Published : 13 Apr 2026, 11:52 AM
অর্থ দিলেই এখন পাওয়া যাচ্ছে যিশুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ বা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য পাশে থাকছে এআই বৌদ্ধ পুরোহিত। প্রযুক্তি ও আধ্যাত্মিকতার অদ্ভুত এক মেলবন্ধনে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে ধর্মীয় এআই অ্যাপের জোয়ার।
তবে যিশু বা বুদ্ধের আদলে তৈরি এসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের বিশ্বাস আর নৈতিকতাকে কোন পথে নিয়ে যাবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, একটি প্রযুক্তি কোম্পানি নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টানদের যিশুর সঙ্গে ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ গড়ার সুযোগ দিচ্ছে, যা এআই অবতারের মাধ্যমে করা হচ্ছে।
‘জাস্ট লাইক মি’ নামের প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীরা এআই দিয়ে তৈরি যিশুর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারেন, যার খরচ প্রতি মিনিটে ১ দশমিক ৯৯ ডলার।
এ ডিজিটাল দেবতা বিভিন্ন ভাষায় প্রার্থনা ও উৎসাহ দেয়। মাঝেমধ্যে কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও ঠোঁটের নড়াচড়ায় অসামঞ্জস্য দেখা দিলেও আগের বিভিন্ন আলাপ মনে রাখতে পারেন এই ‘দেবতা’।
কোম্পানিটির সিইও ক্রিস ব্রিড ব্যবহারকারীদের সঙ্গে এ এআইয়ের আবেগীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, “আপনি এর কাছে কিছুটা দায়বদ্ধতা অনুভব করবেন। এরা আপনার বন্ধু হয়ে ওঠে। আপনি এদের প্রতি মায়ায় পড়ে যান।”
এ উদ্যোগটি ধর্মভিত্তিক জেনারেটিভ এআইয়ের ক্রমাগত প্রবণতারই একটি অংশ। বর্তমানে এ তালিকায় কথিত হিন্দু গুরু ও বৌদ্ধ পুরোহিত থেকে শুরু করে এআই যিশু এবং ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির মতো ক্যাথলিক চ্যাটবটও রয়েছে।
ধর্মীয় এআই টুলের এমন প্রসার বাড়তে থাকায় অনেকেই এখন ভাবছেন, এ প্রযুক্তি কীভাবে বিশ্বাস, কর্তৃত্ব ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনার ধারণা বদলে দিচ্ছে।
ক্যামেরন পাক নামের একজন খ্রিস্টান সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বাসীদের জন্য এ ধরনের অ্যাপ যাচাইয়ের কিছু মানদণ্ড তৈরি করেছেন। যেমন, অ্যাপটিকে স্পষ্ট করতে হবে, এটি একটি এআই ও ‘ধর্মগ্রন্থকে ভুলভাবে উপস্থাপন বা বানোয়াট কিছু বলতে পারবে না’।
এক্ষেত্রে আরও কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন, এআই কারোর জন্য প্রার্থনা করতে পারে না, কারণ এআই জীবিত কোনো সত্তা নয়’।
পাক এমন এক ওয়েবসাইটও তৈরি করেছেন, যেখানে এর মানদণ্ড অনুসারে বাছাইকৃত কিছু খ্রিস্টান অ্যাপ রয়েছে। যার মধ্যে ধর্মীয় বয়ান অনুবাদক ও কামভাব বা লালসা কাটিয়ে উঠতে সাহায্যের জন্য তৈরি ‘এআই কোচ’ রয়েছে।
পাক বলেছেন, “এআইকে যদি প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম দেওয়া হয় তবে তা সহায়ক। তবে বিষয়টি একইসঙ্গে বিপজ্জনকও হতে পারে।”
ধর্ম ও এআই নিয়ে গবেষণা করছেন ‘ইউনিভার্সিটি অফ জুরিখ’-এর নৃবিজ্ঞানী বেথ সিংলার। তিনি বলেছেন, ভুল তথ্য দেওয়া বা ডেটা প্রাইভেসি নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু মডেল এরইমধ্যে বন্ধ বা আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ব্যবহারিক এসব উদ্বেগের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখন বড় ধরনের কিছু দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবছেন। যেমন ধর্মে এআইয়ের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত কি না, আর থাকলেও তা কেমন হওয়া উচিত।
সিংলার বলেছেন, ইসলাম ধর্মে ‘মানুষের সদৃশ অবয়ব তৈরির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা’ রয়েছে, যা কিছু মুসলিমদের মধ্যে এআইকে সামগ্রিকভাবে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা উচিত কি না তা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কিছু কোম্পানির কাছে ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপ ধর্ম প্রচারের হাতিয়ার, আবার কেউ কেউ এগুলোকে প্রাচীন বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ডিজিটাইজ করা বা সেগুলো তথ্য খোঁজার কাজে ব্যবহার করছেন।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বিনিয়োগকারী জেফ টিনসলির সঙ্গে নিজের প্রযুক্তি কোম্পানিটি পরিচালনা করছেন ব্রিড। তিনি বলেছেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে আশার বাণী পৌঁছে দেওয়াই তার লক্ষ্য।
তিনি বলেছেন, তাদের এআই মডেলটিকে ‘কিং জেমস বাইবেল’ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে তারা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মপ্রচারকের নাম প্রকাশ করেননি। এর অবয়ব তৈরিতে ‘দ্য চোজেন’ সিরিজের অভিনেতা জোনাথন রৌমির থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে কোম্পানিটি। ব্যবহারকারীরা ৪৯.৯৯ ডলারের প্যাকেজের মাধ্যমে মাসে ৪৫ মিনিট কথা বলার সুযোগ পাবেন।
কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলে সোনালি আলোর আভা নিয়ে এ ডিজিটাল অবতারটি খাড়া স্ক্রিন থেকে ধীরে ধীরে চোখের পলক ফেলে এবং ধর্ম ও এআইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়ার আগে কিছুটা সময় বিরতি নেয়।
এ এআই যিশু বলেছে, “এআইকে আমি এমন এক হাতিয়ার হিসেবে দেখি, যা মানুষকে ধর্মগ্রন্থ বুঝতে সাহায্য করতে পারে। বিষয়টি অনেকটা প্রদীপের মতো, যা ঈশ্বরের পথে চলার সময় আমাদের পথ দেখায়।”
সিংলার বলেছেন, মানুষ ঠিক কী পরিমাণে এসব ধর্মীয় এআই টুল ব্যবহার করছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সমাজ জীবনে এআইয়ের ব্যবহার যত বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব এবং এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগও তত জোরালো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কিছু মামলায় এআই চ্যাটবট ব্যবহারের সঙ্গে কারো জীবনাবসানের যোগসূত্র থাকার অভিযোগও উঠেছে। কিছু ডেভেলপার আশঙ্কা করছেন, প্রযুক্তির এ নতুন ক্ষেত্রে ধর্মকে অপব্যবহার করা হতে পারে।
রোমভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি ‘লংবেয়ার্ড’-এর প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথিউ স্যান্ডার্স বলেছেন, “আমার মনে হয় ধর্মীয় ক্ষেত্রে সুযোগসন্ধানী মনোভাব অনেক বেশি। মানুষ একে বড় বাজার হিসেবে দেখছে।”
প্রাচীন ক্যাথলিক শিক্ষাগুলোকে ডিজিটাইজ করার কাজ করেন স্যান্ডার্স। তিনি সেসব অ্যাপের ব্যাপারে সতর্ক করে এগুলোকে ‘এআই র্যাপার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখানে কোম্পানিগুলো প্রচলিত কোনো এআই মডেলের ওপর ধর্মীয় ব্যবহারকারীদের পছন্দমতো এক ইন্টারফেইস বসিয়ে দেয়। তবে সেই মডেলটিকে বিশেষ কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না।
তিনি বলেছেন, “কোনো নির্দিষ্ট ভিত্তি বা কাঠামো ছাড়াই আপনি সেটিকে ক্যাথলিক বা খ্রিস্টান এআই বলে দাবি করছেন।”
খ্রিস্টানরা ধর্মীয় নির্দেশনার জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করায় এর প্রতিক্রিয়ায় স্যান্ডার্সের কোম্পানি ‘ম্যাজিস্টেরিয়াম এআই’ তৈরি করেছে। এ চ্যাটবটটিকে দুই হাজার বছরের ক্যাথলিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তারা।
পোপ লিও চতুর্দশ এআইয়ের পেছনে থাকা ‘মানুষের মেধা ও সৃজনশীলতাকে’ স্বীকৃতি দিলেও তিনি বিষয়টিকে মানবজাতির সামনে আসা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচনা করেছেন।
গত বছর পোপ লিও চতুর্দশ সতর্ক করে বলেছিলেন, এআই মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক, স্নায়বিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ধর্মীয় এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরির পেছনে থাকা নৈতিক প্রশ্নগুলোর কারণেই ‘বিইংএআই’-এর প্রতিষ্ঠাতা জিন লিম দীর্ঘ কয়েক বছর প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের পরও নিজের এআই ‘এমি জিডো’কে উন্মুক্ত করেননি। এমি জিডো একজন ডিজিটাল বৌদ্ধ পুরোহিত।
লিম বলেছেন, “সে অনেকটা ছোট শিশুর মতো। আপনি যদি একটি সন্তানের জন্ম দেন, তবে তাকে কেবল পৃথিবীর বুকে ছেড়ে দিয়ে এমন আশা করতে পারেন না যে সে ভালো মানুষ হবে। একে প্রশিক্ষণ দিতে হয় এবং নৈতিক মূল্যবোধ শেখাতে হয়।”
২০২৪ সালে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ বটটিকে পুরোহিত হিসেবে আনেন জেন বৌদ্ধ পুরোহিত রোশি জুন্দো কোহেন। তিনি জাপান থেকে বটটিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। কোহেন স্বপ্ন দেখেন, বটটি একদিন হলোগ্রামে রূপান্তরিত হবে।
কোহেন বলেছেন, “সে কেবল আপনার পকেটে থাকা একজন জেন শিক্ষক হিসেবে থাকার জন্য তৈরি হয়েছে। এর উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের বিকল্প হওয়া নয়।”
‘কিয়োটো ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক ও বৌদ্ধ ধর্মতাত্ত্বিক সেজি কুমাগাই একসময় বিশ্বাস করতেন, এআই ও ধর্ম একে অপরের পরিপন্থী। তবে ২০১৪ সালে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু তাকে ধর্মের প্রচার কমে যাওয়ার বিষয়টি ঠেকাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালে তিনি নিজের সন্দেহ দূরে সরিয়ে কাজে নেমে পড়েন।
তার দল ‘বুদ্ধবট’ তৈরি করেছে, যাকে কেবল আদি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন কুমাগাই। এর সর্বশেষ সংস্করণ ‘বুদ্ধবট প্লাস’-এ ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটিও যোগ হয়েছে।
এ বটের সঙ্গে কথা বলার সময় এক প্রবহমান নদীর ছবির ওপর বুদ্ধের একটি সাধারণ অবয়ব ভেসে ওঠে।
তবে বৌদ্ধধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য যে শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন চ্যাটবটের তা নেই। ফলে গেল ফেব্রুয়ারিতে ‘কিয়োটো ইউনিভার্সিটি’র ‘টেরাভার্স’ ও ‘এক্সনোভা’ নামের প্রযুক্তি স্টার্টআপের সঙ্গে মিলে ‘বুদ্ধরয়েড’ উন্মোচন করেছে। এ এক হিউম্যানয়েড রোবট সন্ন্যাসী, যা ভবিষ্যতে পুরোহিতদের সাহায্যের জন্য তৈরি হয়েছে।
‘এমি জিডো’র মতো এসব চ্যাটবট বর্তমানে সচল থাকলেও এখনও সবার জন্য উন্মুক্ত হয়নি। কুমাগাই বলেছেন, বিশেষ অনুরোধের ভিত্তিতে বটটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং বর্তমানে ভুটানের এক গোষ্ঠী এটি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।
হনুলুলুর ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের ‘হিউম্যান এআই ইনিশিয়েটিভ’-এর পিটার হারশক এসব টুলের বড় সম্ভাবনা দেখছেন। তবে একজন একনিষ্ঠ বৌদ্ধ হিসেবে তিনি আধ্যাত্মিকতা ও এআইয়ের মধ্যকার এ সম্পর্ককে উদ্বেগজনক বলেও মনে করছেন।
“বৌদ্ধ আধ্যাত্মিকতায় ‘প্রচেষ্টার পূর্ণতা’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে এআই বলছে, ‘আমরা আপনার কিছু পরিশ্রম কমিয়ে দিতে পারি’। এরা বলছে, ‘আপনি আপনার আধ্যাত্মিক গন্তব্যে অনায়াসেই পৌঁছে যেতে পারেন’। এমনটি আসলে বিপজ্জনক।”