১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দক্ষিণ মেরু থেকে তারায় অধরা মহাজাগতিক ‘ভূতে’র সন্ধানে বিজ্ঞানীরা

এসব ‘ভূতুরে কণা’ গ্রহ, তারা, এমনকি পুরো ছায়াপথের মধ্যেও না থেমে অবিরত চলে যেতে পারে। এ কারণেই নিউট্রিনো ধরা অত্যন্ত কঠিন।

দক্ষিণ মেরু থেকে তারায় অধরা মহাজাগতিক ‘ভূতে’র সন্ধানে বিজ্ঞানীরা
এসব কণা মহাবিশ্বের কোথা থেকে আসে তা এখনও রহস্যই রয়ে গিয়েছে।  ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Aug 2025, 02:08 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:12 PM

একশ বছরের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক রশ্মির উৎস নিয়ে গভীর বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। এসব রশ্মি উচ্চ-শক্তির কণার এক অবিরাম বৃষ্টি, যেখানে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রিনোর মতো পদার্থ অবিরামভাবে পৃথিবীর ওপর আছড়ে পড়ছে।

এসব কণা মহাবিশ্বের কোথা থেকে আসে তা এখনও রহস্যই রয়ে গিয়েছে। বর্তমানে নতুন বিভিন্ন প্রযুক্তি গবেষকদের এই অনুসন্ধানের পরিসরকে আরও ছোট করতে সাহায্য করছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।

গবেষকরদের এ প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’,  যেটি পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে চাপা এক বিশাল যন্ত্র। ২০০৯ সাল থেকে নিউট্রিনো নামের ওই অধরা কণার চিহ্ন রেকর্ড করে চলেছে আইসকিউব।

এসব ‘ভূতুরে কণা’ গ্রহ, তারা, এমনকি পুরো ছায়াপথের মধ্যেও না থেমে অনায়াসে ভেদ করে চলে যেতে পারে। এ কারণেই নিউট্রিনো ধরা অত্যন্ত কঠিন। তবে এদের একটি বড় সুবিধাও আছে। যেমন– অন্যান্য কণার মতো এরা পথ বাঁকায় না, সাধারণত উৎস থেকে সোজাসুজি চলে আসে।

বিজ্ঞানীরা এসব কণার চলার পথ খুঁজে বের করতে পারলে শেষ পর্যন্ত মহাজাগতিক রশ্মির উৎস খুঁজে পাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন।

জার্মানির ‘রুর ইউনিভার্সিটি বোচুম’-এর অধ্যাপক আনা ফ্রানকোভিয়াকের নেতৃত্বে একদল গবেষক নতুন অ্যালগরিদম তৈরি করেছে, যা এই অনুসন্ধানকে  নাটকীয়ভাবে উন্নত করেছে।

তাদের নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে এখন আইসকিউব কেবল ৩০ সেকেন্ডেই কোনো নিউট্রিনোর শক্তি ও গতিপথ নির্ণয় করতে পারে।

আর এ তথ্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের বিভিন্ন টেলিস্কোপের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে যারা মহাকাশের সেই নির্দিষ্ট অংশ স্ক্যান করে সম্ভাব্য উৎস খুঁজে দেখছেন। কারণ কিছু মহাজাগতিক বস্তু কেবল অল্প সময়ের জন্যই তীব্র আলো ছড়ায়, তাই দ্রুত গতি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণা দলটি আরেকটি ধীরগতির হলেও আরও বিস্তারিত অ্যালগরিদম তৈরি করেছে, যা তাদের সন্ধানের প্রাথমিক ফলাফলকে আরও নিখুঁত করে তোলে বলে দাবি তাদের। 

গবেষকরা বলছেন, আগের বিভিন্ন প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে এখন নিউট্রিনোর গতিপথ চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি সঠিকভাবে নির্ণয় করা যাচ্ছে। এই রিয়াল-টাইম ব্যবস্থা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাজাগতিক আতশবাজির দৃশ্য সরাসরি ধরার সবচেয়ে বড় সুযোগও করে দিচ্ছে।

তবে এ অগ্রগতির পরেও রহস্যের এখনও পুরোপুরি সমাধান মেলেনি। একসময় গবেষকদের ধারণা ছিল, ‘টাইডাল ডিজরাপশন ইভেন্ট’ বা যখন কোনো তারা কোনো ব্লাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছাকাছি চলে গিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তখন ওইসব ঘটনা থেকেই নিউট্রিনো তৈরি হয়।

এমন তিনটি নিউট্রিনো ঘটনার রেকর্ড পেয়েছিল আইসকিউব, যেগুলো এমন তারার ধ্বংসযজ্ঞ বা ‘টাইডাল ডিজরাপশন ইভেন্টের’ সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল বলে ধারণা করেছিলেন গবেষকরা।

তবে ফ্রানকোভিয়াকের গবেষণা দলটির উন্নত টুল দিয়ে যখন ওইসব তথ্য পুনঃবিশ্লেষণ করা হয় তখন সেই মিল আর দেখা যায়নি। এসব নিউট্রিনো এসেছিল ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে।

এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক ‘অ্যাস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল’-এ। এ গবেষণা থেকে ইঙ্গিত মেলে, উন্নত প্রযুক্তি ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব কতটা।

বর্তমানে বিভিন্ন ভুল ধারণা আরও নিশ্চিতভাবে বাতিল করা সম্ভব হবে, ফলে সময় ও শ্রম নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমবে এবং গবেষকদের মনোযোগ অন্যান্য সম্ভাবনাময় উৎসগুলোর দিকে কেন্দ্রীভূত হবে।

নিউট্রিনোর মহাজাগতিক উৎস এখনও অজানা থাকলেও গবেষকরা এ নিয়ে এখন আশাবাদী। প্রতিটি উন্নত বিশ্লেষণ তাদেরকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য উদঘাটনের আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

ফ্রানকোভিয়াকের ভাষায়, “আমাদের তৈরি নতুন এই সিস্টেম রিয়াল-টাইমে কাজ করে। আর এটিই আমাদের প্রয়োজন, যেন আমরা শেষ পর্যন্ত জানতে পারি এসব কণা মহাবিশ্বের কোথা থেকে আসছে।”