Published : 05 Jun 2026, 10:18 AM
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সর্বদাই সংকটাপূর্ণ। একদিকে কৌশলগত নিরাপত্তা ও সামরিক আধুনিকায়নের সুযোগ, অন্যদিকে স্বাধীন অবস্থান হারানোর আশঙ্কা—বাংলাদেশ এখন ঠিক এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।
তারেক রহমান সরকার গঠনের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দন বার্তায় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রতিরক্ষা চুক্তি দ্রুততর করার তাগিদ সেই বাস্তবতারই সূচনা। বাংলাদেশ কি স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারছে, নাকি কোনো এক পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আকসা (ACSA) ও জিসোমিয়া (GSOMIA) চুক্তি দুটির প্রকৃতি বোঝা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা এবং বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে যে, সরকার এই চুক্তি দুটি সম্পাদন করার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তাত্ত্বিক কাঠামো
১. কিসিঞ্জারের বাস্তববাদ ও শক্তির ভারসাম্য
হেনরি কিসিঞ্জার তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিপ্লোমেসি’তে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তববাদী পাঠ উপস্থাপন করেন। তার মতে, রাষ্ট্রগুলো মূলত জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয় এবং শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখাই আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি। কিসিঞ্জার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি প্রায়শই নৈতিক আদর্শবাদের আবরণে জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
“No country can act wisely simultaneously in every part of the globe at every moment of time.” — Henry Kissinger, Diplomacy, 1994
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তিকে বোঝা যায়: যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে আঞ্চলিক মিত্র তৈরি করছে, যেখানে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত মূল্যবান।
২. জোসেফ নাই ও তার স্মার্ট পাওয়ার তত্ত্ব
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই তার ‘সফট পাওয়ার ও দ্য ফিউচার পাওয়ার’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, আধুনিক বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তি (হার্ড পাওয়ার) দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ‘স্মার্ট পাওয়ার’—অর্থাৎ হার্ড ও সফট পাওয়ারের সুচিন্তিত সমন্বয়।
বাংলাদেশের জন্য এই তত্ত্বের প্রয়োগ হলো: কেবল বৃহৎ শক্তির চাপে নত হওয়া নয়, বরং নিজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান ও কূটনৈতিক দক্ষতাকে পুঁজি করে চুক্তিগুলোকে নিজের শর্তে সম্পাদন করা।
৩. কেনেথ ওয়ালজের কাঠামোগত বাস্তববাদ
নিও-রিয়েলিস্ট তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়ালজ তার ‘থিউরি অব ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স’ গ্রন্থে দেখান যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্যিক কাঠামোই রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপত্তার সন্ধানে বাধ্য করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ছোট রাষ্ট্রগুলো সাধারণত দুটি কৌশল নেয়: বড় শক্তির সঙ্গে জোট গঠন অথবা পাল্টা শক্তির সঙ্গে মিত্রতা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ হলো উভয় কৌশলের মাঝামাঝি—কৌশলগত নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচনি অংশীদারত্ব।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ইন্দো-প্যাসিফিক ও বাংলাদেশের অবস্থান
১. মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল
২০১৭ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন এবং পরবর্তীতে বাইডেন প্রশাসন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ ঘোষণা করে। ২০২২ সালে প্রকাশিত মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নথিতে বলা হয়: "The most consequential geopolitical contest of our era is taking place in the Indo-Pacific."
এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে প্রতিসাম্য প্রদান করা। এই কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র QUAD (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত), AUKUS (অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র) এবং দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি ‘নিরাপত্তা জাল’ বিস্তার করছে। বাংলাদেশ এই জালের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত।
২. বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব
বঙ্গোপসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। প্রতি বছর প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এই সাগর দিয়ে প্রবাহিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ও ভবিষ্যতের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এই সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। দ্য ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার বিশ্লেষক শ্রেয়া আগরওয়াল ২০২৩ সালে লিখেছেন, "The Bay of Bengal is increasingly becoming a focal point of great power competition, with China's String of Pearls strategy and the US-India partnership both vying for influence. Bangladesh sits at the geographic heart of this contest."
এই বাস্তবতায় আকসা চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বঙ্গোপসাগরে লজিস্টিক সুবিধা দেওয়ার একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যা ভারত মহাসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করতে সহায়ক।
৩. চীনের 'স্ট্রিং অব পার্লস' ও বাংলাদেশ
চীনের 'মুক্তার মালা' কৌশলের আওতায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে বন্দর ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর এবং মাতারবাড়ি প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ রয়েছে। পাশাপাশি চীন BRI-র (Belt and Road Initiative) আওতায় বাংলাদেশে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ চীন থেকে মোট সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৭২ শতাংশ আমদানি করে। এই নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর বেইজিংয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করবে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তব কূটনৈতিক ঝুঁকি।
আকসা ও জিসোমিয়া: চুক্তির প্রকৃতি ও পরিধি
১. আকসা: সামরিক লজিস্টিকস সহযোগিতার কাঠামো
আকসা (ACSA - Acquisition and Cross-Servicing Agreement) মূলত একটি লজিস্টিকস চুক্তি। এর আওতায় দুই দেশের সামরিক বাহিনী যৌথ মহড়া, শান্তিরক্ষা অভিযান, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সময় পরস্পরের কাছ থেকে নিম্নলিখিত সুবিধা নিতে পারে:
জ্বালানি সরবরাহ ও যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ
খাদ্য, চিকিৎসা সামগ্রী ও অন্যান্য রসদ
পরিবহন ও যোগাযোগ সুবিধা
যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম বিনিময়
চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে শতাধিক দেশের সঙ্গে সম্পাদন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ২০০২ সালে এবং ভারত ২০১৬ সালে (LEMOA নামে) এটি স্বাক্ষর করেছে।
২. জিসোমিয়া: গোপন সামরিক তথ্য বিনিময়ের চুক্তি
জিসোমিয়া (GSOMIA–General Security of Military Information Agreement) অনেক বেশি সংবেদনশীল একটি চুক্তি। এটি দুই দেশের মধ্যে বিশেষ সামরিক তথ্য আদান-প্রদানের আইনি কাঠামো নির্ধারণ করে। এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো:
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় (সন্ত্রাসবিরোধী ও সাইবার নিরাপত্তা)
সামুদ্রিক ডোমেইন সচেতনতা
উন্নত প্রযুক্তি ও অস্ত্রসংক্রান্ত তথ্য হস্তান্তর
প্রতিরক্ষা গবেষণায় যৌথ সহযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্তানির আগে জিসোমিয়া ধরনের তথ্য সুরক্ষা চুক্তি বাধ্যতামূলক করে। অর্থাৎ, F-16 বা P-8 Poseidon-এর মতো উন্নত সরঞ্জাম পেতে চাইলে জিসোমিয়া স্বাক্ষর প্রায় অপরিহার্য।
৩. মার্কিন 'চার ভিত্তি চুক্তি'
যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক অংশীদারদের সঙ্গে চারটি 'ফাউন্ডেশনাল চুক্তি' স্বাক্ষর করে, যা একসঙ্গে একটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করে:
জিসোমিয়া—সামরিক তথ্য সুরক্ষা
আকসা—লজিস্টিকস সহযোগিতা
বেকা (BECA)—জিওস্পেশিয়াল তথ্য
কমকাসা (COMCASA)—যোগাযোগ ব্যবস্থা
ভারত ২০১৬-২০২০ সালের মধ্যে এই চারটি চুক্তিই সম্পাদন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচিত চুক্তি দুটি এই চার চুক্তির অংশ, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১. নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চুক্তি
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটি অনন্য রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে: একটি নির্বাচনি সরকার কি এমন দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত চুক্তি সম্পাদনের গণতান্ত্রিক বৈধতা রাখে?
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. মালিয়া বোউটিলিয়ারের মতে, যেকোনো সরকার কর্তৃক স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি তার উত্তরসূরিকে আইনগতভাবে বাধ্য করে, যদি না নতুন সরকার তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এই 'আইনি ফাঁদে' বর্তমান সরকার পড়েছে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
২. পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নিয়োগ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থেকে সরাসরি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নিয়োগ রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এখন আবার তাকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে জিতিয়ে আনা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দুটি দায়িত্বই ধরে রাখা তার অভিলাস। খলিলুরের নিজের কথায়: 'আমি জোর করে আসিনি, আমাকে এখানে আনা হয়েছে।' এই বক্তব্যটি ব্যাপক আলোচনা ও গভীর প্রশ্নের তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, একজন মার্কিন প্রবাসী বিশেষজ্ঞকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া—বিশেষত যখন মার্কিন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে—কার্যত একটি কৌশলগত পদায়ন। যদিও এই পছন্দ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে না বিপক্ষে, তা নির্ভর করছে মন্ত্রী কতটা স্বাধীনভাবে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি বাস্তবায়ন করতে পারেন, তার ওপর।
৩. জ্বালানি চুক্তি ও পাকিস্তান সংযোগ
ওয়াশিংটনে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মধ্যে স্বাক্ষরিত জ্বালানি সহায়তা চুক্তি সংসদে বা মন্ত্রণালয়ে আলোচনা ছাড়াই সম্পন্ন হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একই সময়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির রহস্যময় সফর এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের আলোচনা বহুমুখী নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক তুলনামূলক অভিজ্ঞতা
১. ভারত: কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে চুক্তি
ভারত ২০০২ সালে জিসোমিয়া এবং ২০১৬ সালে LEMOA (ACSA সমতুল্য) স্বাক্ষর করে। তবে ভারত এই প্রক্রিয়ায় তার 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' মতবাদকে কেন্দ্রে রেখেছে। ভারত একই সঙ্গে রাশিয়ার S-400 কিনেছে, ইরানের সঙ্গে চাবাহার বন্দর প্রকল্পে যুক্ত থেকেছে এবং QUAD-এ অংশ নিয়েছে। এই বহুমুখী কৌশলই হলো ভারতের 'স্মার্ট পাওয়ার' প্রয়োগের উদাহরণ।
ভারতীয় কূটনীতি বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানির পর্যবেক্ষণ প্রাসঙ্গিক: "These agreements can pull a country into Washington's orbit — India must exercise these with strategic autonomy intact."
বাংলাদেশের জন্য ভারতের এই মডেল অনুসরণযোগ্য।
২. দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান জিসোমিয়া সংকট
২০১৯ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বাণিজ্য বিরোধের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়া জিসোমিয়া বাতিলের ঘোষণা দেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, জিসোমিয়ার মতো চুক্তি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে এর প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়। শেষ পর্যন্ত মার্কিন মধ্যস্থতায় সিউল সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে, যা বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেয় যে, একবার এই কাঠামোয় প্রবেশ করলে বের হওয়া কঠিন।
৩. ফিলিপাইন: সুবিধা ও ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে
ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে VFA (Visiting Forces Agreement) ও EDCA (Enhanced Defense Cooperation Agreement) স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা চাপের মধ্যে ফিলিপাইনকে প্রায়ই দুই পরাশক্তির টানাপোড়েনে পড়তে হয়। ম্যানিলাভিত্তিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ডন ম্যাকলেইন গিলের মতে: "Small states in the Indo-Pacific must manage the tension between security benefits and strategic entrapment."
৪. জাপান: সক্রিয় অংশীদারিত্বের নতুন মডেল
জাপান তার শান্তিবাদী সংবিধানের মধ্যে থেকেও ২০২৩ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের আওতায় প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করেছে এবং ফিলিপাইনসহ একাধিক দেশের সঙ্গে আকসা স্বাক্ষর করেছে। জাপানের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, এই চুক্তিগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হলে সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ না করেও কৌশলগত সুবিধা অর্জন সম্ভব।
বিশ্লেষণ: সুবিধা, অসুবিধা ও ঝুঁকি
১. সম্ভাব্য সুবিধাসমূহ
বাংলাদেশ এই চুক্তিগুলো থেকে কিছু বাস্তব সুবিধা পেতে পারে। যেমন:
সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যে প্রবেশাধিকার।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ: বঙ্গোপসাগরে অবৈধ মৎস্য শিকার, জলদস্যুতা ও চোরাচালান প্রতিরোধে সক্ষমতা বৃদ্ধি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা: ঘূর্ণিঝড় বা মানবিক সংকটে দ্রুত আন্তর্জাতিক লজিস্টিক সহায়তা।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন: আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর: সাইবার নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন।
২. সম্ভাব্য অসুবিধা ও ঝুঁকি
একই সঙ্গে গুরুতর ঝুঁকিগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে:
কৌশলগত নিরপেক্ষতা বিনষ্ট: বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের 'সকার সঙ্গে বন্ধুত্ব' নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে ফাটল: সামরিক সরঞ্জামের ৭২ শতাংশ সরবরাহকারী চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হবে।
প্রযুক্তিগত নির্ভরতা: মার্কিন তথ্য ও প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত করবে।
যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু: ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংঘাতে বাংলাদেশের বন্দর ও ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি।
গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন: সংসদীয় আলোচনা ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়ন গণতান্ত্রিক শাসনের নীতির পরিপন্থী।
৩. অসম বাণিজ্য চুক্তির সমস্যা
ইউনূস সরকারের স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিয়ে বিনিময়ে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যে সুবিধা পাওয়ার শর্ত এবং পোশাক রপ্তানিতে মাত্র ১ শতাংশ শুল্ক হ্রাস—এটি স্পষ্টতই একটি অসম বিনিময়। অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, এমন 'বেনিফিট অব ডাউট' দিয়ে চুক্তি করলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নীতিগত সুপারিশ
১. 'স্মার্ট পাওয়ার' কূটনীতির বাস্তবায়ন
জোসেফ নাই-এর তত্ত্বের প্রায়োগিক রূপ হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র কৌশলে নিম্নলিখিত নীতি অনুসরণ করা উচিত:
চুক্তি বাস্তবায়নে ক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করা, একসঙ্গে সব চুক্তি নয়।
প্রতিটি চুক্তিতে স্পষ্ট ’এক্সিট ক্লজ’ ও পর্যালোচনার বিধান রাখা।
চুক্তির বিষয়বস্তু সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করা।
চীন, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা।
২. বহুমুখী অংশীদারিত্বের কাঠামো
বাংলাদেশের উচিত ASEAN-এর মতো একটি কৌশলগত 'হেজিং' নীতি অনুসরণ করা—যেখানে কোনো একটি পরাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে অনুকরণীয়।
৩. দরকষাকষির শক্তি বৃদ্ধি
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরএমজি (Ready-Made Garments) খাতের কেন্দ্রীয় ভূমিকা, ১৭ কোটি জনগণের বিশাল বাজার এবং বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থান—এই তিনটি উপাদান বাংলাদেশকে যথেষ্ট দরকষাকষির ক্ষমতা দেয়। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অসম চুক্তিগুলো পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞ মতামত
১. বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা
মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান (BIPSS প্রেসিডেন্ট): এই চুক্তিটি করতে গিয়ে অন্য কারও স্বার্থে আঘাত হানতে পারে কি না, সেটা সতর্কতার সঙ্গে এবং ধীরে-সুস্থে খেয়াল করতে হবে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়): দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেভাবে বাড়ছে, সেখানে চুক্তির দরকষাকষির সময় বাংলাদেশের অবস্থান যেন জোরালো থাকে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) বায়েজিদ সারওয়ার: এই চুক্তিগুলো বাংলাদেশের প্রতিরোধ ও পুনর্গঠন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে; তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে দৃঢ়ভাবে আলোচনা করা উচিত।
২. আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা
ব্রহ্মা চেলানি (Centre for Policy Research, India): এই চুক্তিগুলো কোনো দেশকে মার্কিন কক্ষপথে নিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার হতে পারে এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে এগুলোতে প্রবেশ করা উচিত।
মাইকেল গ্রিন (CSIS): এই চুক্তিগুলো ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন জোট কাঠামো শক্তিশালী করার অপরিহার্য উপাদান।
ডন ম্যাকলেইন গিল (Manila-based): ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে নিরাপত্তার সুবিধা ও কৌশলগত ফাঁদের মধ্যে টানাপোড়েন সামলাতে হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি দুধারী তলোয়ার। এটি একদিকে সামরিক আধুনিকায়ন ও কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে, অন্যদিকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হারানো ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জটিল করার আশঙ্কাও তৈরি করে।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত কেউই বাংলাদেশের পক্ষে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে না। প্রতিটি পরাশক্তি নিজের কৌশলগত স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়; কিসিঞ্জারের বাস্তববাদ এই সত্যকেই সামনে আনে।
তবে জোসেফ নাই-এর 'স্মার্ট পাওয়ার' তত্ত্ব আমাদের সামনে একটি তৃতীয় পথ দেখায়—সংঘাত নয়, সমর্পণও নয়; বরং কৌশলগত ভারসাম্য, দৃঢ় দরকষাকষি এবং বহুমুখী অংশীদারিত্বের পথে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ এমন একটি মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সঠিক সিদ্ধান্ত আগামী দুই দশকের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে। এই সিদ্ধান্ত শুধু সরকারের নয়—এটি জনগণের, সংসদের এবং সুশীল সমাজেরও। কূটনৈতিক গোপনীয়তার নামে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা বিসর্জন দিলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
মঞ্জুরে খোদা লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: [email protected]