Published : 29 May 2026, 11:01 AM
কল্পনা করা যাক, গ্রীষ্মের কোনো এক বিকেলে আপনি সৈকতে বসে সূর্যাস্ত দেখছেন। সূর্যটা যখন ধীরে ধীরে সাগরের বুকে তলিয়ে যাচ্ছে, আপনার চোখের সামনে আকাশের ক্যানভাসে তখন মেলা বসেছে আবির রাঙা লাল, গাঢ় কমলা ও হালকা বেগুনি রঙের।
শৈশবের ছুটির দিনগুলোর মধুর স্মৃতিগুলো যখন মনের মণিকোঠায় ভিড় করে আসছে তখন এক অদ্ভুত ও ওম জড়ানো ভালোলাগায় ভরে উঠছে আপনার মন। সূর্যাস্ত দেখার সেই বিশেষ মুহূর্তে বেঁচে থাকার এই যে সত্যিকারের অনুভূতি, এটাই হচ্ছে ‘কনশাসনেস’ বা চেতনার মূল নির্যাস বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স।
সহজভাবে বললে, চেতনা জেগে থাকা, আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং যে কোনো অভিজ্ঞতাকে অনুভূতির মাধ্যমে গ্রহণ করার এক অদ্ভুত সক্ষমতা।
চেতনাকে ব্যাখ্যা করার প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করলে চেতনা হল সেই কম্পিউটারে চলতে থাকা সফটওয়্যার। মস্তিষ্কের বিভিন্ন নিউরন উদ্দীপিত হচ্ছে, সিন্যাপসের মধ্য দিয়ে সংকেতগুলো ছুটে চলেছে, আর ঠিক তখনই মানুষ এ পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ অনুভব করতে পারছেন।
তবে কেমন হত যদি চেতনা মানুষের মস্তিষ্কের তৈরি কোনো উপাদান না হয়ে, বরং মহাকর্ষ বা ভরের মতো এ মহাবিশ্বেরই অন্যতম এক মৌলিক ভিত্তি হত?
এটাই ছিল সিয়াটলভিত্তিক বহুমুখী গবেষণা কোম্পানি ‘অ্যালেন ইনস্টিটিউট’-এর গবেষক ও স্নায়ুবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফ কোচ-এর সাম্প্রতিক এক উপস্থাপনার মূল বিষয়বস্তু, যা তত্ত্বটি শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বের অন্যতম বড় কিছু রহস্যের সমাধান করে দিতে পারে।
কোচ বলেছেন, “মূল প্রশ্নটি হচ্ছে, এ পুরো বস্তুগত জগত কোনো মানসিক বা আধ্যাত্মিক সত্তারই বহিঃপ্রকাশ কি না এবং যদি তা-ই হয়, তবে তা ঠিক কতখানি।”
তিনি বলেছেন, বাইরের জগতে মানুষ যা কিছু অনুভব করে সেটা দিগন্তে সূর্য ডোবা দেখা হোক বা কোনো কিছু স্পর্শ করা হোক এসবই তার চেতনার অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই ঘটে। যার মানে, কেবল ‘চেতনার অভিজ্ঞতাই’ সত্যিকারের অস্তিত্বশীল। বস্তুগত পৃথিবীর মতো বাকি সবকিছুই আসলে গৌণ বা দ্বিতীয় সারির।
চেতনা নিয়ে আগের বিভিন্ন তত্ত্ব, যেমন ‘ভৌতবাদ’, যা মানুষ কেন তার সন্তানকে ভালোবাসে, বাঁশির সুর কেন মানুষের কাছে এত করুণ লাগে বা কেন আমরা রোদ পছন্দ করি এসব বিষয় ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ভৌতবাদের মূল কথা, মানুষের প্রতিটি চিন্তা, আবেগ ও অভিজ্ঞতা তার দেহের ভেতরের ভৌত ও স্নায়ুজৈবিক প্রক্রিয়ার ফল। তবে তা অনুভূতির নিজস্ব বা ব্যক্তিগত দিকটিকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
যেমন, ভৌতবাদ ব্যাখ্যা করতে পারে, মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে একটি সূর্যাস্তকে রেকর্ড বা রেজিস্টার করছে। তবে আকাশের সেই সুন্দর রঙের মেলা দেখে মানুষের মনে আসলে কেমন অনুভূতি হচ্ছে তা ভৌতবাদ বুঝিয়ে বলতে পারে না।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড কনশাসনেস স্টাডিজ’-এর গবেষণা পরিচালক নিকো রেজেন্তে বলেছেন, ‘চেতনা’ কোনো কিছু অনুভব করার ক্ষমতা।
কোচের মতো রেজেন্তেও বলেছেন, চেতনা কেবল মস্তিষ্কের মাধ্যমে তৈরি কোনো জিনিস নয়, বরং তা এই বাস্তবতারই মৌলিক এক উপাদান।
রেজেন্তে মানুষের সচল মনকে উড়ন্ত এক ঘুড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে ঘুড়িটি মানুষের ‘মস্তিষ্ক’ আর বাতাস হচ্ছে ‘চেতনা’, যা এ বাস্তবতারই মৌলিক অংশ।
তিনি বলেছেন, “ঘুড়িটিকে ওড়ানোর জন্য সঠিক উপাদান দিয়ে, সঠিক কাঠামোতে ও সঠিক সুতা দিয়ে তৈরি করতে হবে ঠিকই তবে এর আকাশে ওড়াটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে বাতাসের ওপর।”
রেজেন্তে আরেকটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বিসয়টিকে রেডিওর সঙ্গেও তুলনা করেছেন।
তার ভাষায়, “একটি রেডিও কিন্তু নিজে কোনো অনুষ্ঠান তৈরি করে না, বরং বাতাসে আগে থেকেই ভেসে বেড়ানো সিগনালকে সে গ্রহণ করে এবং তা আমাদের শোনার উপযোগী করে তোলে।
“তবে রেডিওর সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের তফাত হল, মস্তিষ্ক কেবল হুবহু সেই সিগনালটি বাজিয়েই শোনায় না, বরং সেটির সঙ্গে নিজে সাড়াও দেয়। আর এ পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই আমাদের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত অনুভূতির জন্ম হয়।”
তাহলে, চেতনা যদি সত্যিই মহাবিশ্বের মৌলিক অংশ হয়ে থাকে তবে মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য এর অর্থ কী?
রেজেন্তে বলেছেন, প্রথমত বিষয়টি এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিতে পারে, যা এতদিন অসম্ভব বলে মনে করা হতো। এর ফলে চেতনার সবচেয়ে জটিল ধাঁধা বা ‘হার্ড প্রবলেম অফ কনশাসনেস’, অর্থাৎ কীভাবে একটি জড় বা ভৌত বস্তু থেকে এমন অনুভূতির জন্ম হতে পারে সেটার খুব সহজ সমাধান হয়ে যায়।
রেজেন্তে বলেছেন, “চেতনা যদি মহাবিশ্বের মৌলিক ভিত্তিই হয় তবে এই প্রশ্নটাই আর থাকে না। মন কীভাবে পদার্থ থেকে তৈরি হল তা ব্যাখ্যা করার ঠিক ততটাই প্রয়োজন নেই, যতটা একজন পদার্থবিদের এমনটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না যে স্থান-কাল আরও মৌলিক কোন জিনিস থেকে তৈরি হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চেতনার সেই ‘কঠিন ধাঁধাটি’ আসলে কোনো সমস্যাই নয়।”
ঠিক একই যুক্তি মহাবিশ্ব সংক্রান্ত বড় বড় ধাঁধা বা অন্যান্য সার্বজনীন প্রশ্নের ক্ষেত্রেও খাটে, বিশেষ করে যেগুলোর উত্তর দেওয়া আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হয়। যেমন, বিগ ব্যাংয়ের আগে কী ছিল? বা মহাবিশ্ব আসলে কোন শূন্যস্থানের দিকে প্রসারিত হচ্ছে?
রেজেন্তে বলেছেন, “এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না, কারণ এগুলো আসলে ভুল প্রশ্ন, এমন নয় যে এগুলোর উত্তর কোথাও লুকিয়ে আছে। আমরা পদার্থ কীভাবে মন বা চেতনা তৈরি করে তা না খুঁজে, বরং আমাদের প্রশ্ন করা উচিত মন কীভাবে নিজেকে বিন্যস্ত করে পদার্থের রূপ ধারণ করে। আমাদের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর অনেকগুলোই হয়ত স্রেফ ভুল জায়গা থেকে প্রশ্ন শুরু করার কারণে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি।”
এ একই যুক্তি আরও অনেক মানবিক স্তরের বা বাস্তব জীবনের সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও এরইমধ্যে বিবেচিত হয় চেতনা। তবে তা যদি বাস্তবতারই মৌলিক অংশই হয় তবে কোমায় থাকা বা ক্লিনিকালি মৃত ঘোষণার পর সফলভাবে বাঁচিয়ে তোলা রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের চিকিৎসার ধরন কি বদলে যেতে পারে?
এ প্রসঙ্গে কোচ বলেছেন, হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে যাওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ ‘নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ বা মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যেখানে তারা সাময়িকভাবে ‘মারা’ গিয়েছিলেন।
এ অভিজ্ঞতার পেছনে কোনো অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা থাকুক আর নাই থাকুক যারা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান তারা ফিরে আসার পর স্থায়ীভাবে আরও মানবিক হন।
হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক শারীরিক আঘাত পাওয়ার পরও এ ‘মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতাগুলোর’ সিংহভাগই ইতিবাচক। রোগীরা বেশিরভাগ সময় বলেছেন, তারা ‘পরমাত্মার মুখোমুখি’ হয়েছিলেন। কোচের তত্ত্ব অনুসারে, যা হতে পারে মহাবিশ্বের সেই মৌলিক বা মূল চেতনা।
তবে কোচ বলেছেন, চিকিৎসকদের সাধারণত মেডিকেল কলেজে এই বিষয়ে কিছু ‘শেখানো’ হয় না। ফলে তারা রোগীদের এসব অভিজ্ঞতাকে স্রেফ হ্যালুসিনেশন বা অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেন।
অন্যদিকে রেজেন্তে যুক্তি দিয়েছেন, চেতনাকে মৌলিক উপাদান হিসেবে দেখলেই হাসপাতালের চিকিৎসাপদ্ধতি রাতারাতি বদলে যাবে না। ঘুড়িটি ছিঁড়ে যেতে পারে, রেডিওটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে তবে ওই ব্যক্তির চেতনাকে গ্রহণের জন্য ‘মস্তিষ্ক’ তখনও অবশ্যম্ভাবী মাধ্যম বা রিসিভার হিসেবে থেকেই যায়।
গবেষকেরা কখনো যদি কোচ ও রেজেন্তের এ তত্ত্বটি সত্য বলে প্রমাণ করতে পারেন তবে তা কেবল মানুষের মনের রহস্যই উন্মোচন করবে না, বরং একইসঙ্গে এ পুরো মহাবিশ্বের রহস্যেরও জট খুলতে পারে।
পরবর্তীতে যখন কেউ দিগন্তে সূর্য ডুবে যাওয়ার কোনো সুন্দর দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হবেন তখন মনে রাখা জরুরি, তার ভেতরের সেই চেতনাই হয়ত পর্দার আড়ালে থাকা সেই মূল রূপকার, যা সুতো টেনে এ পুরো দৃশ্যপট নিয়ন্ত্রণ করছে।