Published : 22 Aug 2023, 12:57 AM
স্থানীয় পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন চূড়ান্তের প্রক্রিয়ার মধ্যে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশি পর্যবেক্ষক নীতিমালার বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বসতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন; যেখানে কারিগরিসহ বিভিন্ন বিষয়ের নিয়ম-নীতি ঠিক করা হবে।
ভোট পর্যবেক্ষণে আসা বিদেশিদের আবেদন সীমা, প্রয়োজনীয় কারিগরি সুযোগ-সুবিধা এবং প্রাক নির্বাচনী একটি প্রতিনিধি দলের সুপারিশ পর্যালোচনার মাধ্যমে নীতিমালা হালনাগাদের বিষয়টি এ সভার আলোচ্য সূচিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসির এক কর্মকর্তা।
ইতোমধ্যে ২১০ প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই বাছাই শেষে স্থানীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধনের জন্য ৬৮টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
অগাস্টের মধ্যে এগুলোর বিষয়ে দাবি-আপত্তি আবেদনের পর তা নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে কমিশন।
চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বা আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হবে; নভেম্বরে তফসিল ঘোষণার আভাসও রয়েছে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনী প্রাক অনুসন্ধানী প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে তারা কিছু সুপারিশও করে। অক্টোবরে আসবে মার্কিন প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে দল।

আগামী নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ইইউর ‘যত খুশি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক’ পাঠানোর সুপারিশকে স্বাগত জানিয়ে নির্বাচন কমিশন বলছে, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদনগুলো এলে সুবিধা হয়। কারণ বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে।
গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র সেহেলী সাবরীন বলেন, “আসন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিদেশি পর্যবেক্ষককে অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারিকৃত নির্বাচন পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ করা হবে।”
হালনাগাদ হবে বিদেশি পর্যবেক্ষক নীতিমালা
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ জানান, ভোটকে সামনে রেখে বিদ্যমান বিদেশি পর্যবেক্ষক নীতিমালা হালনাগাদ করতে আগামী বুধবার (২৩ অগাস্ট) নির্বাচন ভবনে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডাকা হয়েছে। এতে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, আইন, এনবিআর, তথ্য ও সম্প্রচারসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা থাকবেন।

তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে ইইউ প্রতিনিধিরা কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে পর্যবেক্ষকদের কিছু যন্ত্রপাতি আনা এবং ট্যাক্স সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশ করেছে। সেক্ষেত্রে তাদের সুবিধার্থে নীতিমালায় কী যুক্ত করা যায়, এনবিআর কী মতামত দেয় তা বিবেচনা করা হবে।
“এছাড়া আবেদনের প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শুরু করা যায়, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হবে।”
ইসির কারিগরি কমিটির সঙ্গে বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধি দল নির্বাচনী আইনবিধিসহ নানা খুঁটিনাটি বিষয়ও জানতে চেয়েছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ১০ অগাস্ট সিইসির সঙ্গে দেখা করেন পররাষ্ট্র সচিব।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, জুলাইয়ে সফর করে যাওয়া প্রতিনিধি দলটি বেশ কিছু বিষয় জানতে চান এবং তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসলে ‘ভেহিক্যাল ট্র্যাকার’, ক্যামেরাসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম নিয়ে আসার কথা বলেছেন।
বৈঠকে বিদেশি পর্যবেক্ষদের ভিসা প্রসেসিং, এয়ারপোর্ট হেল্পডেস্ক, মিডিয়া সেল, নিরাপত্তাসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরামর্শও নেবে ইসি।
সব বিয়ে আলাপ-আলোচনা করে বিদেশি পর্যবেক্ষক নীতিমালা হালনাগাদ করার বিষয়ে পরবর্তীতে কমিশনের উপস্থাপন করা হবে বলে জানান অতিরিক্ত সচিব।
কোন নির্বাচনে কত বিদেশি পর্যবেক্ষক
>> ২০১৮ ও ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ ও দশম সংসদ নির্বাচনে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। পরে এ দুটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছিল তারা।
>> একাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে ৮১টি দেশি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানের ২৫ হাজার ৯০০ জন প্রতিনিধি। এছাড়া ৩৮ জন (ফেমবোসা, এএইএ, ওআইসি ও কমনওয়েল্থ থেকে আমন্ত্রিত) বিদেশি পর্যবেক্ষক, বিভিন্ন বিদেশি মিশনের ৬৪ জন কর্মকর্তা এবং দূতাবাস ও বিদেশি সংস্থায় কর্মরত ৬১ জন ভোট পর্যবেক্ষণ করে।
>> দশম সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ না নেওয়ায় পর্যবেক্ষকও কম ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ওই নির্বাচনে মাত্র চার জন বিদেশি এবং স্থানীয় ৩৫টি সংস্থার ৮ হাজার ৮৭৪ জন ভোট পর্যবেক্ষণ করেন।
>> ২০০৮ সালে ৫৯৩ জন বিদেশি এবং ১ লাখ ৫৯ হাজার ১১৩ জন দেশি ভোট পর্যবেক্ষণ করেন।
>> ২০০১ সালে ২২৫ জন বিদেশি এবং ২ লাখ ১৮ হাজার জন দেশি ভোট পর্যবেক্ষণ করেন।
>> ১৯৯৬ সালে প্রায় ৪০ হাজার দেশি এবং ২৬৫ জন বিদেশি ভোট পর্যবেক্ষণ করেন।
>> ১৯৯১ সালে ৩০ হাজার দেশি এবং ৫৯ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ভোট পর্যবেক্ষণ করেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে এক প্রশ্নে গত ৮ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকান বলেন- যেই আসেন, আমরা প্রত্যেককে স্বাগত জানাব। আমাদের আসলে লুকানোর কিছু নেই। তারা এসে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারে।“
তাদের ভালো পরামর্শকে স্বাগত জানানোর কথাও বলেন তিনি।
পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে ‘পেশাদারিত্ব’
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন প্রাথমিকভাবে ৬৮টি প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছে।
এগুলো নিয়ে দাবি-আপত্তি এবং যাচাই-বাছাই শেষে অগাস্টের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার কিছু পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিল ইসি
সাংবাদিক নীতিমালা ‘প্রয়োজনে’ সংশোধনের আশ্বাস সিইসির
৩৫ বছর নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ (জানিপপ) এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের ভোট পর্যবেক্ষণে আসছে বিদেশিরা, তাদের পর্যবেক্ষণ সবসময় বড় ভূমিকা রেখে এসেছে।
"১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা সায় দেয়নি। ২০০১ সালে কুমিল্লার মুরাদনগরে পেশি শক্তির প্রভাব নিয়ে পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন আবার করতে হয়েছে।"
যারা শুধু পর্যবেক্ষণ করে- তাদেরই পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধন পাওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, "কিন্তু এখানে পর্যবেক্ষণ একটা মৌসুমী ব্যবসা। নানা ধরনের সংস্থা হঠাৎ করে পর্যবেক্ষক হিসেবে আসে। আবার অনেকে সংস্থা লোগো ব্যবহার করে বিদেশি কয়েকজন পর্যবেক্ষককে নিয়ে আসে, যারা এ কাজে সম্পৃক্তও নয়। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।”
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক আব্দুল আলীম বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ একটি টেকনিক্যাল কাজ। আইন-বিধি জানার পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও দরকার।
“প্রশিক্ষিত লোকবল দিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণটা করা উচিত। বাংলাদেশে ভোট পর্যবেক্ষণ এখনও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারেনি। যত ব্যাপক ও বেশি পর্যবেক্ষক থাকবে, ততই আস্থা বাড়বে। পর্যবেক্ষক কম থাকা মানেই এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও কথা উঠতে পারে।"
তার মতে, "ভোটের আগে-পরে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইসিকে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক সংস্থাই আছে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেয় না, দিলেও অনেক পরে।”
দেশিদের বিদেশি পর্যবেক্ষক কার্ড দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন
এই পর্যবেক্ষক কারা, প্রশ্ন ফখরুলের
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কেবল ভোটের দিনের বিষয় নয়: ইইউ প্রতিনিধি
ভোট পর্যবেক্ষণ: ৯ সংগঠনে আপত্তি আ. লীগের
২৪টি পর্যবেক্ষক সংস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি'র আপত্তি
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ও সুপারিশের উপর নির্ভর করে মন্তব্য করে এই নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, তৎকালীন কমিশন ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ধরে কিছু প্রক্রিয়া নেওয়ার উদ্যোগ শুরু করলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি।
“পর্যবেক্ষণ থেকে যেমন কিছু আগামীর জন্য শিক্ষণীয় থাকে, তেমনি পর্যবেক্ষকদের জন্যও উপযুক্ত পরিবেশ থাকতে হবে। অংশগ্রহণমূলক ও ভালো নির্বাচনী পরিবেশ না থাকলে এবং সহিংসতা ও গোলযোগের পরিবেশ থাকলে পর্যবেক্ষণটাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।”
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, “স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের নিবন্ধন চূড়ান্ত হওয়া প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কারও দাবি আপত্তি থাকলে তা নিষ্পত্তি করা হবে। স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা দরকার হলে হালনাগাদ করা হবে; তা নিয়ে কমিশনে আলোচনা হলেই যথাসময়ে এ সংক্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জানানো হবে।”
অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পরামর্শ টিআইবির
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, সংবাদমাধ্যমকর্মী ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চর্চার আলোকে পর্যবেক্ষক নীতিমালা সংশোধনের আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
রোববার টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভিসা জটিলতার কারণে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বল্প সংখ্যক উপস্থিতি ও বিতর্কিত ভূমিকা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কলুষিত করেছিল।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদ্যমান নীতিমালাটি অবশ্যই সংশোধন করতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কারণ একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অবাধ উপস্থিতি ও স্বাধীনভাবে বিচরণ করার সুযোগ অপরিহার্য।
“এক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতামত-নির্ভর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিধি-নিষেধমূলক নীতিমালা প্রণীত হলে- একদিকে যেমন ইসির চলমান আস্থার সংকট আরও গভীরতর হবে, অন্যদিকে তা বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আবারও নিরুৎসাহিত করবে।”
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: স্থানীয় পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান নামল অর্ধেকে
এবার ভোট দেখতে চায় ২১০টি প্রতিষ্ঠান