Published : 14 Jul 2026, 03:38 PM
ইতিহাসের সর্ববৃহৎ আইপিও দিয়ে শেয়ার বাজারে বিশ্বরেকর্ড গড়ার পর প্রথম মাসেই বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির জোয়ারে চড়ে শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হলেও এক মাসের ব্যবধানে তা সর্বোচ্চ চূড়া থেকে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিচে নেমেছে। ফলে প্রথম দিকে চড়া মূল্যে শেয়ার কেনা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন বড়সড় লোকসানের মুখে পড়েছেন, যা কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
পুঁজিবাজারে যাত্রা শুরুর প্রথম মাসেই চরম নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ ও প্রযুক্তি কোম্পানি স্পেসএক্স।
১২ জুন স্পেসএক্সের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হলে প্রতিটি শেয়ারের দাম ধরা হয়েছিল ১৩৫ ডলার। প্রথম দিনে বিনিয়োগকারীদের কাড়াকাড়িতে শেয়ারের দাম এক লাফে ১৫০ ডলারে উঠে যায়, যা একপর্যায়ে ১৭৬ ডলারে পৌঁছানোর পর ১৬০.৯৫ ডলারে গিয়ে প্রথম দিনের লেনদেন শেষ করে, যা স্পেসএক্সকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পরের সপ্তাহে উন্মাদনা আরও বাড়ে ও শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ২২৫ ডলারে গিয়ে ঠেকলে মোট বাজার মূল্যের দিক থেকে অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটকেও ছাড়িয়ে যায় স্পেসএক্স।
বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিএফআরএ’-এর বিশ্লেষক কিথ স্নাইডার বলেছেন, “মাস্কের নাম জড়ানো যে কোনো কোম্পানি নিয়েই মানুষের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা থাকে। তবে এবার মানুষ প্রথমবারের মতো এমন এক মহাকাশ কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছিল, যেটিকে ‘এআই প্লে’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছিল।”
বিনিয়োগকারী কোম্পানি ‘নিওস্টেলার’-এর উইলি লি-ও একমত হয়ে বলেছেন, সবাই স্পেসএক্স’কে একটি ‘এআই স্টোরি’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখেই অর্থ খাটিয়েছে। মাস্কের এআই স্টার্টআপ এক্সএআইকে স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত করে ‘স্পেসএক্সএআই’ নামকরণ এবং অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিকে ডেটা সেন্টার লিজ দেওয়ার কারণেই এ ধারণা তৈরি হয়েছিল।
এআইয়ের হাইপ বা উত্তেজনার আড়ালে থাকা মূল ব্যবসায়িক বাস্তবতা যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে তখনই শেয়ারের দামে ধস নামে। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে শুরু করেছেন, স্পেসএক্সের মূল আয় আসলে রকেট তৈরি, উৎক্ষেপণ ও স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা থেকে আসে।
টেনেসি রাজ্যের মেমফিসে বড় ডেটা সেন্টার প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় স্টারলিংক ওই এলাকায় তাদের সেবার দাম কমাতে বাধ্য হয়েছে। সে সময় এক দিনেই স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ পড়ে যায়।
এ মাসে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বাজারে সার্বিক মন্দার মধ্যেই স্পেসএক্স বড় ধাক্কা খেয়েছে। গত ৭ জুলাই কোম্পানিটিকে ‘নাসডাক ১০০’ সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সেদিনই স্পেসএক্সের রেকর্ড ৪.৪ শতাংশ দরপতনে নাসডাক সূচক নেমে যায় ১.৭ শতাংশ।
এর আগে ‘এফটিএসই রাসেল’ সূচকে যোগ হওয়ার সময় কোম্পানিটির শেয়ারের দাম কিছুটা বাড়লেও তা স্থায়ী হয়নি। এ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্পেসএক্স কোনো মন্তব্য করেনি।
শেয়ার বাজারে লেনদেনের প্রথম মাস শেষে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে স্পেসএক্সের প্রতিটি শেয়ার কেবল ১৪৫ ডলারের কাছাকাছি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে, যা প্রথম দিনের সর্বোচ্চ দামের চেয়ে ১৮ শতাংশ এবং এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ চূড়া ২২৫ ডলার থেকে প্রায় ৩৫ শতাংশ কম।
‘পানির নিচে বিনিয়োগ!’
উন্মাদনার চোটে প্রথম পাঁচ দিনে যারা চড়া দামে স্পেসএক্সের শেয়ার কিনেছিলেন বর্তমান দরপতনের কারণে তারা বড়সড় লোকসানের মুখে পড়েছেন। বিশ্লেষক কিথ স্নাইডার বলেছেন, “যারা প্রথম দিকে শেয়ার কিনেছেন তারা এখন নিশ্চিতভাবেই পানির নিচে (লোকসানে) আছেন।”
শেয়ারের আচরণ এখন অনেকটাই ‘মিম স্টক’-এর মতো হয়ে গেছে, যেখানে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই কেবল ইন্টারনেটের হইচইয়ের ওপর ভিত্তি করে খুচরা বিনিয়োগকারীরা দাম বাড়িয়ে দেয়।
কোম্পানির বর্তমান ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে স্নাইডার বলেছেন, শেয়ারের দাম আরও কমে ১১৫ ডলারে নামতে পারে, যা কোম্পানির সার্বিক বাজারমূল্যকে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনবে।
‘মার্জারমার্কেট’-এর ইকুইটি ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যানালিস্ট স্যামুয়েল কার বলেছেন, এ দরপতন সব বিনিয়োগকারীকে সমানভাবে আঘাত করেনি।
“যারা আইপিও মূল্যে ১৩৫ ডলারে শেয়ার পেয়েছেন বা কোম্পানির ভেতরের মানুষ তারা এখনো ভালো অবস্থানে আছেন। তবে, যারা প্রথম কয়েক দিনে বাজার থেকে চড়া মূল্যে কিনেছেন তারা এই মুহূর্তে মোটেও খুশি নন।”
শেয়ার বাজারের এ ওঠানামার পরও মাস্ক স্পেসএক্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। এই পাবলিক লিস্টিংয়ের মাধ্যমে মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে স্পেসএক্সের বার্ষিক রাজস্ব ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
পাশাপাশি মাস্ক দেখিয়েছেন কীভাবে শেয়ার বাজারের এ অস্থিরতাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। গত ১৬ জুন স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হলে এআই কোডিং বট নির্মাতা কোম্পানি ‘কারসর’কে ৬ হাজার কোটি ডলারের এক শেয়ারের বিনিময় চুক্তিতে অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল।
ওই মুহূর্তে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম এতটাই বেশি ছিল যে, মাস্ক কার্যত ‘বিনামূল্যে’ কারসরকে কিনে নিয়েছেন বলা চলে। মাস্কের এই চালকে প্রশংসনীয় বাজার বুদ্ধিমত্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্যামুয়েল কার।
সবার নজর আয়ের দিকে
স্পেসএক্সের আইপিও’র প্রধান ব্যাংকার ‘মর্গ্যান স্ট্যানলি’ অবশ্য মনে করছে এই মন্দা সাময়িক। গেল সপ্তাহে তাদের আর্থিক বিশ্লেষকরা স্পেসএক্সের শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা ৩০০ ডলার নির্ধারণ করেছেন, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ দামের চেয়েও ৩৩ শতাংশ বেশি।
স্পেসএক্সর আইপিও’র নথি অনুসারে, স্পেসএক্স বর্তমানে লোকসানে চলছে এবং গত বছর এর রাজস্ব ছিল ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। এর চেয়ে প্রায় ৫৫ গুণ মাস্কের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা।
বর্তমানে সবার চোখ স্পেসএক্সের প্রথম পাবলিক আর্নিংস রিপোর্ট বা আয়-ব্যয়ের হিসাবের দিকে। অগাস্টের শুরুতে এ রিপোর্ট প্রকাশ হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
ঠিক একই সময়ে কোম্পানির কর্মীদের ‘লক-আপ’ পিরিয়ডও শেষ হতে যাচ্ছে, যার ফলে কর্মীরা বোনাস হিসেবে পাওয়া নিজেদের বিভিন্ন শেয়ার খোলা বাজারে বিক্রি করতে পারবেন।
বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিশদ বিবরণী সামনে এলে স্পেসএক্সের শেয়ারের দামে আবারও বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যেতে পারে।
কার-এর ভাষায়, “স্পেসএক্স যদি তাদের সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে তবে বিনিয়োগকারীরা ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির অংশীদার হতে যাচ্ছেন। তবে সেই চূড়ায় পৌঁছাতে এখনও অনেক পথ বাকি।”