Published : 09 Jan 2026, 03:27 PM
ফিউশন শক্তির ক্ষেত্রে এমন এক অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন চিনের বিজ্ঞানীরা, যা পরবর্তী প্রজন্মের এ জ্বালানি উৎস তৈরির পথে থাকা অন্যতম কঠিন বাধা দূর করবে বলে দাবি তাদের।
‘চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস’ বা সিএএস-এর একদল গবেষক বলেছেন, তাদের পরীক্ষামূলক পারমাণবিক চুল্লি, যেটিকে ‘আর্টিফিশিয়াল সান’ বা কৃত্রিম সূর্য বলা হচ্ছে, সেখানে প্লাজমার এমন ঘনত্ব তৈরি করেছে তারা, যা আগে অসম্ভব হয়নি।
নিউক্লিয়ার ফিউশনে কোনো বিপজ্জনক বর্জ্য তৈরি না করেই প্রায় অসীম শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণেই অনেকে এটিকে পরিবেশবান্ধব শক্তির ‘হলি গ্রেইল’ বা সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সূর্যে যেভাবে প্রচণ্ড তাপে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো মিলিত হয়ে শক্তি তৈরি করে, বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে ঠিক সেই প্রক্রিয়াটিই ঘটানোর চেষ্টা করছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্ট।
তবে সূর্যের মতো প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীতে না থাকায়, ল্যাবরেটরিতে এই পরিবেশ তৈরি করা ও তা দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ গবেষণায় বেশ কিছু বড় ধরনের সাফল্য এসেছে, যার মধ্যে ‘চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর ‘এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকাম্যাক’ বা ইস্ট প্রকল্পে পাওয়া বিভিন্ন মাইলফলক অন্যতম।
গত বছর প্রথমবারের মতো নিজেদের ‘আর্টিফিশিয়াল সান’ চুল্লিটি টানা এক হাজার সেকেন্ডের বেশি সময় ধরে চালিয়েছিল ‘চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস’, যা ছিল বিশ্ব রেকর্ড। তবে পরবর্তীতে ফ্রান্সের ‘ওয়েস্ট’ মেশিন সেই রেকর্ডটি ভেঙে দেয়।
তবে উভয় পরীক্ষা ঘনত্বের এক তাত্ত্বিক সীমার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, যা ‘গ্রিনওয়াল্ড লিমিট’ নামে পরিচিত। এ সীমার কারণে নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে জ্বালানি বা প্লাজমা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
‘প্লাজমা-ওয়াল সেলফ অর্গানাইজেশন’ বা প্লাজমা ও দেয়ালের নিজস্ব বিন্যাস নামের এক নতুন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভূতপূর্ব ঘনত্বের স্তরেও প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখতে পেরেছেন সিএএস-এর গবেষকরা।
দীর্ঘদিনের প্রচলিত বিজ্ঞানভিত্তিক সীমা পেরিয়ে প্লাজমার ঘনত্ব আরও বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে গবেষকরা বলেছেন, এখন অনেক বেশি পরিমাণে শক্তি উৎপাদন করে ‘ফিউশন ইগনিশন’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হবে।
‘এ গবেষণার অন্যতম গবেষক হুয়াজং ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র অধ্যাপক পিং ঝু বলেছেন, “এ গবেষণার ফলাফল আমাদের টোকাম্যাক ও পরবর্তী প্রজন্মের বার্নিং প্লাজমা ফিউশন যন্ত্রগুলোর ঘনত্বের সীমা বাড়ানোর জন্য বাস্তবসম্মত ও সম্প্রসারণের পথ বাতলে দিচ্ছে।”
অধ্যাপক ঝু-এর গবেষণা দলের তাত্ত্বিকভাবে সাফল্য পাওয়া নতুন এ পদ্ধতিটি এখন ইস্ট চুল্লিতে প্রয়োগের পরিকল্পনা করছেন, যাতে উচ্চ-সক্ষমতাওয়ালা প্লাজমাতেও এটি কাজ করে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এখনও অনেক বড় ধরনের উন্নয়নের প্রয়োজন, যাতে তা বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে ব্যবহার করা যায়।
তবে বেশ কিছু স্টার্টআপ কোম্পানি এরইমধ্যে আগামী কয়েক বছরেই এ প্রযুক্তি ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা করছে।
২০২৩ সালে বিশ্বের প্রথম নিউক্লিয়ার ফিউশন শক্তি ক্রয় চুক্তি সই করে ইতিহাস গড়েছিল আমেরিকান কোম্পানি ‘হেলিয়ন এনার্জি’।
কোম্পানিটি বলেছে, ২০২৮ সালের মধ্যে মাইক্রোসফটকে ৫০ মেগাওয়াট ফিউশন শক্তি সরবরাহ করবে তারা।