Published : 12 Jul 2026, 08:17 AM
বছর দুয়েক আগের ঘটনা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে নেমেই অহেতুক, বেপরোয়া ট্যাকল করে বসেন মানু কোনে। দেখেন হলুদ কার্ড। এরপর, তার হুশ ফেরে তাৎক্ষণিক। তিনি নিজেকেই বলেন, “মানু, তুমি গেছো, বিরতির সময়ই তোমাকে তুলে নেওয়া হচ্ছে…।” ওই ঘটনার পর মানু শান্ত, পরিণত হয়েছেন আরও। নিজেকে গুছিয়েও নিয়েছেন। ছয় ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার এই মিডফিল্ডারের চওড়া কাঁধে এখন নির্ভার থেকে, আস্থা রাখতে পারছেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ে দেশোঁও।
পুরোনো একটি প্রবাদ আছে, ‘যত বেশি খাওয়া হয়, ক্ষুধাও তত বাড়ে’- ফুটবল পায়ে মানুর ক্ষেত্রেও যেন হয়েছে তেমন কিছুই, ক্রমেই বাড়ছে তার সাফল্যের ক্ষুধা। স্পেনের বিপক্ষে ফ্রান্স যখন সেমি-ফাইনালের মহারণের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ২৫ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার তখন, নিজেকে আরও বেশি করে মেলে ধরার তীব্র ক্ষুধা অনুভব করছেন।
বদলি নেমে এবারের বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে, এ পর্যন্ত মানু ফ্রান্সের ছয় ম্যাচের চারটিতে খেলেছেন। শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার-ফাইনালে খেলেন শুরুর একাদশে। অহেলিয়া চুয়ামেনির চোটের কারণে যে সুযোগ কড়া নেড়েছিল দুয়ারে, তিনি তা লুফে নিয়েছেন দারুণভাবে। হয়ে উঠেছেন মাঝমাঠে ফ্রান্সের নির্ভর করার মতো একজন।
কিছুটা ঝলক তিনি দেখান গ্রুপ পর্বে, ইরাক ও নরওয়ের বিপক্ষে ফ্রান্সের দাপুটে জয়ের ম্যাচে। এরপর শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলে জেতা ম্যাচে খেলে দেশোঁর আস্থাভাজন হন আরও। কোয়ার্টার-ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে মাঝমাঠের দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে হয়ে উঠলেন বিশ্বস্ত।
মানু এখন ট্যাকলে শক্তিশালী ও নিঁখুত, মাঠজুড়ে ছুটতে পারেন ক্লান্তিহীন, বলের নিয়ন্ত্রণে আত্মবিশ্বাসী এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিণত। সুযোগগুলো তিনি এমনভাবে কাজে লাগিয়ে চলেছেন, যেন বিশ্বকাপের মঞ্চ তার চেনা আঙিনা!
অনুমিতভাবে ফ্রান্সের আক্রমণভাগের চার তারকা সবার মনোযোগের কেন্দ্রে থাকেন সারাক্ষণ। সেখানে পাদপ্রদীপের আলো থেকে কিছুটা দুরেই বাস আদ্রিয়া হাবিও বা মানুদের। তবে, ফ্রান্সের দুর্বার পথচলায়, হাবিও, মানু বা চুয়ামেনি- কারো প্রভাবই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কেননা, মাঝমাঠে এদের তৈরি করা শক্ত ভিতের সুবাদে এমবাপে-দেম্বেলেরা তুমুল আক্রমণ শাণানোর স্বাধীনতা পাচ্ছেন। দেশোঁর কণ্ঠেও সেই প্রতিধ্বনি।
“দলে তারা ভারসাম্য নিয়ে এসেছে। বল পুনরুদ্ধারে তারা গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ করে, আমরা যখন উপরে উঠে প্রতিপক্ষকে চাপ দেই এবং আমাদের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের যখন যথাযথ বলের জোগান দেই, সেই সময়েও।”
কোচের কাছে মানু অবশ্য রাতারাতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেননি। কঠিন এক শিক্ষানবিশ পর্ব পার করতে হয়েছে তাকে। থিয়েরি অরিঁর কোচিংয়ে, মাইকেল ওলিসের মতো ২০২৪ সালের অলিম্পিকসে খেলছেন তিনি। প্যারিসের ওই আসরের পর, তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। নজরে পড়েন দেঁশোর।
উয়েফা নেশন্স লিগে দলের দরজা খুলে যায় তার সামনে। কিন্তু ভারসাম্য আনার বদলে, দলকে বিপদেই ফেলার জোগাড় করতেন মানু! তুলুজের এই সাবেক মিডফিল্ডার ফিফার সাথে আলাপে নিজেই জানিয়েছেন সে কথা।
“২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে, ইতালির বিপক্ষে ৩-১ গোলের সেই হারের ম্যাচে খেলতে নামার পর, যখন হলুদ কার্ড পেলাম, দিদিয়ে দেশোঁ বলেছিলেন, আমাকে সাবধানে লড়াই (বল দখলের লড়াই) বেছে নিতে হবে। এরপর বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে, খেলা শুরুর দুই মিনিটের মাথায় যখন, বেপরোয়া এক ট্যাকল করি, যেটা প্রায় লাল কার্ড পাওয়ার মতো ছিল (হলুদ কার্ড পেয়েছিলেন)…আমি নিজেকে বললাম: ‘মানু, তুমি গেছো। বিরতির সময়ই তোমাকে তুলে নেওয়া হচ্ছে…।”
একটু সময় নিলেও, দেশোঁর কথা শুনেছেন মানু। এ কারণে, সিনিয়র দলে সুযোগ পাওয়ার দুই বছরের মাথায়, তিনি এখন বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের রাখার দায়িত্ব পাওয়ার পথে।
ডালাসে ১৫ জুলাই ১টায় (এএম) শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটি আবার মানুর জন্য ভিন্ন এক উপলক্ষও। প্যারিস অলিম্পিকসের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের বিপক্ষে ৫-৩ গোলে হেরেছিলেন তারা। সেই প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগও। অবশ্য, কোনো হুংকার নয়, মানু অপেক্ষায় যুদ্ধে নেমে সেরাটা মেলে ধরতে।
“সবাই খেলতে চায়, কিন্তু দলে সবাই জায়গা পায় না। কোচই সিদ্ধান্ত নিবেন, কে খেলবে। সর্বোচ্চটুকু দিতে সবসময় প্রস্তুত থাকব আমি।”
সাম্প্রতিক সময়ে, রোমার এই মিডফিল্ডার, মাঝমাঠে যে রোমাঞ্চকর সময় কাটাচ্ছেন, তাতে, তার প্রস্তুতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই এবং ফ্রান্সেরও আশ্বস্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কেননা, শান্ত, বিশ্বস্ত মানুর মাঝমাঠের উপস্থিতি, এমবাপে-দেম্বেলেদের আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার, ফ্রান্সকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহসটুকু যে দিচ্ছে।