য একজন আইনজীবী সরকার ও ইসির কাছে বিশেষ প্রস্তাব রেখে চিঠিও দিয়েছিলেন।
অনলাইনে মনোনয়ন, ‘না’ ভোট চালু হলে কীভাবে তা প্রয়োগ হবে, আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনী যুক্ত করা, দলের জন্য সংরক্ষিত প্রতীক বরাদ্দ ও যৌথভাবে মনোনীত প্রার্থীর প্রতীক বরাদ্দের বিষয়ে স্পষ্টীকরণ; প্রতীক বরাদ্দের পর এক মঞ্চে প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা, নির্বাচনী সংলাপ ও ইসির তত্ত্বাবধানের প্রচারের বিষয়; আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট, প্রিজাইডিং অফিসারের ক্ষমতা আরও বাড়ানো, গণমাধ্যমকর্মীদের কেন্দ্রে প্রবেশে নির্বিঘ্ন করা সংক্রান্ত ছোটোখাটো সংস্কার সুপারিশও রয়েছে।
বিলবোর্ড ব্যবহার, নির্বাচনী ব্যয়, পোস্টারের উপর নিষেধাজ্ঞাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি তদারকির বাড়ানো, গঠনতন্ত্র সংশোধনের সময় ৩০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিন করা; নিবন্ধন আবেদনের দরখাস্ত নাকচ করা হলে ৭ দিনের মধ্যে নয়, বরং ১৫ দিনের মধ্যে দলকে জানানোর কথা রয়েছে প্রস্তাবে।
আগামীতে ইভিএম ব্যবহার হবে না। সেজন্য বিদ্যমান আরপিও থেকে এ সংক্রান্ত বিষয় বিলুপ্ত করতে হবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি কোনো দলকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অনুদান দিতে পারবেন, সেজন্য ব্যক্তির ট্যাক্স রিটার্ন দেখাতে হবে। দলের চাঁদা ১০০ টাকা থেকে তার বেশি হতে পারবে।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন স্থগিতের একটি বিধানও যুক্ত করার সুপারিশ রয়েছে।
সরকার কোনো দলের কার্যক্রম স্থগিত করলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন স্থগিত করতে পারবে। এখন কেবল নিবন্ধন বাতিলের কথা লেখা আছে আইনে।
নির্বাচনে অনিয়মের কারণে শুধু ভোটকেন্দ্র নয়, পুরো নির্বাচনি এলাকার ভোটও বন্ধ করার সুযোগ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অর্থদণ্ড ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রার্থীর পাশাপাশি দলের জন্যও এ বিধান প্রযোজ্য হবে।
হলফনামায় গুরুতর অসত্য তথ্য দিলে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও তদন্তে তা ধরা পড়লে নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসাবে যে আর্থিক সুযোগ সুবিধা নিয়েছিলেন, তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ইউএনও, এডিসি ও ডিসি থাকাকালে ভোটের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারের সদিচ্ছাটা হল এক নম্বর। মানে এই বার্তাটা সরকারকে দিতে হবে যে সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া তাদের মাথায় আর কিছু নেই, এটা করার জন্য যা দরকার সবই সরকার করবে।
“দুই নম্বর হল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা। এ নিয়েও জনগণের কাছে একটা বার্তা দেওয়া। তিন নম্বর হল ডিসি ইউএনও, আইন শৃঙ্খলাবাহিনী–তাদেরও একটা কমিটমেন্ট থাকতে হবে যে ‘আমরা ফেয়ার ইলেকশন করব। আমরা অন্য কিছুতে আর থাকব না।’ এরপরে সেনাবাহিনী। নির্বাচনে সেনাবাহিনীরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে।”
তিনি বলেন, “এই চারটা গ্রুপ যদি একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে, একটা ফেয়ার ইলেকশন করতে চায়, কারা ক্ষমতায় আসছে তা বিবেচনা না করে, তাহলে ইলেকশনটা ফেয়ার হবে। আর তার সাথে রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা যুক্ত করতে হবে যে তারাও গোলমাল করবে না।”
আব্দুল আউয়াল প্রশ্ন রাখেন- “ইলেকশন কমিশনের কি সেনাবাহিনী আছে? ইলেকশন কমিশনের কি পুলিশ বাহিনী আছে? ইলেকশন কমিশনের কি বন্দুক আছে? এটা হল মেইনলি একটা মনস্তাত্বিক বিষয়–সদিচ্ছা। সবার সদিচ্ছা।”
তার ভাষায়, শুধু আইনি সংস্কার বা কাঠামোর মধ্যে থাকলে হবে না; তা বাস্তবায়নেও তৎপর হতে হবে।
“৯১, ৯৬, ২০০১ সালে ইউএনও, এডিসি, ডিসি হিসেবে নির্বাচন পরিচালনার সাথে জড়িত ছিলাম। তখন কেয়ারটেকার গভার্মেন্ট এলেই নাগরিকদের মনে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হত যে ইলেকশন ফেয়ার হবে। এখন এই সরকার এরকম একটা আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারছে কিনা… ।”
জন আস্থা তৈরিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনকালীন প্রশাসন, পুলিশসহ দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন সাবেক এ সচিব।
তিনি বলেন, আগামী কয়েক মাসে একটি ‘ভালো বার্তা’ দিতে পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন কঠিন হবে না।
অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “পুলিশ, আর্মি, ডিসি-ইউএনও, ইলেকশন কমিশন, সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। বন্দুক দিয়ে ইলেকশন হবে না। সরকারের যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বললাম এইগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা, মানুষ যদি মনে করে এরা ঠিক পথে আছে তাহলে কোনো সমস্যা হবে না।”
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আরপিও নিয়ে কমিশনে পর্যালোচনা চলছে। সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যায়, সবকিছু আমরা রাখতে রাজি আছি। ঐকমত্য কমিশনের যেরকম হলে ভালো হয়, তাদের মতামত প্রাধান্য দিচ্ছি আমরা।”
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে আরপিও সংশোধনের ১১৭টির মত সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু অনেকগুলো ইসির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে গেলে এসব সংশোধনী আনা দরকার।”
পুরনো খবর
আরপিও: সংস্কার সুপারিশ নিয়ে কিসে ঐকমত্য, নজর ইসির
ফেরারি আসামিকে প্রার্থী হতে বাধা নয়, ঐকমত্য কমিশনকে ইসি
সংস্কার কমিশনের সুপারিশে আপত্তি জানিয়ে ঐকমত্য কমিশনে ইসির চিঠি
পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা চায় ইসি
ভোটের প্রস্ততি: আইনশৃঙ্খলা, মাঠ প্রশাসন সমন্বয়ে ইসির ৫ কমিটি