Published : 17 Feb 2026, 11:52 AM
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে এমন এক রহস্যময় গ্রহমণ্ডলীর সন্ধান পেয়েছেন, যা গ্রহ তৈরির প্রচলিত সব তত্ত্বকে ওলটপালট করে দিয়েছে বলে দাবি তাদের।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাধারণত কোনো তারার কাছে থাকে পাথুরে গ্রহ ও দূরে থাকে গ্যাসীয় গ্রহ। তবে পৃথিবী থেকে দূরে এক তারাকে ঘিরে আবর্তিত এ জগৎটি যেন সম্পূর্ণ উল্টোভাবে তৈরি হয়েছে, যেখানে গ্যাসীয় গ্রহদের ছাড়িয়ে পাথুরে গ্রহ তৈরি হয়েছে। সম্ভবত গ্রহ তৈরির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান যখন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে তখন এমনটি হয়েছে।
রয়টার্স লিখেছে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘শিওপস’ স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এ মণ্ডলটি পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকরা। চারটি গ্রহ নিয়ে গঠিত এ মণ্ডলটির দুটি পাথুরে ও দুটি গ্যাসীয় গ্রহ। এগুলো ছোট ও অনুজ্জ্বল এক তারাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, যাকে বলে ‘রেড ডোয়ার্ফ’ বা লাল বামন।
পৃথিবী থেকে ‘লিঙ্কস’ তারামণ্ডলীর দিকে প্রায় ১১৭ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত নতুন গ্রহমণ্ডল।
এক আলোকবর্ষ মানে হচ্ছে এক বছরে আলো যতটা দূরত্ব অতিক্রম করে, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
এ তারাটির নাম ‘এলএইচএস ১৯০৩’, যা সূর্যের তুলনায় ভরের দিক থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ ও উজ্জ্বলতার দিক থেকে কেবল ৫ শতাংশ।
বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে এসব গ্রহের সাজানোর ক্রম। সবচেয়ে ভেতরের গ্রহটি পাথুরে, পরের দুটি গ্যাসীয় ও চতুর্থ গ্রহটি প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী গ্যাসীয় হওয়ার কথা হলেও তা পাথুরে।
ইংল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়্যারউইক’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও এ গবেষণার প্রধান লেখক টমাস উইলসন বলেছেন, “গ্রহ তৈরির নিয়ম অনুসারে, তারার খুব কাছের বিভিন্ন গ্রহ আকারে ছোট ও পাথুরে হওয়া উচিত, যেখানে গ্যাস বা বরফ প্রায় থাকবেই না।
“এর কারণ, তারার কাছের পরিবেশ এতই উত্তপ্ত যে সেখানে গ্যাস বা বরফ টিকে থাকতে পারে না। কোনো বায়ুমণ্ডল তৈরি হলেও তারার বিকিরণে তা নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে, দূরের বিভিন্ন গ্রহ ঠান্ডা অঞ্চলে তৈরি বলে সেখানে অনেক গ্যাস ও বরফ থাকে, যা বড় বায়ুমণ্ডলসহ গ্যাসীয় গ্রহ তৈরি করে। তবে এ মণ্ডলটি গ্যাসীয় গ্রহের বাইরে এক পাথুরে গ্রহ রেখে আমাদের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।”
এ মণ্ডলটিকে ‘একটি উল্টোভাবে তৈরি হওয়া জগৎ’ বলে বর্ণনা করেছেন গবেষক উইলসন।
আমাদের সৌরজগতে ভেতরের চারটি গ্রহ পাথুরে এবং বাইরের চারটি গ্যাসীয়। প্লুটোর মতো পাথুরে বামন গ্রহগুলো গ্যাসীয় গ্রহদের বাইরে অবস্থান করে সেগুলো আমাদের সৌরজগতের যেকোনো গ্রহের তুলনায় অনেক বেশি ছোট।
১৯৯০-এর দশক থেকে এ পর্যন্ত আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রায় ছয় হাজার ১০০টি গ্রহ শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যাদেরকে বলে ‘এক্সোপ্ল্যানেট’।
নতুন আবিষ্কৃত এ মণ্ডলীর চারটি গ্রহই এদের তারার এত কাছে রয়েছে যে, আমাদের সৌরজগতের বুধ গ্রহ সূর্যের যত কাছে এসব গ্রহ তার চেয়েও কাছে। এ মণ্ডলীর সবচেয়ে বাইরের গ্রহটি বুধ ও সূর্যের মধ্যকার দূরত্বের কেবল ৪০ শতাংশ দূরত্বে অবস্থান করছে।
‘রেড ডোয়ার্ফ’ বা লাল বামন তারাগুলো সূর্যের চেয়ে অনেক কম শক্তিশালী হওয়ায় এদের ক্ষেত্রে গ্রহদের এমন কাছাকাছি থাকাটা স্বাভাবিক।
এ মণ্ডলের দুটি পাথুরে গ্রহকে বলা হচ্ছে ‘সুপার আর্থ’। এগুলো পৃথিবীর মতোই পাথুরে তবে ভরের দিক থেকে পৃথিবীর চেয়ে দুই থেকে ১০ গুণ বড়। আর গ্যাসীয় গ্রহ দুটিকে বলা হচ্ছে ‘মিনি নেপচুন, যেগুলো আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট গ্যাসীয় গ্রহ নেপচুনের চেয়ে ছোট তবে পৃথিবীর চেয়ে বড়।
গবেষকদের ধারণা, এ গ্রহমণ্ডলীর এসব গ্রহ এদের তারার আশপাশের গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল চাকতি থেকে একবারে তৈরি হয়নি, বরং এগুলো একের পর এক বা পর্যায়ক্রমে তৈরি হয়েছে। চতুর্থ গ্রহটির বায়ুমণ্ডল তৈরির জন্য যে গ্যাসের প্রয়োজন ছিল তা হয়ত তার আগের বিভিন্ন গ্রহ আগেই ব্যবহার করে ফেলেছিল।
এ চতুর্থ গ্রহটিকে ‘লেট ব্লুমার’ বা দেরিতে বিকশিত হওয়া গ্রহ বলে বর্ণনা করেছেন গবেষক উইলসন।
“এ গ্রহ অন্যান্য গ্রহের তুলনায় দেরিতে তৈরি হয়েছে। গ্রহটি তৈরির সময় পরিবেশে গ্যাসের পরিমাণ খুব কম ছিল। আসলে এ গ্রহটি তৈরি হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদান তখন অবশিষ্ট ছিল না।”
আরেকটি বিষয় হতে পারে, গ্রহটি হয়ত বিশাল গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডল নিয়েই জন্মেছিল। তবে পরবর্তীতে কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয়ের কারণে সেই বায়ুমণ্ডল হারিয়ে গেছে এবং কেবল পাথুরে কেন্দ্রটি অবশিষ্ট রয়েছে।
স্কটল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট অ্যান্ড্রুজ’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও এ গবেষণার সহ-লেখক অ্যান্ড্রু ক্যামেরন বলেছেন, “চতুর্থ গ্রহটি কি কাকতালীয়ভাবে ঠিক তখনই তৈরি হয়েছিল যখন গ্যাস ফুরিয়ে আসছিল? না কি অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের কবলে পড়েছিল, যা এর বায়ুমণ্ডলকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে?
“দ্বিতীয় ধারণাটি কাল্পনিক মনে হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, আমাদের পৃথিবী ও চাঁদও কিন্তু ঠিক এমনই এক সংঘর্ষের ফলেই তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হয়।”
বসবাসের উপযোগী হওয়ার সম্ভাবনার কারণেও বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় চতুর্থ গ্রহটি। এর ভর পৃথিবীর তুলনায় ৫.৮ গুণ ও এর তাপমাত্রা প্রায় ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
গবেষক উইলসন বলেছেন, “৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পৃথিবীতে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের খুব কাছাকাছি। ফলে গ্রহটি বসবাসের উপযোগী হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে।
“ভবিষ্যতে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ থেকে এ গ্রহের পরিবেশ সম্পর্কে আরও কিছু জানা যাবে এবং গ্রহটি কতটা বাসযোগ্য তা আমরা বুঝতে পারব।”